দেশের চিকিৎসকরা যখন ‘বোমা’র উপরে বাস করছেন!

সুপ্রীতি ধর:

আমার এক ডাক্তার বন্ধু আমাকে লিখেছে, “সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ একটি হাসপাতালে আমরা রেসপিরেটরি মেডিসিনের ডাক্তাররা বোমার উপরে আছি। কেবল আমাদের হাসপাতালেই দরকার হাজার দশেক PPE, আগামী ২ সপ্তাহ সার্ভিস দেবার জন্য। সাপ্লাই এসেছে ১০৮টা। দেড় মাস সময় পেয়েছিলাম প্রিপারেশন নেয়ার। PPE তৈরি করা যায় আমাদের গার্মেন্টসগুলোতেই। কী করেছে সরকার? বারবার বলেছে, আমাদের সব প্রিপারেশন আছে। এই তার নমুনা? এখন বলছে, এর বেশি স্টকে নেই। কেনার টাকা নেই। কিন্তু আতশবাজির টাকা তো আছে”।

তিনি আরও লিখেছেন, “আমি আমার চেম্বার বন্ধ করে দিচ্ছি। এটা আমার এখতিয়ারে আছে। কিন্তু হাসপাতালে যেতে তো আমি বাধ্য, সরকারি কর্মচারি হিসেবে। প্রতিদিন সকালে আমার মেয়ে আমার গালে চুমু দিয়ে চোখে পানি নিয়ে বিদায় দেয়। দুপুরে ফিরলে জড়িয়ে ধরে। আমি বুঝি ওর মনের অবস্থা।
ভাই, একজন ক্রিকেটারও তো মাথার হেলমেট, গ্লাভস, গার্ড, প্যাড পায়। যাবে ওরা এগুলো ছাড়া গোলার মতো ছুটে আসা বলের সামনে? তখন মানবতা, দায়িত্ব, দেশপ্রেম কোথায় ছুটে যাবে! আমাদের কেন ঠেলে দিচ্ছেন সামনে?
ঠাট্টা করে বলছি না। আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে কিনা জানি না। কোনো অন্যায় করে থাকলে মাফ করে দিয়েন। শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা”।

আমি বিদেশে বসে সকালে ঘুম ভাঙতেই মেসেঞ্জারে এই ছোট্ট বার্তাটি পেয়ে অঝোরধারায় কাঁদছি। কী করে, কীভাবে ফেরাবো আমার বন্ধুদের তাদের দায়িত্বপালন থেকে? সেটা তো সম্ভব না, উচিতও না। ওরা যে মানবসেবার ব্রত নিয়েই এই পেশায় এসেছে! কিন্তু তারা কি জানতো যে এমন একটি অথর্ব, অর্বাচীন সরকারের অধীনে কোনোরকম রক্ষাকবচ ছাড়াই আজ যুদ্ধের ময়দানে অশরীরী শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে? তারপরও আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ছেয়ে যাওয়া রাষ্ট্রে কিছু মানুষ এখনও নিজ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে। লাগামহীন দুর্নীতিগ্রস্ত একটি দেশে এখনও যে কিছু ‘মানুষ’ বাস করছে, এটাতেই তার প্রমাণ মেলে। সারাদিন ধরে আতিপাতি করে খুঁজছি নেটে, বন্ধুদের ওয়ালে ওয়ালে, যদি কিছু সমাধান পাই! এতো অসহায় কখনও অনুভব করিনি এর আগে।

আরও অনেক বন্ধু ফেসবুকে নিজেদের ডাক্তার স্বজন, আত্মীয়, বন্ধু, ছেলেমেয়ের বিপন্নতার কথা জানাচ্ছেন। হন্যে হয়ে তারা খুঁজে চলেছেন প্রিয়জনের নিরাপত্তার জন্য কিছু সামগ্রী যদি জোগাড় করা যায়!

আশার কথা হচ্ছে এরই মধ্যে কিছু কিছু ব্যক্তি উদ্যোগ চোখে পড়েছে, অনেকে ভাবছে কীভাবে এই পিপিই বানানো যায় আমাদের পোশাক কারখানাগুলোতেই। বন্ধু তাসলিমা মিজি নেট ঘেঁটে কিছু উপায় বের করেছে, এসময় কাজে আসতে পারে তেমন মানুষজনকে ও সংযুক্ত করতে চাইছে যেন তারা তাদের সর্বস্বটুকু দিয়ে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সহায়তার হাত বাড়ায়, যেন অল্প কিছুসংখ্যক হলেও ডাক্তার, নার্সদের কাছে এই পিপিই পৌঁছে দিতে পারে। অনেকেই সাড়া দিচ্ছে, এটাই আশা জোগায়।

এরই মাঝে খবর ভাইরাল হলো যে বুয়েটিয়ানদের একটি গ্রুপ নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে চার লাখ পিপিই বানাতে চাইছে। তারা টাকা জোগাড় থেকে শুরু করে ডিজাইনসহ সবকিছুই নিজেরাই করেছে। শুনেছি মার্কস এন্ড স্পেনসার এগিয়ে এসেছে তাদের সহায়তায়। সমস্ত বিতর্ক একপাশে রেখেই বলতে চাই, শেষপর্যন্ত যেন এই উদ্যোগ কার্যকর হয় এবং যথাসম্ভব খুব তাড়াতাড়ি। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে অনেক।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন বরাবরের মতোনই তার কর্মি বাহিনী নিয়ে মাঠে আছে। ওদের নিত্যনতুন জনসেবার উদাহরণ দিতে গেলে ফুরোবে না। যেকোনো সংকটেই ওরা মাঠে থাকে, এখনও আছে। এখন তারা প্রতিদিন খাবার রান্না করে ছিন্নমূলদের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে দিচ্ছে। তাদের এই কার্যক্রমের সাথে তুলনা করা হচ্ছিল সরকারের ব্যর্থতার। আর সে কারণেই কারও কারও চোখ টাটাতে শুরু করেছে বলেই বার বার এখন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে ওদের এই সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ কার্যক্রম। হায়রে অভাগা দেশ!

সরকারের মন্ত্রীদের ‘মুখ নি:সৃত বাণী’গুলো লিপিবদ্ধ করে রাখলে ভবিষ্যতে ওদেরকে স্রেফ ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া ছাড়া আর কোন পথ দেখি না। জনগণ সব মনে রাখবে, সব। ওরা এটা ভুলে যায়। এতোদিন ধরে বলে এসেছে, করোনার জন্য সবরকম প্রস্তুতি সরকারের আছে। আর এখন বলছে, নাই। মাঠে কাজ করতে নেমে চিকিৎসকরা দেখছেন, তাদেরকে স্রেফ যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেয়া হয়েছে কোনরকম ঢাল, সড়কি ছাড়াই। তারা মরবে না বাঁচবে, তাতে কারও কিছু আসে যায় না। ডেল্টা হাসপাতালের চিকিৎসক আইসিইউতে, তিনি সংক্রমিত হয়েছেন। এরকম আরও খবর আসছে। ভাইরাসটি এখন কমিউনিটিতে ঢুকে পড়েছে। অথচ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এখনও বলছেন, পিপিই’এর প্রয়োজনই নাকি নেই। এরকম নির্লজ্জ সরকারের ততোধিক নির্লজ্জ, বেশরম মন্ত্রীবর্গ কেবল বাংলাদেশেই মনে হয় আছে, বিশ্বের আর কোথাও নেই।

সরকারের নিরলস মিথ্যাচারের কারণেই দেশ আজ এতোটা বিপন্ন বোধ করছে। সময়টা চলে গেছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে তারা যখন মুজিববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সুক্ষ্ম অথচ বিশ্বে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ শক্তিশালী ভাইরাসটি তার থাবা বিস্তার করে ফেলেছে চারদিক দিয়ে, এখন আর বেরুবার পথ নেই। এমনই হতভাগা জাতি আমরা।

ডাক্তার বন্ধুদের বলছি, মনোবল হারাবেন না আপনারা। আমরা একটা সময়ে আটকে গেছি, ভয়াবহ দু:সময় সেটা। আজ থেকে এক মাস পরে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে কেউ জানি না, বিশ্বের চেহারাই বা কী হবে, জানি না। শুধু আশাটুকু জিইয়ে রেখেই বলতে চাই, আপনারা এক মহান কাজ করছেন এই মুহূর্তে। আপনাদের ভালবাসা।

কাবেরী গায়েনের মতোই বলতে চাই, মহামারীদিন সম্মিলিতভাবে মোকাবেলার ধৈর্য আমাদের হোক।
ভালোবাসা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ মজবুত করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার বিকল্প নেই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.