স্পর্শ

শাহাজাদী বেগম:

বরুণার মেয়ে দুটো কাঁচের জানালার ওপাশ থেকে বাবাকে দেখছে, বাবার সাথে তাদের প্রিয় আদর আর খুনসুটিগুলো ইশারাতেই হচ্ছে। বড় মেয়েটা মোটামুটি বোঝে। কিন্তু ছোট মেয়েটা বড্ড চঞ্চল, সারাক্ষণ গায়ের মধ্যে মাখামাখি আর মারামারি করে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের “করো না”র কবলে পড়ে তাদের আজ এই হাল।
অবশেষে ঘরের দরজা খুলে রেখে তাদের বাবা তার রুমের দেয়ালের শেষ প্রান্তে আর তারা আরেক রুমের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কথা বলছে। কয়েক ঘন্টায় মেয়ে দুটো কেমন ম্যাচিওরড হয়ে গেলো, দুজনেইর চোখ ছলছল করছে, কিন্তু তারা কাছে যাচ্ছে না, দূরে সরে থাকছে। ছোটটা প্রায়ই বলছে, তোমার কাছে যেতে চাই বাবা, তোমার কাছে শুতে চাই।“ তাদের বাবা সেলফ কোয়ারান্টাইনে আছে, কারণ সে অন্য দেশ থেকে ফিরেছে।

হিউম্যানিটারিয়ান প্রোগ্রামে যারা কাজ করে তাদের সবসময় একটা ব্যাগ গোছানো থাকে এমার্জেন্সির জন্য – হয় রেসপন্স নয়তো ইভাকুয়েশন। তারা এবং তাদের পরিবার সেভাবেই নিজেদেরকে তৈরি করে রাখে। কিন্তু রাত সাড়ে তিনটায় ঢাকা শহরে একটি নতুন থাকার জায়গা খুঁজে বের করা কতটা কঠিন, তাও আবার সেলফ কোয়ারেইন্টাইনের জন্য, সেটি বুঝতে বিদ্বান হওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন মানবিক মানসিকতা আর একটুখানি নিঃস্বার্থ ফ্যামিলি ফিলিংস!

শাহাজাদী বেগম

বরুণা রাত সাড়ে তিনটায় ঘুম ভেঙ্গে দেখে আদিত্যর মেসেজ, ঠিক ফ্লাই করার আগ মুহূর্তে লিখেছে,

“যেখানে উঠার কথা ছিল, সেখানে যাওয়া হচ্ছে না।
আমার জন্য অন্য একটি জায়গা ঠিক করো, ঠিকানাটা মেসেজ করে দিও।
আমার জন্য অন্য কোথাও ব্যবস্থা করো, আমি আগের জায়গাতে যাচ্ছি না।“

শরীরের কিডনি-কলিজারা যখন প্রত্যাখ্যান করে, হার্ট তখন আক্রান্ত হয়। বরুণা আদিত্যর সেই আক্রান্ত হার্টের বিলম্বিত বিট টের পায়। সে মুহূর্তেই বুঝেছিল বাংলাদেশ খুব ভয়ংকর একটি সময়ের মধ্যে ঢুকতে যাচ্ছে।

দুটি শিশু সন্তান আর বয়স্ক শাশুড়িকে সাথে নিয়ে থাকা বরুণার সেই মুহূর্তটা কেমন কেটেছিল? এতো রাতে কী করবে সে, কাকে বলবে ভেবে দিশেহারা। কে দিবে জায়গা করোনা ভাইরাসের আশংকা কাটাতে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনের জন্য?
সকালের আগেই ঠিক করে ফেলতে হবে, কতটুকু সময় হাতে আছে? কিছুক্ষণের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আদিত্য নিজের বাসাতেই আসুক। কাছের আত্মীয়দের সাথে কথা বলে সেটাই ফাইনাল করলো। সিদ্ধান্তটি ঠিক কি বেঠিক সেটা নিয়ে সে মাথা ঘামায়নি, কারণ সে জানে ঠিক-বেঠিক বিষয়গুলো বড্ড আপেক্ষিক। আজ যা ঠিক মনে হচ্ছে, ৫ বছর পর তা নাও মনে হতে পারে। আবার অন্যের কাছে যেটি ঠিক সিদ্ধান্ত, তার কাছে সেটি ভুল মনে হতে পারে। সে শুধু জানে “আমার পরিবার, আমার দায়িত্ব।“

বরুণার মেয়ে দুটো তখনও ঘুমে কাতর। ঘন্টা খানেকের মধ্যে রুমটি তৈরি করতে হবে আদিত্য বাসায় আসার আগেই, ছেড়ে দিতে হবে দুই সপ্তাহের জন্য। তাই খুব প্রয়োজনীয় জিনিস যা কিনতে পাওয়া যায় না এবং যেগুলো আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে লাগতে পারে কোনরকমে সেটুকু নিয়ে অন্য রুমে পার হয়ে গেল। ঘুমন্ত শিশু দুটোকে কোলে করে মা’র বিছানায় শুয়ে দিল, মাকে দ্রুত ব্যাগ গোছাতে হলো, একান্ত প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে দুই সপ্তাহের জন্য অন্য বাসায় যেতে হবে।

কেমন ছিল সেই এক ঘন্টা সময়টা? একটা ইভাক্যুয়েশনে যেমনটি হয়, ঠিক তেমন! যারা ঐ সময়টা পার করেনি তারা কখনও বুঝবে না। এতোদিন পরে ছেলে বাড়ি আসছে, অথচ ছেলে বাসায় পৌঁছানোর আগেই মাকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল, বয়সের কারণে উনি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সেজন্য।

বরুণা আদিত্যকে বাসায় রাখার সিদ্ধান্তটি ঐমুহূর্তে নিতে পেরেছিল, কারণ তারা একটি তিন রুমের বাসায় থাকে। তাদের বেড্রুমে একটি এটাচড বাথরুম আছে এবং রুমটির সাথে একটি ছোট ব্যালকনি আছে। একজন চাইলে দুই সপ্তাহ অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারে।

তার নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়। ঢাকা শহরের একটা বড় অংশ মানুষ একরুমে গাদাগাদি করে থাকে। এই শহরে একটা বড় অংশ পরিবার কমন বাথরুম এবং কমন রান্নাঘর ব্যবহার করে। একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার সাবলেট থাকে। করোনা ঠেকাতে তারা কী করবে? কীভাবেই বা কোয়ারেন্টাইন করবে প্রয়োজনের সময়? বরুণা ভেবে দিশেহারা। কে যেন বলেছিল “তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এলে মনে হয় ঈশ্বর আছে”। সেই ভরসাতেই কি থাকতে হবে কাউকে কাউকে? সেই তুলনায় নিজেদেরকে অনেক আশীর্বাদপুষ্ট মনে হয় তার।

আদিত্য এসে বাইরের সিঁড়িতে বসে ফোন দিয়েছিলো। বরুণারা মা-মেয়ে মিলে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে দূর থেকেই কথা বলেছে। ছোট মেয়েটির স্বভাব দৌড়ে গিয়ে কোলে ওঠা, তাকে জো্র করে আটকে রাখতে হয়েছিল। কেমন করে অন্যরা বুঝবে, ছয় বছরের শিশুটি তখন কেমন ছটফট করছিল? কোন কিছু না ছুঁয়ে সোজা বেডরুমে ঢুকে পড়েছিল আদিত্য। সেই থেকেই সেলফ হোম কোয়ারেন্টাইনে আছে।

ব্যাপারটা মোটেও সোজা না। যেই সিঁড়িতে বসেছিল, যেদিক দিয়ে হেঁটে ঢুকেছে সেই জায়গাগুলো মূহূর্তেই জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ফেলতে হয়েছিল। দরজার সামনে খাবারগুলো ট্রেতে করে রেখে আসা হয়। খাবার শেষ করে আবার ট্রেখানি দরজার সামনে রাখতেই সেগুলো তখনই ধুয়ে ফেলতে হয়। ট্রে আনার সময় পর্দায় কি একটু লেগেছিল? মুহূর্তেই সেটি সাবান দিয়ে কেচে ফেলো, ট্রেটা জামাতে লেগেছিল – অমনি জামা বদলে ধুতে দাও।

কখনও কখনও মনে হয়েছে এপ্রোন, গ্লাভস ব্যবহার করে, কিন্তু ওসব আবার রাখবে কোথায়? যেখানেই রাখবে সেখানেই ভাইরাস সংক্রমণের আশংকা। দিনগুলো এভাবেই যায়। শুধু রাতের বেলায় দুজন মানুষের নির্ঘুম প্রহর গোনা! কখনও কখনও মাঝের দরজাটি খুলে দুজন দুইরুমের দেয়াল ঘেঁষে মোড়া পেতে বসে নিষ্পলক চেয়ে থাকে। এক সমুদ্র স্পর্শের আকুলতায় দীর্ঘশ্বাসের ঢেউ আছড়ে পরে বুকের মাঝে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী।

শেয়ার করুন:
  • 624
  •  
  •  
  •  
  •  
    624
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.