আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

কৃষ্ণা দাস:

নারীবাদ জানতে হলে, নারী অধিকারের ক্ষেত্রে, সাম্য/সমতা কী, তা আগে জানতে হবে। নারীবাদ শুধুমাত্র নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করাই নয়, পাশাপাশি পুরুষদেরও তার যোগ্য সম্মানটুকু দেয়া। ধরেন আপনি নারী, আপনার গায়ে যেমন কেউ হাত তোলার অধিকার রাখে না, তেমনি আপনিও অন্য কারও গায়ে হাত তুলতে পারেন না। তাহলে আপনার আর পুরুষতান্ত্রিক শাসকদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? অথচ এই নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতেই তো এই আন্দোলন।

বেশিরভাগ নারীবাদীই মুখে মুখে নারীবাদ নিয়ে চেঁচামেচি করে, হুদাই কিছু না জেনে। অবস্থা অনেকটা এমন, “বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমার”। এই স্বেচ্ছাচারিতার পাঠ নারীবাদের কোথাও পড়ানো হয় না। বেশি বেশি ভাবগম্ভীর আর ধারা দিয়ে নারীবাদকে জটিল না করে সহজ আর সাবলীল ভাষায় নারীবাদের চর্চা করতে হবে, যাতে করে সমাজের সকল স্তরের জনগণ তা বুঝতে পারে। পাশাপাশি সঠিক আর সুস্থ নারীবাদ নিয়ে পড়াশোনা এবং তা চর্চাও করতে হবে। তবেই নারী অধিকার আদতে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

নারীবাদ কী? নারীবাদের সংজ্ঞা ইত্যাদি নিয়ে ইতিপূর্বে অনেক আলোচনা হয়েছে, আর গুগলে একটু সার্চ করলেও এ সম্পর্কিত অনেক আর্টিকেল চোখে পড়বে। ব্যাপারটা নারীবাদের সংজ্ঞা জানা নয়, ব্যাপার হচ্ছে নারীবাদ ধারণ করা। সোজাসাপ্টা বললে ধারণ দিয়েও আসলে কিচ্ছু হবে না, যদি না আমরা/সমাজের সবাই স্বার্থ ত্যাগ করে নারীদের নিয়ে ভাবতে না পারি।

কৃষ্ণা দাস

তাই নারীদের নিয়ে আসলে নতুন করে আর কিছু বলার নাই৷ যা ভাবছি বা যা বলবো, তা এর আগেই বহু বার বহু ভাবে কেউ না কেউ বলেছেন। এই যে এতোবার বলা হয়েছে, এর পরেও প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই একই বিষয় নিয়ে আলোকপাত করতে হচ্ছে?

আমার কাছে কারণ অনেক সহজ, যেহেতু আমরা (নারী) সচেতন না এবং নারী একটি অত্যন্ত আলোচিত বিষয় (বিষয়বস্তু নারী হলে সবার নজর সহজে কাড়তে পারে) তাই আমরা সব কিছুতেই নারীকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করি।

আমরা নারীরা, গড়পরতায় বেশিরভাগ নারীরা জানি আমাদের এই সমাজ কিংবা রাষ্ট্র তার নিজের কতৃত্ব আর ক্ষমতার স্বার্থেই, পাশাপাশি তা প্রদর্শনের জন্যই দাবিয়ে রাখছে, তবু সমাজের রক্তচক্ষুর ভয়ে আর ‘ভালো মেয়ের’ ট্যাগ ধরে রাখতে এর বিরোধিতা করতে আমরা ভয় পাই। আমরা সবকিছুর সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে থাকি। ভাগ্য/কপালের লিখন ভেবে চুপচাপ মেনে নিতে থাকি সব অন্যায়, অবিচার। নিজেদের অস্তিত্ব অস্বীকার করি, নিজেরাই নিজেদের সাথে অভিনয় করতে থাকি। এর দায় অবশ্যই নারীদের।

ধর্ম বলি কিংবা সামাজিক আচার, সব জায়গায় নারীদের জন্যই সব আইন। আর আমরা চোখ বন্ধ করে তা মেনেও নিচ্ছি। একবার একটু জ্ঞান-বুদ্ধির বিকাশ ঘটিয়ে একটু খোলা মন নিয়ে ভাবতে শিখলে এই যে অবাধ অনাচার, তা খুব সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু না আমরা এর প্রতিবাদ কেন করবো? তাতে তো বাপ-দাদার নাম খারাপ হবে, সমাজের চোখে খারাপ হবো? কাজেই সেইফ জোনে থাকি।

কেন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায় না, এই আইন বা নিয়ম কেন নারীকেন্দ্রিক? কেন একই কাজ করলেও শাস্তির ব্যবস্থা দুই ধরনের?

এর মধ্য থেকে দু’একজন যখন প্রতিবাদী হয়ে উঠে তখন ওই চোখ বন্ধ করে সেইফ জোনে থাকা নারীরা সবার আগে হুঙ্কার দিয়ে উঠে৷ এরা ভীষণ ভয়ঙ্কর, আমি সমাজের নিয়ম থেকেও এদের বেশি ভয় পাই। কারণ এদের মানসিকতা বোঝার ক্ষমতা আমার নাই। এজন্যই নাই, এরা আসলে নিজেও জানে না, এরা কী চায়? হুংকার দিয়েও বা কী প্রতিষ্ঠা করতে চায়? বেশিরভাগ সময় এদের মুখের বুলিগুলো হয় অন্যের, শুধু এরা তোতাপাখির মতো করে বলে যায়। কাজেই এদের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসা বোকামি ছাড়া আর কিছু না।

আমার মনে পড়ছে, ছোটবেলায় আমি প্রতি বৃহস্পতিবার খুব নিয়মনিষ্ঠার সাথে ‘লক্ষীর পাঁচালি’ (হিন্দুদের ধর্মীয় বই) পড়তাম। বুঝতাম না, বড়রা বলতো পড়তে হবে, আমি তা পালন করতাম। একটা সময় পর আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, কেন এই বইয়ের সব আচার-নিয়ম-নিষ্ঠা নারীদের পালন করতে বলা হয়েছে? যখন বুঝলাম, নিজ দায়িত্বেই ওই বই পড়া ছেড়ে দিলাম। আমি এখনও পূজা করি, তবে তা আমার ইচ্ছেমতো, কোন নিয়ম মেনে না।

কাজেই সচেতনতা নির্ভর করছে ব্যক্তির নিজের উপর। আপনি জেনে-বুঝেও যদি সঙ সাজতে চান, সে দায় নিশ্চয়ই সমাজ বা রাষ্ট্রের না। আপনি সব অধিকার মনে মনে চান৷ শুধু অন্যের ঘাড়ে বন্দুক চালিয়ে, তা কি হয়? আর কতই বা হয়? অধিকার চাইলে নিজেই তা পালন করতে শুরু করুন, সমাজ আর রাষ্ট্রে কী করবে, তা বাদ দিন। নিজ নিজ ঘরে ধীরে ধীরে তা প্রতিষ্ঠা করতে থাকুন। শুরুতে সবাই তার বিরোধিতা করবে, স্বাভাবিক, নতুন সব কিছু গ্রহণে কিছুটা তো অনীহা কাজ করতেই পারে। পরিবেশ তৈরি করে বুঝিয়ে বলুন।

আমরা আধুনিকারা আজ ভুলতে বসেছি বেগম রোকেয়াকে। একবার ভেবে দেখুন ওই সময়ে, ওই পরিবেশে, ওনি যদি সাহস দেখিয়ে আমাদের পড়ালেখার সুযোগ করে না দিতো তবে আজ আমরা কোথায় থাকতাম। কাজেই আমি, আপনি তো আরেকটু সাহস দেখিয়ে নারীমুক্তির জন্য কাজ করতেই পারি৷
নারীমুক্তির কথা বলেছি, স্বেচ্ছাচারিতার কথা বলিনি। অনেকে নারীবাদ আর স্বেচ্ছাচারিতাকে একসাথে গুলিয়ে ফেলে, আদতে দুই ভিন্ন, অনেকটা আচার আর অনাচারের মতন।

আসুন আমরা সবাই মিলে সচেতন হওয়ার একটা ছোট্ট পদক্ষেপ নেই। প্রতি ঘরে ঘরে আমরা যখন সচেতন, তখন সমাজ আর রাষ্ট্র আপনাতেই সচেতন হয়ে যাবে। প্রয়োজন শুধু সচেতনতার পাশাপাশি সাহসিকতার। মুক্তিটা থমকে আছে, একটুখানি আলোর অভাবে।

শেয়ার করুন:
  • 256
  •  
  •  
  •  
  •  
    256
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.