‘গডফাদার’ হতে নারী শরীর কোনো বাধা নয়!

সাবিনা শারমিন:

বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম এবং কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীনের একটি অডিও রেকর্ড বাজারে ফাঁস হয়েছে।ওই অডিওটি কিছুটা শোনার সাথে সাথেই আমার কানে যেনো প্রতিধ্বনিত হলো সাত খুনের আসামী নুর হোসেনের সাথে নারায়ণগঞ্জের কথিত গডফাদারের ফাঁস হওয়া অডিও’র সেই অবিকল সুরের কথাগুলো।

নাহ, এখানে আরিফুলকে আসামী নুর হোসেনের সাথে তুলনা করা হচ্ছে না। বলতে চাচ্ছি, গডফাদার যেই ভঙ্গিমা এবং ঢং এ কথা বলছিলেন, সেই প্রতাপীয় ভঙ্গিমার সাথে কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানার কথার ভঙ্গিমার শতভাগ সামঞ্জস্যর কথা। তিনি যেভাবে এবং যে রকম স্টাইলে তার পালিত পোষ্যদের সব ঠিকঠাক করে দেয়ার অভয় দিয়েছিলেন, সুলতানা পারভিনও যেনো ওরকমই দাদাগিরি, বসগিরি, খল নায়কগিরি, ডনগিরি এবং গড ফাদারীয় ভঙ্গিমায় আরিফকে অভয় প্রদান করার অঙ্গীকার করে স্নেহভরা কন্ঠে সব ঠিক করে দেয়ার ভরসা দিলেন। যেন বোঝাতে চেষ্টা করলেন, যা হবার হয়ে গেছে, এ এমন কিছু নয়। মিডিয়াকে এড়িয়ে চললে সব ঠিক করে দেবেন তিনি। যেন দুষ্টু ছেলে দুষ্টুমি করেছে বলে তিনি একটু কান মলে দিয়েছেন।

সাবিনা শারমিন

তবে কথিত সেই গডফাদারের সাথে এ ঘটনায় পার্থক্যটা হচ্ছে এই সরকারি ‘গডফাদার’ ব্যক্তিটি একজন নারী। নারী বলতে আমরা আমাদের চিরাচরিত সাংস্কৃতিক আবহে এতোকাল ধরে যা বুঝি তাই আর কী! মানে আমপাবলিক যেভাবে বলতে থাকেন, নারী মাতা, নারী জননী, নারী কোমল ইত্যাদি ইত্যাদি। শারীরিক অবয়বের পরিচয়ে তিনি নারী অঙ্গের অধিকারী হলেও মানসিকভাবে ও আচরণে তিনি নির্ভুলভাবে ঠিক ওরকম একজন গডফাদার থেকে পৃথক সত্ত্বা নন।

পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করার সুযোগ ব্যবহার করতে করতে তিনি ভুলে গেছেন তিনি বাংলাদেশের প্রজাতন্ত্রের একজন সেবক। তারা কোনো জেলার রাজা বা রানীও নন। ফাঁস হওয়া কথোপকথনে শোনা যায় সাংবাদিক আরিফ এই গডমাদারকে বার বার ‘স্যার’ ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে কর্মস্থলের অধীনস্তদের মতো বিনয় দেখাচ্ছেন, যে বিনয় তিনি একেবারেই প্রাপ্য নন। তাছাড়া সাংবাদিক আরিফ তার অধীনস্ত কর্মচারিও নন। আমার কথা হচ্ছে সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ সরকারি চাকুরেদের ‘স্যার’ সম্বোধন করবেন, এই বিধান কোথায় আছে? আসলে এ ঘটনা থেকে বোঝা গেলো ক্ষমতার অপব্যবহার শুধু পুরুষকেই কলুষিত করে না। নারীও হয়ে উঠতে পারে একজন কলুষিত ভয়ংকর অপরাধী সুলতানা। সরকার যাকে নির্বাচিত করে জনগণের সেবা করার সুযোগ দিয়েছিলো।

সুলতানা পারভীন রাতারাতি ‘গড ফাদার ‘বনে যেতে নারীর জরায়ু মাতৃত্ব, স্তন, যোনী, পর্দানশীলতা, আল্লাহর উপর ভরসা, কোনকিছুই কিন্তু বাধা হয়ে ওঠেনি। কথোপকথোনে অভয় বাণীতে বার বার ‘আমরা’ ‘আমরা বলে কেমন যেনো একটি ‘গ্যাং’ এর গন্ধই তিনি ছুঁড়ে দিলেন। যেখানে আরও ঊর্ধ্বতন বা অধীনস্ত সদস্য সদস্যার উপস্থিতিরই আলামতের ছাই পাওয়া যায়। তাছাড়া পর্দাকে ব্যবহার করেছেন সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেয়ার জন্য।

কথোপকথনে উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে ,
সুলতানা বলছেন, কেমন আছো?(তুমি সম্বোধন!!)

আরিফ জানাচ্ছে, তাকে মারা হয়েছে এবং যারা তাকে মেরেছে তারা তার কাছ থেকে চোখ বাঁধা অবস্থায় চারটি সাইন নিয়েছে।
আরিফ জানাচ্ছিলো, তার দু’টি সন্তান আছে। তাকে এনকাউন্টারে দিতে চেয়েছিলো। এনকাউন্টারে নেয়ার মতো অপরাধ তার ছিলো কিনা! এক পর্যায়ে আরিফ জানালেন, সুলতানা ডাকলেই তিনি যেতেন, তাহলে কেনো তাকে সুলতানার অফিসাররা বিবস্ত্র করে ভিডিও করা হলো এবং সেটার উদ্দেশ্য কী?

ভাবতে হতবাক হতে হয়, প্রতিহিংসায় তিনি একজন পুরুষকে নগ্ন করে ভিডিও ধারণ করলেন। জীবন বাঁচানোর তাগিদে আমরা যৌন কর্মীদের জীবনকে ঘৃণা ছুঁড়ে দেই। আর এদের দেই ‘স্যার’ ‘স্যার’ সম্মান। এখনই সময় এদের বিষদাঁত ভেঙে দেয়ার। অন্যথায় এমন ঘটনা পরবর্তী মাসেই ঘটবে। মনে প্রশ্ন জাগে, নগ্ন কি তিনি অন্যকে করলেন? নাকি নিজের কাজে নিজেই নগ্ন হলেন?

কথোপকথনে আরিফের প্রশ্নের উত্তর সুলতানা যেভাবে দিলেন, তা শুনুন:

‘ঘটনা যেভাবেই হোক, ঘটে গেছে, আমি অনুতপ্ত, এনকাউন্টারের মানসিকতা আমাদের ছিলো না।
এখনও তুমি আমাদের কাছে আসবা। তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে এতো চিন্তিত হবার কিছু নেই। আপাতত মিডিয়াকে এভয়েড করে এভাবে থাকো। বাদবাকি আল্লাহ ভরসা। পাশেই আছি।’

এই ভদ্রমহিলার কথোপকথনে যেভাবে তিনি সাংবাদিক আরিফকে ‘তুমি’ সম্বোধনে যে সমস্ত অভয় দিলেন, তাতে করে আর যাই হোক একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাকে একেবারেই মেনে নেয়া যায় না। তাছাড়া একজন বিপরীত লিঙ্গের পেশাজীবীকে তিনি ‘তুমি’ সম্বোধনে ডাকছেন এটি শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ বলেই মনে হয়।

একজন সাংবাদিককে শুধু বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করেই তারা থামেন নাই, মেরে ফেলার, কলেমা পড়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, বাড়িতে আধা বোতল মদ ও গাঁজা থাকার অভিযোগও এনেছেন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কাউকে ক্ষতি না করে যদি মদ গাঁজা সেবন করেন, তাতে জেলা প্রশাসকের বিরাগভাজন হওয়ার কোনো কারণ তো থাকা উচিৎ নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়েছে এ যেন বাংলা সিনেমার খল নায়ক ডিপজলের নারী সংস্করণ।

হ্যাঁ, এটি শিকার করতেই হবে যে মন্দের ভালো যে ওই সাংবাদিক এখনও বেঁচে আছেন। একজন অকুতোভয় প্রতিবাদী মানুষের বেঁচে থাকাটা খুব জরুরি।

ওদিকে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল নামের আরেক সাংবাদিক ভাই সংসদ সদস্যের করা মামলার আসামি হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন। করোনার প্রতাপে তার কথা তেমন একটা কেউ বলছেন না। পত্রিকায় জেনেছি, তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নিপীড়িত বীরাঙ্গনা মায়েদের কথা লিখতেন। জানি না কী আছে তার পরিবারের ভাগ্যে। তবে এটি বুঝতে পারছি, বাঙলাদেশে ক্ষমতার অপব্যবহারে গডফাদার থেকে গডমাদার হওয়ায় নারীর শরীর কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

সাবিনা শারমিন
[email protected]

শেয়ার করুন:
  • 613
  •  
  •  
  •  
  •  
    613
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.