করোনা পরিস্থিতি: সবার জন্য গৃহবন্দি জীবন প্রযোজ্য নয়

উপমা মাহবুব:

আগামী দুই সপ্তাহ আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যান্য দেশের ট্রেন্ড অনুসরণ করে করোনায় আক্রান্ত হওয়া এবং মারা যাওয়ার হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে বলে আশংকা করছি। অর্থাৎ আমরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পিক সময়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছি।

সরকার সবে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া শুরু করেছে। নতুন নতুন ঘোষণা আসছে – ইজতেমা গ্রাউন্ডে হাসপাতাল হবে, একটি উপজেলার কিছু অংশ লকডাউন করা হয়েছে, কক্সবাজারে পর্যটকরা প্রবেশ করতে পারবে না, ইত্যাদি। তবে ভালো খবর হলো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্বল্প মূল্যে করোনা ভাইরাস কারো শরীরে সংক্রমণ হয়েছে কিনা তা নির্ণয়ের সুলভ কিট আবিষ্কার করেছে।
আরও সুসংবাদ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার উৎপাদন করে সেগুলো বণ্টনের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করছে। এতোকিছুর পরও সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বলা যায় বাংলাদেশের মানুষ এখনও করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহতা বুঝতে পারছে না৷ স্কুল ছুটি থাকার সুযোগে মানুষ বিকেলবেলা শিশুদের নিচে খেলতে পাঠাচ্ছে। শহর জুড়ে বাজার-সদাই-ঘোরাঘুরি সবই চলমান৷ গ্রামের পরিস্থিতি আর উল্লেখ না করলাম। এরই মাঝে প্রতিদিন বিদেশ থেকে সাড়ে সাত হাজার মানুষ দেশে আসছেন। তাদের সিংহভাগই হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকছেন না। কেউ এলাকায় চষে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ বিশাল আয়োজন করে বিয়ের পিঁড়িতে বসছেন।

উপমা মাহবুব, উন্নয়ন কর্মী

আমাদের এটা মেনে নিতে হবে যে জাতিগতভাবে আমরা এমনই আর বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকেও অনেক বেশি কিছু আশা করে লাভ নেই। ১৮ কোটি মানুষের একটি দেশে করোনার ভয়াবহতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো যথেষ্ট রিসোর্স ও জনবলও সরকারের নেই। তাহলে সামনের দিনগুলোতে মানে করোনা সংক্রমণের পিক সময়ে কী হবে? হাজার হাজার মানুষ আক্রান্ত হবে? অসংখ্য রোগী মারা যাবে? তখন আমার-আপনার মতো শিক্ষিত, সচেতন মানুষদের ভূমিকা কী হবে? পরিবারসহ নিজেকে ঘরের ভেতর আবদ্ধ করে রেখেও কী আমরা বাঁচতে পারবো? মানুষ কী একা বাঁচতে পারে?

আমরা ভুলে যাইনি ছোটকালে মুখস্ত করা সেই বাক্যটি – মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধভাবেই তাই বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে। সেই লক্ষ্যে এখনই সময় নিজ থেকে এগিয়ে এসে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার। বাসায় বসে আর কিছু না পারি অন্তত মানুষকে সচেতন করার কাজটি চালিয়ে যেতে হবে। নিজে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে অন্যকেও সাবান ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে। গতকাল দেখলাম একটি পরিবার তাদের সদ্য বিদেশ ফেরত সদস্যকে বাসায় হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে রাজি করাতে না পেরে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দ্বারস্থ হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফোনে ঐ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে রাজি করাতে পেরেছেন। আরও দেখলাম ব্যক্তি উদ্যোগে কেউ লিফলেট বিতরণ করছে, কেউ রিক্সাওয়ালা, দারোয়ান ভাইদের মাঝে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক ইত্যাদি বিতরণ করছে।

এছাড়াও, সোশ্যাল মিডিয়াসহ পত্রপত্রিকায় বেশ বড়সংখ্যক মানুষ যারা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন, অনলাইন ব্যবসা করেন বা যাদের অনেক ফলোয়ার আছে, তারা নানা রকম সচেতনতামূলক পোস্ট দিচ্ছেন বা লেখা লিখছেন৷ যেসব সংগঠন সেচ্ছাসেবক হিসেবে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তাদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তাও করছেন অনেকে।

তবে সামনের দিনগুলোতে এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলো হয়তো যথেষ্ট হবে না। সংকটের মাত্রা যদি বাড়ে সেই সঙ্গে সহায়তার মাত্রাও বাড়াতে হবে। তখন হয়তো মেডিক্যাল ফ্যাসিলিটিজ-এ থাকা অসুস্থ মানুষদের সেবা করাসহ নানা কাজে প্রচুর পরিমাণ স্বেচ্ছাসেবক প্রয়োজন হবে। এলাকায় এলাকায় হয়তো স্থানীয় তরুণদের নিয়ে টিম বানানো লাগবে, যারা যেসব বাড়িতে বৃদ্ধ বা অসুস্থ পরিবার থাকবে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বা ওষুধের ব্যবস্থা করবে। তখন কোনো পরিবারে খাবার না থাকলে পাশের বাড়ির পরিবারটিকে খাবার শেয়ার করার মানসিকতা রাখতে হবে৷

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ গরীব৷ তারা প্রত্যন্ত গ্রামে বাস করে, শহরের বস্তিতে বা রাস্তায় তাদের দিন-রাত কেটে যায়। করোনা ছড়িয়ে পড়লে এই মানুষগুলোর আয়-রোজগার বন্ধ হবে, তারা খাদ্য সংকটে পড়বে, সীমিত ক্ষমতা সম্পন্ন হাসপাতালে তাদের জায়গা হবে না। এই জনগোষ্ঠীকে এই মহাবিপদে আমাদের রক্ষা করতে হবে। সরকারের উপর সব দায়িত্ব না চাপিয়ে এই লক্ষ্যে এগিয়ে আসতে হবে সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীকেই।

অতএব করোনা পরিস্থিতি যদি সত্যিই আরও খারাপের দিকে যায় তাহলে আমাদের এই সংকটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। আর সেই যুদ্ধ হতে হবে জনযুদ্ধ, যেখানে সরকার, বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও অংশগ্রহণ করতে হবে৷ তাদেরকে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশটি ছোট কিন্তু সংখ্যায় আমরা অনেক। কেবলমাত্র সরকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে না থাকে বা প্রতিমুহূর্তে সরকারের সমালোচনা না করে যার যার নিজের অবস্থান থেকে কিভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভূমিকা রাখা যায় তা এখন থেকেই ভাবতে শুরু করুন৷ সময় কিন্তু দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।

আমরা বার বার বলছি সবাইকে ঘরের ভেতর অবস্থান নেওয়ার জন্য। সকল জনগোষ্ঠীর ঘরের ভিতর অবস্থান করা সেই সব দেশের জন্য বেশি কার্যকর যেখানে সরকার ঘরে ঘরে খাবার, ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছে। সবার ব্যাংক এ্যাকাউন্টে মাসিক বেতন পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু আমার মনে হয় বাংলাদেশে কাউকে না কাউকে যতটা সম্ভব প্রয়োজনীয় প্রোটেকশন গ্রহণ করে ঘর থেকে বের হয়ে আসতেই হবে। জনযুদ্ধে অংশ নিয়ে মানবতার সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করতে হবে। যারা শারীরিক সমস্যা বা অন্য কোনো কারণে বেশি ভালনারেবল, তাদেরকেও কীভাবে ঘরে বসেই দেশের এই সংকটে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভূমিকা রাখা যায়, তার উপায় খুঁজে বের করতে হবে৷

তাই সকল সচেতন বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের প্রতি আমার আহবান, কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ শুরু করার সময় কিন্তু এগিয়ে আসছে; তাই আসুন আমার-আপনার সম্মিলিত পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ দ্রুত শুরু করি৷ দেরি হোক, যায়নি সময়।

শেয়ার করুন:
  • 899
  •  
  •  
  •  
  •  
    899
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.