করোনায় একটি প্রজন্ম শেষ, মৃতদের সৎকারে লড়ছে ইতালি

ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন ফাহমি ইলা:

সৎকারের অপেক্ষায় থাকা কফিনগুলো গির্জার সামনে একের পর এক লাইন ধরে অপেক্ষা করছে, যারা বাসায় মারা গেছে তাদের মৃতদেহ সিল করা ঘরে কিছুদিনের জন্য রাখা হচ্ছে। কারণ প্যানডেমিক করোনা ভাইরাসে ইতালি এমনভাবে আক্রান্ত যে ফিউনারেল সার্ভিস মৃতদেহ সৎকারে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে! বুধবার পর্যন্ত ইতালি জুড়ে কোভিড-১৯ ভাইরাসে ২৯৭৮ জন মানুষ মারা গেছে। মৃতদের কোনরকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সমাধিস্থ করা হয়েছে অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। যারা একাকি হাসপাতালে মারা গেছে, তাদের জিনিসপত্র ব্যাগে ভরে তাদের কফিনের পাশে রেখে দেয়া হয়েছে এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করছে যেসব কর্মী, তারা সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়েছে।

লোম্বার্দি রিজিয়নের ১.২ মিলিয়ন মানুষের প্রদেশ বেরগেমোতেই ১৬৪০ জন মারা গেছে এবং গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৯৯৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। এই প্রদেশ জুড়ে মৃতের সংখ্যা সঠিক জানা যাচ্ছে না, তবে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি এতোটাই ভয়াবহ যে বুধবার রাতে দেশটির সেনাবাহিনীকে ডাকতে হয়েছে বেরগামোর সমাধি কেন্দ্র থেকে ৬৫টি মৃতদেহ সরিয়ে মোদেনা এবং বোলোগনাতে স্থানান্তরিত করতে।

এই এলাকার সবচেয়ে বড় ফিউনারেল সংস্থা CFB-র ডিরেক্টর জানান, গত ১ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত তারা ৬০০ মৃতদেহ সৎকার করেছেন। CFB-র প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও রিচার্দি বলেন- ‘সাধারণত মাসে আমরা গড়ে ১২০ মৃতদেহ সৎকার করি। কিন্তু গত দু’সপ্তাহের মধ্যে একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে গেলো। আমরা এর আগে কখনোই এরকমটা দেখিনি এবং এই চিত্র স্রেফ আপনাকে কাঁদিয়ে দেবে।’

বেরগেমোতে ৮০টির মতো ফিউনারেল প্রতিষ্ঠান আছে, প্রত্যেকে ঘন্টায় গড়ে এক ডজন ফোন কল রিসিভ করছে। কফিনের অপ্রতুলতা এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কর্মীদের ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার কারণে সুষ্ঠুভাবে সৎকারও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

হাসপাতালগুলো মৃতদেহের ব্যাপারে আরও কঠোর নিয়ম জারি করেছে। ভাইরাস ছড়ানোর আশংকায় মৃতদেহকে কোনো কাপড়ে না জড়িয়ে সরাসরি কফিনে দেয়া হচ্ছে। রিচার্দি বলেন- পরিবার তাদের প্রিয়জনের মৃতদেহ শেষবারের জন্যেও দেখতে পারছে না, কোন আনুষ্ঠানিকতা করতে পারছে না। এটা মানুষকে সাইকোলজিক্যালি মারাত্মকভাবে আঘাত করছে। এদিকে আমাদের অনেক কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়ায় মৃতদেহ নিয়ে আসা এবং সৎকারে সমস্যা হচ্ছে।’

যেসব রোগী বাসায় মারা যাচ্ছে, তাদের পরিবার আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মধ্যে পড়ছে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী দুজন ডাক্তারকে মৃত্যুর সার্টিফিকেট দিতে হয়। দ্বিতীয়ত, একজন বিশেষজ্ঞকে কেউ মারা যাবার ত্রিশ ঘন্টার মধ্যে মৃত্যুর সার্টিফিকেট দিতে হয়। এই পর্যায়ে এসে যা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। রিচার্দি বলেন- ‘এখন এই মুহুর্তে আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে দুজন ডাক্তার এসে মৃতদেহের সার্টিফিকেট দেয়া অবধি, যেখানে আবার বেশিরভাগ ডাক্তারও অসুস্থ।’

বেরগেমোর এক শিক্ষক স্তেলা এক মৃতের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন- ‘গতকাল একজন ৮৮ বছরের বৃদ্ধ মারা যান। গত কয়েকদিন ধরেই তাঁর জ্বর ছিলো। কিন্তু কোনোভাবেই এম্বুলেন্স ডাকা সম্ভব হয়নি কেননা ফোনের সব কয়টা লাইন সবসময় ব্যস্ত ছিলো। সে একা নিজ কক্ষে মারা যায়, এম্বুলেন্স আসে একঘন্টা পরে। স্বাভাবিকভাবেই তখন আর কিছু করার ছিলো না। বেরগেমোতে কোন কফিনও পাওয়া যাচ্ছিলো না। ফলে মৃতদেহকে সেভাবেই বিছানায় রেখে রুমটিকে সিল মেরে বন্ধ করে তারা চলে যায় যাতে কফিন না আসা পর্যন্ত মৃতের পরিবার সেখানে ঢুকতে না পারে।’

আলেসান্দ্রো নামে একজন বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে আপনি আপনজনের মৃতদেহ বাসায় নিয়ে একরাত পরিবারের সাথে রাখতে পারবেন, পছন্দের কাপড় পরিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু এখন এসব কিছুই সম্ভব না, এমনকি আপনি শেষবিদায়ও জানাতে পারবেন না। এটাই সবচেয়ে হৃদয়বিদারক!’ আলেসান্দ্রোর ৭৪ বছর বয়সী চাচা কডোইনো শহরে মারা গেছে, যেই শহর থেকে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়।

ফাহমি ইলা

লোকাল পত্রিকাগুলোর মৃত্যুবিষয়ক বিভাগ থেকে বর্তমানের হৃদয়বিদারক প্রভাব সম্পর্কে একটু ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একজন পাঠক অনলাইন ফুটেজের মাধ্যমে দেখান যে গত ৯ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় যেখানে মাত্র একটি পাতায় মৃতের খবর প্রকাশ করেছিলো, মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করতে ১৩ মার্চ সেখানে দশটি পাতার প্রয়োজন পড়েছে! আরেকজন চার্চে সারিবদ্ধভাবে সাজানো কফিনের ভিডিও প্রকাশ করেছেন।

বেরগেমোর ব্যবসায়িক সংঘ Lia-র ডিরেক্টর পিয়েত্রো বোনালদি বলেন-‘আমরা জাতীয় পর্যায়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া প্রতিষ্ঠানের জন্য সহোযোগিতা চেয়েছি। কারণ ইতিমধ্যে আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী করেছি এবং অনেক ফিউনারেল কর্মী ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, ফলে কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

ইতালির বহু জায়গায় ফিউনারেল কোম্পানি আর মৃতদেহ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নেপলস শহরে একটি মৃতদেহ দুদিন ঘরে পড়ে থাকার পর সৎকারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

সকল প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান (বিয়ে, সৎকার) এবং গণজমায়েত নিষিদ্ধ করেছে সরকার। দু’জন পুরোহিতকে, একজন ভেনিসের কাছাকাছি এবং অন্যজন দক্ষিণ ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলে, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া পরিচালনার দায়ে অভিযুক্ত করে তাদের শাস্তি দেয়া হয়েছে।

সূত্র: ‘দ্য গার্ডিয়ান’

শেয়ার করুন:
  • 5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    5K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.