নিউইয়র্কে ‘ঘরে অবস্থান’ করার নির্দেশ: এর অর্থ কী?

লেখাটি অনুবাদ করেছেন ফাহমি ইলা:

নিউইয়র্কের বাসিন্দাদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুক্রবার (২০ মার্চ) এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর এন্ড্রু কুয়োমো এই নির্দেশ জারি করে বলেন, করোনাভাইরাস এর সংক্রমণ রোধের সম্ভাব্য উপায় হিসেবে  নিউইয়র্কের সকল সুস্থ কিংবা অসুস্থ বাসিন্দাকে ঘরে থাকার জন্য বিশেষভাবে বলা হচ্ছে। তবে জরুরি সেবাগুলো এই নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত নয়। সেইসাথে বিশেষ প্রয়োজনীয় নয় এমন সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন তিনি।  আগামীকাল রোববার সন্ধ্যা আটটা থেকে এ নির্দেশ কার্যকর হবে।

মি. কুয়োমো এই সিদ্ধান্তকে ‘চূড়ান্ত পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন। রাজ্যটিতে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা বর্তমানে ৭০০০ ছুঁয়েছে।

ক্যালিফোর্নিয়া স্টেটে প্রায় ৪০ মিলিয়ন বাসিন্দাকে ঘরে থাকার নির্দেশের পরপরই নিউইয়র্কে এই ঘোষণা এলো।

নিউইয়র্কের গভর্নর এন্ড্রু কুয়োমো

কুয়োমো স্বীকার করেন যে, ‘এতে করে পুরো কার্যক্রম ব্যাহত হবে। অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। কর্মচারিদের বাড়িতে থাকতে হবে। সবই বুঝতে পারছি। এতে করে লোকজন খুশি হবে না’। তবে তিনি পুরো দায়িত্ব নিয়ে বলেন, ‘কেউ যদি অখুশি হয়, কেউ যদি কাউকে দোষারোপ করতে চায় বা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চায়, তবে আমাকেই করুক। কারণ এই সিদ্ধান্তের জন্য এককভাবে আমিই দায়ী’। তিনি সমস্ত নিউইয়র্কবাসীর কাছে যতোটা সম্ভব ঘরে থাকার জন্য অনুরোধ করেন।

কুয়োমো আরও বলেন, এই নির্দেশ অমান্য করার কোনো উপায় নেই। ব্যাপারটা এমন নয় যে এটা মানার জন্য কাউকে দেশের মহান নাগরিক হতে হবে। এটা আইনি বিধান। তিনি বলেন, প্রত্যেকের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন, নতুবা আমরা কেউই নিরাপদ থাকতে পারবো না। যারা এই নির্দেশ অমান্য করবে তাদেরকে জরিমানা করা হবে। আবারও বলছি, আপনাদের পদক্ষেপ আমার স্বাস্থ্যের ওপর হুমকি হতে পারে। আমরা এরকম একটা অবস্থাতেই আছি এখন।’

সত্তরোর্ধ্ব বয়সী লোকজন অথবা যারা অসুস্থ, নাজুক, তাদেরকে বিশেষভাবে ঘরে থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্কের কিছু কিছু এলাকা দেখে মনে হচ্ছে যে সবকিছুই স্বাভাবিক আছে। আসলে কিছুই স্বাভাবিক নেই। এটাকে মানতে শিখুন, ভাবুন এবং মোকাবিলা করুন’।

আগামী তিন মাসের জন্য তিনি আবাসিক এবং বাণিজ্যিক সমস্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত করারও ঘোষণা দেন তিনি।

অধিবাসীরা কি বাইরে যেতে পারবে?

হ্যাঁ, তারা বাইরে যেতে পারবে। যদিও জনগণকে ঘরে থাকতে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং গণজমায়েত সীমিত করা হয়েছে। তারা মুদি দোকানে যেতে পারবে, প্রয়োজনে হাসপাতালে যেতে পারবে, কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরুতে পারবে, এমনকি লন্ড্রি সার্ভিসেও যেতে পারবে। কারণ কর্তৃপক্ষ মনে করছে এই কাজগুলো একজন মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বাসিন্দারা বাইরে বেরুতে পারছে, তবু গভর্নর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে নিজেদের কমনসেন্সকে কাজে লাগাতে বলেছেন। তিনি বলেন- ‘বাইরের বিনোদন মানে হচ্ছে একাকি বিনোদন, সেটা সান্ধ্যকালীন হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা হাইকিং হতে পারে। কিন্তু বাইরের বিনোদন মানে পাঁচজন মানুষ একসাথে বাস্কেটবল খেলা নয়।’

এই প্রাদুর্ভাবের সময়ে, শিল্প কারখানার কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের কাজ থেকে অব্যহতি দেয়া হবে। কিন্তু যারা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গ্রোসারি শপ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, খাদ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থা এসব জায়গায় কাজ করেন, তাদের চলাফেরা এখনো সীমিত করা হয়নি। অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজনীয় সকল ব্যবসা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিছু রাজ্যের কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরে কর্মী ছাঁটাইয়ের দাবি করছিলো, ফলে বেশকিছু জায়গায় এ নিয়ে আন্দোলনও চলছিলো। কিন্তু এ সময়ে এসে, সকল প্রকার জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অধিবাসীরা যদি এ নিয়ম না মানে তাহলে কী হবে?

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম গত সপ্তাহে shelter-in-place নামে একটি কৌশল গ্রহণ করেন এবং এটি বাস্তবায়নের জন্য সেখানকার বাসিন্দাদের নির্দেশ দেন। যেখানে বলা হয় যে, প্রতিটি বাসিন্দা খুব জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া ছাড়া ঘরে অবস্থান করবে। এখানে ‘জরুরি’ শব্দটিকে জোর দেয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, দৈনন্দিন জিনিষপত্র কেনাকাটা, ডাক্তারের কাছে যাওয়া, পালিত প্রাণীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, ওষুধ কিনতে বের হওয়া প্রভৃতি কাজগুলোকে ‘জরুরি’ কাজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এসকল প্রয়োজনে মানুষ বাইরে বের হতে পারবে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা এবং আবর্জনা পরিষ্কারের সাথে যুক্ত কর্মীরা কাজের প্রয়োজনে বাইরে বেরুতে পারবে।

ক্যালিফোর্নিয়ার এই কৌশলের উদ্ধৃতি দিয়ে গভর্নর কুয়োমো বলেন যে নিউইয়র্কের এই নির্দেশ সকল অধিবাসী এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যদিও নিউইয়র্কের আইনের মতো ক্যালিফোর্নিয়াও এ নির্দেশ অমান্যকারীকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করছে, কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়া তাদের shelter-in-place কৌশলটি আর অফিশিয়ালি ব্যবহার করছে না। নিউইয়র্কের আইন অনুযায়ী এই নির্দেশ অমান্যকারীরা সমাজের হুমকির কারণ হতে পারে এবং গণস্বাস্থ্যের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। এজন্য স্টেইট যেকোনো ব্যবসায়ী বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে আইন অমান্যের অভিযোগে জরিমানা করতে পারবে। তবে কোন ব্যক্তিকে জরিমানা করার ব্যাপারে শিথিল হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পরিবহন বা যাতায়াতের ক্ষেত্রে কী হবে?

নিউইয়র্ক এখনো সবচেয়ে বড় গণপরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করে। তাদের সাবওয়ে টেন এবং বাস সার্ভিস আছে। নির্দেশ অনুযায়ী, গণপরিবহন কার্যকর থাকবে, কিন্তু খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এসব গণপরিবহন ব্যবহার করা থেকে জনগণকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। রাস্তা, গ্যাসস্টেশন এবং গাড়ি মেরামতের দোকানগুলো খোলা থাকবে।

ফাহমি ইলা

নিউইয়র্ক শহরের মেয়র বিল ডে ব্লাসিও অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ যেমন বাইসাইকেল বা স্কুটার কিংবা পায়ে হেঁটে চলাচলকেও shelter-in-place নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত করবার জোর দাবি জানিয়েছিলেন, কিন্তু গভর্নর এ দাবি গ্রহণ করেননি। তার মতে- এখনও নিউইয়র্কের কোন বাসিন্দা হোম কোয়ারেন্টাইনে সীমাবদ্ধ হবার খবর পাওয়া যায়নি। তাই এ সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন নেই। উল্লেখ্য একমাত্র গভর্নরের ক্ষমতা আছে তার এলাকা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবার, এমনকি লকডাউনের সিদ্ধান্তও তিনিই নিতে পারবেন। এদিকে শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বক্তব্যে বলেন, এখনও দেশব্যাপি সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়ার মতো পরিস্থিতি আসেনি।

বৃহস্পতিবার কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রায় ১০০০ করোনাভাইরাস কেস নিশ্চিত করা হয়। শুক্রবারে গভর্নরের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় বা জরুরি যাতায়াত বলতে বোঝানো হয়েছে প্রয়োজনীয় দৈনন্দিন জিনিসপত্রের জন্য, স্বাস্থ্যসেবার জন্য, পরিবার ও বন্ধুর সাহায্যের জন্য বাইরে যাতায়াত। আকাশপথে যাতায়াত এবং ট্যাক্সি সার্ভিস এখনও চালু আছে, তবে ট্যাক্সি সার্ভিস একজন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, একের অধিক ব্যক্তি এক ট্যাক্সিতে যাতায়াত করতে পারবে না।

এই নিয়ম রোববার সন্ধ্যা থেকে কার্যকর হবে।

শেয়ার করুন:
  • 230
  •  
  •  
  •  
  •  
    230
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.