ভালোবাসার খবরদারি

সুমিত রায়:

দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, বউ, প্রেমিকা, রবীন্দ্রনাথ — কোনোটাই আপনার বাপের জমিদারি নয়। খবরদারি, কর্তৃত্ব, জমিদারি ফলানোর পঁচা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে যত শীঘ্র সম্ভব নিজেকে মুক্ত করুন। নইলে খিস্তি অনিবার্য।

ভালবাসুন কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু ভালবাসা চাপানোর চেষ্টা করবেন না। কোনকিছু আপনার ভালো লাগতেই পারে, তাই বলে সেই ভালো লাগার দায় অপরকেও নিতে হবে কেন? আর কোনোকিছু আপনার ভালো লাগলে, বা কাউকে ভালবাসলে সেটা আপনার পৈর্তৃক সম্পত্তি হয়ে যায় না। আপনার যেমন দেশকে ভালবাসার অধিকার আছে, তেমনি অপর কারোর দেশকে ভালো না বাসারও অধিকার আছে। আপনার যেমন বাংলা বলার অধিকার আছে, তেমনি অপর কোনো বাঙালির চাইনিজ বলারও অধিকার আছে। আপনার যেমন তথাকথিত পরিশীলিত ভাষায় বলার, লেখার অধিকার আছে, তেমনি অন্যেরও তথাকথিত কুরুচিকর ভাষায় কথা বলার বা লেখার অধিকার আছে। আপনার ভালবাসা, ভালো লাগা আপনার কাছে, আমারটা আমার কাছে। তাই ভালবাসুন, কিন্তু চাপাচাপি করবেন না।

আপনার যেমন রবীন্দ্রনাথ পড়ার অধিকার আছে, আমার তেমনি না পড়ারও অধিকার আছে, কিংবা জাপানি ছড়া পড়ারও অধিকার আছে। আপনার যেমন “জয় শ্রীরাম” বলার অধিকার আছে, আমারও তেমন “আজাদি” স্লোগান দেওয়ার অধিকার আছে। আপনার যেমন আমাকে ভালবাসার অধিকার আছে, তেমনি আমারও অধিকার আছে আপনাকে ভালো না বাসার (ঘৃণা করা নয়, অবশ্যই)। এই সহজ সমীকরণটা বোঝার চেষ্টা করুন। যত শীঘ্র সম্ভব মাথায় ঢুকিয়ে নিন। নইলে পতন অনিবার্য। ভালবাসুন, মেলামেশা করুন; কিন্তু চাপাচাপি করবেন না। সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে, ভালবাসার দোহাই দিয়ে অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়ার অপসংস্কৃতি বন্ধ করুন।

সুমিত রায়

সংস্কৃতির কোনো মালিকানা হয় না। তাই নিজের পছন্দ-অপছন্দকে একমাত্র অনুসরণযোগ্য মহান ঐতিহ্য বলে সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটি ভয়ঙ্কর পুরুষতান্ত্রিক রোগ। এই চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতি বাইরে থেকে যতই জমকালো হোক না কেন, তা কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে অন্ত:সারশূণ্যই থাকে। তাই বাইরে থেকে কোনো আঘাত এলেই মুখোশ খসে পড়ে তার অসাড়তা বেরিয়ে পড়ে। আপনার সুমহান সংস্কৃতির এমনই বজ্র আঁটুনি যে এক রোদ্দুর রায়ের খিস্তিতেই সেই গেরো ফসকে গেল। এখন এক হাতে প্যান্টালুন, আর আরেক হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ মিছিলে হাঁটা ছাড়া আপনার আর গতি নেই। মানুষের মৌলিক অধিকার সম্পর্কেই আপনার সচেতনতা তৈরি হলো না, আপনি কীভাবে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হবেন? সংস্কৃতির নামে শুধু উৎসব পালন, আর দিবস উদযাপন করে তেলা মাথায় শুধু তেল দিয়ে গিয়েছেন। এবার আছোলা পিছন ধাওয়া তো করবেই।

শুধু উৎসব পালন, আর ‘দিবস’ উদযাপন — সংস্কৃতির নামে আমরা শুধু নেচে-কুদে আর ভাষণ দিয়েই বেড়াই। তাই ‘দিবস’ উদযাপনে আমাদের উৎসাহের কোনো সীমা নেই। কারণ ‘দিবস’ পালন জিনিসটাই খুব মাখো-মাখো একটা ব্যাপার। মাথায় ফুল গোঁজা, কস্টিউম জুয়েলারি, বউকে দিয়ে পাজামায় ডুরি পরানো, পাড়ার মোড়ে মোড়ে ভাঙা চৌকির মঞ্চ, ফাটা মাইক্রোফোন আর চোঙ, রাস্তার ধারে কিছু উদ্দেশ্যহীন লোকের অনিচ্ছাকৃত হাততালি, এইসব নিয়ে সারাবছর আমাদের বিশেষ ‘দিবস’ পালনটা বেশ ভালোই জমে ওঠে। কী রবীন্দ্র জয়ন্তী, কী স্বাধীনতা দিবস, কোনটাতেই আমাদের উৎসাহে কখনও ভাটা পড়ে না।

বাঙালির এই দিবস পার্বণে আরেকটি নতুন পদ যুক্ত হয়েছে — “নারী দিবস”। ‘দিবস”, তার উপর আবার “নারী”! একেবারে সোনায় সোহাগা। এমনিতেই নারী কিংবা নারী বিষয়ক যেকোনো কিছুতেই আমাদের উৎসাহ, আগ্রহ, কিংবা কৌতূহল সর্বদাই মাত্রাধিক থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই “নারী দিবস”এ নারী বিষয়ে বকুনি দেওয়ার সেই আদিম উৎসাহের একেবারে বাঁধ ভেঙে যায়। নারী কত সুন্দর, কত আকর্ষণীয়, কী অপূর্ব, কত মিষ্টি আর কিউট, কত সহনশীল, মমতাময়ী, নিষ্পাপ একটি বস্তু যা কিনা পুরুষের চাহিদা অনুযায়ী ভগবানের কারখানায় তৈরি করা ভগবানের শ্রেষ্ঠ উপহার — নারী দিবসে এইসব বস্তাপচা বুলি আওরে আমরা পাশের বাড়ির বৌদি পটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকি।

নারীদিবসের দিন হঠাৎ কিছু মানবতাবাদীরদের আবির্ভাব হয়। এই হঠাৎ মানবতাবাদীদের দেখলে আমার পরীক্ষার দিনগুলি মনে পড়ে। পরীক্ষা এগিয়ে এলেই দেখতাম সবাই পড়ছে শুধু আমি বাদে। তখন নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দিতাম, “যারা শুধু পরীক্ষার সময় পড়ে, তারা আসলে ফাঁকিবাজ। শুধু নম্বর পাওয়ার জন্য পড়ে। আর যারা সত্যিকারের ছাত্র তারা নম্বরের জন্য পড়ে না। প্রকৃত ছাত্ররা এমনিই সারাবছর ভালবেসে পড়াশুনা করে।” তাই নারী দিবস, রবি জয়ন্তী, কী স্বাধীনতা দিবস — সবই আমার কাছে একই মনে হয়।

নারী দিবস নিয়ে আমাদের ব্যাপক উৎসাহ থাকলেও, আমাদের সমস্যা যত ঐ “নারীবাদ” আর “নারীবাদী”দের নিয়ে। নারী দিবসে নারীর গুণকীর্তন করে, উৎসব, ভাষণ দিয়ে নারীকে বেশ সযত্নে পুনরায় সেই চেনাজানা পুরুষতান্ত্রিক খাঁচায় পুরে দেওয়া যায়। তাতে সাপও মরে, আবার লাঠিও ভাঙ্গে না। নারী-পুজো হলো, আবার সোনার খাঁচাও অক্ষত থাকলো। অনেকটা ঠিক অ্যানুয়াল রিনিউয়ালের মতো। অ্যানুয়াল রিনিউয়াল উইথ কন্ডিশন্স এপ্লাইড। অর্থাৎ বছরে একবার তোমার পুজো করবো, গুণ গাইবো, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপে গ্রুপে দারুণ পোস্ট শেয়ার করবো, আর তার পরিবর্তে তুমি আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে থাকবে। তোমায় আমি ভালবাসবো, নারী দিবসে একটু আধটু শ্রদ্ধাও জানাবো, তোমার নামে কবিতা লিখবো, গান বাঁধবো, মূর্তি বানাবো; আর তার বিনিময়ে তোমার ওপর আমি খবরদারি ফলাবো। তোমার ইচ্ছে-অনিচ্ছে বলে কিছু থাকবে না, এখন থেকে আমার ইচ্ছে অনুযায়ী তোমাকে চলতে হবে; কারণ আমি তোমাকে প্রচণ্ড ভালবাসি। আমি তোমাকে ভালবাসবো, আর তুমি সোনার খাঁচায় ডানা গুটিয়ে বসে থাকবে।

কিন্তু নারীবাদের কথা বলতে গেলেই তো পাখি হাতছাড়া হয়ে যাবে। তখন সোনার খাঁচা ভাঙারির দোকানে ওজন দরে বিক্রি করতে হবে। তাই নারীবাদ-এ আমাদের এতো ভয়, এতো আতঙ্ক। তাই যে সমাজে মহাসমারোহে নারী দিবস উদযাপিত হয়, সেই সমাজেই নারীবাদ আর নারীবাদীদের নিয়ে খিল্লি করা হয়। নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গেলেই তাকে ‘নারীবাদী’ বলে দেগে দিয়ে তাকে ‘কমন এনিমি’ বানিয়ে দেওয়া হয়।

নারীবাদী মানেই সে কোথাও সবার কাছে তামাশার বস্তু, নয়তো সে একটা ভয়ংকর থ্রেট। কারণ নারীবাদ সম অধিকারের কথা বলে, নারী-পুরুষ বিভাজন মুছে দিতে চায়, পুরুষতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠানকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, নারী-পুরুষের সমস্ত রকম সম্পর্কের মধ্যে দমন, পীড়ন, ও শোষণের দিকগুলোকে চিহ্নিত করে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ধাঁচা ভেঙ্গে সে মুক্তির সন্ধান করে, নিজেকে চেনার, বোঝার, আবিস্কার করার সংগ্রামে নামে, নিজের কথা, নিজের ভাবনা, ইচ্ছাগুলিকে সদর্পে ঘোষণা করে। ফলে সমাজ আতঙ্কিত হয়, প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তায় অভ্যস্ত মানুষ বিচলিত হয়ে পড়ে।

কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে নারীবাদ শুধু নারী বা পুরুষের সম্পর্কের মধ্যেই আবদ্ধ নয়। নারীবাদ আসলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের অধিকারের কথা বলে, ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলে, আর সমস্ত রকমের দমন-পীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলে। লিঙ্গের আগ্রাসন, যৌনতার আগ্রাসন, ভালবাসার আগ্রাসন, প্রেমের আগ্রাসন, ভাষার আগ্রাসন, দেশ ভক্তির আগ্রাসন, বিশ্বাসের আগ্রাসন, মতবাদের আগ্রাসন — এই সমস্ত ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই হলো ‘নারীবাদ’। তাই নারীবাদে শুধু নারীর মুক্তি নয়, এতে সকলের মুক্তি। নবজাগরণ পুরুষকে স্বাবলম্বী করলো, নারী নির্ভরশীলই থেকে গেল; মানবতাবাদ পুরুষকে মানুষ করলো, নারী অধমই থেকে গেলো; স্বাধীনতা পুরুষকে মুক্তি দিল, আর নারীকে সেবাদাসীতেই পরিণত করে রাখলো। একমাত্র নারীবাদ অপরের উপর প্রভুত্ব না করে সকলের মুক্তির মধ্য দিয়ে নিজের মুক্তির পথ খোঁজে।

তাই দেশ, কিংবা নারী — কোনকিছু নিয়েই করবেন না খবরদারি। দিবস, উৎসব উদযাপন করুন, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কোনোকিছুকেই নিজের পৈর্তৃক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলবেন না। সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষ সবকিছুই নিজের মতো চলবে। এই স্বাভাবিকতাকে মেনে নিতে শিখুন। মধ্যযুগীয় পিতৃতন্ত্রের গারোদ থেকে নিজেকে মুক্ত করুন।

লেখক: সুমিত রায়, পশ্চিমবঙ্গ

শেয়ার করুন:
  • 509
  •  
  •  
  •  
  •  
    509
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.