সত্য ঘটনা – ৪

রীমা দাস:

মৌ যেদিন ক্লাস নাইনে উঠলো ভালো রেজাল্ট নিয়ে, সেদিন আমাদের ছোট্ট ঘরে আত্মীয় স্বজনরা ভীড় করলেন। আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরে এরকম আনন্দ সচরাচর হয় না। মৌ আর মৌলি আমার মেয়ে। মৌ ছোটো, মৌলি বড়। মৌলি এতো মেধাবী নয়, তবে দেখতে খুব ভালো। গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুলে ওকে কখনও কখনও দেবীর মতো মনে হয়। আর মৌ একদম সাধারণ, গায়ের রং চাপা। আমার মন পড়ে থাকে সবসময় মৌলির কাছে। মৌ’কে আমি কখনও গুরুত্ব দেইনি। তবুও মৌ তার মেধার স্বাক্ষর রাখছে। সেবছরের জেএসসির রেজাল্ট তার প্রমাণ।

রেজাল্ট প্রকাশ হবার পর আমাদের কাছের আত্মীয়রা মিষ্টি নিয়ে দেখতে এলেন মৌ’কে। আমি আনন্দে আত্মহারা। রান্না ঘরেই কাটছে সময়। সবার জন্য চা নাস্তা বানানোতে ব্যস্ত ছিলাম৷ সেসময় হঠাৎ করে মৌ দৌড়ে এসে আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। কাঁপছিলো মেয়েটি। আমি ওকে সামনে আনতেই মেয়েটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম ওর চুলগুলো এলোমেলো, ঠোঁটের কাছে কালশিটে দাগ। কী হয়েছে জানতে চাইলে সে তার আপন ছোট মামার সম্পর্কে ‘বাজে’ কথা বললো। আমার মাথায় রক্ত উঠে গেলে আমি মেয়েটাকে আচ্ছা মতো মারলাম। বাথরুমে বন্দী করে রাখলাম। চা নাস্তা নিয়ে দিলাম সবাইকে। আমার আপন ছোট ভাই এর কাছে গিয়ে বসলাম। দেখলাম সে খুব স্বাভাবিক। আমার তাকিয়ে থাকা দেখে আমার ছোট ভাই বললো — “কিছু বলবি দি?” ওর স্বাভাবিক আচরণ আমার মনের মধ্যে কোনো রেখাপাত করলো না। বারবার নিজের মেয়ের উপর রাগ হতে লাগলো।

সন্ধ্যারও কিছু পরে সবাই যখন ফিরে গেলো যার যার বাসায়, আমি আর মৌলি তখন মৌকে নিয়ে বসলাম। দুজনে আচ্ছামতো বকলাম মৌ’কে। মৌ শুধু অবাক হয়ে তার মা আর বোনকে দেখেছিলো। এভাবে একসময় আমি ও আমার বড় মেয়ে ভুলে গিয়েছিলাম ঘটনাটা। মৌ কি সেই ঘটনাটা মনে রেখেছিলো তা আমার জানার প্রয়োজন ছিলো না। সময় বয়ে যাচ্ছিলো। বয়ে যাওয়া সময়ে আমার বড় মেয়ের বিয়ে হয় ধনী পরিবারে। আমরা দুজন খুব খুশি মেয়ের এতো ভালো বিয়ে হওয়ায়।

মৌ’কে আমরা বিশেষ আমি সেরকম সময় দেইনি, তার মনের খোঁজও রাখিনি। সে ঐদিনের পর থেকে হঠাৎ করেই বড় ও চুপচাপ হয়ে যায়। মৌলির বিয়ের পর মৌ একা হয়ে আমার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে। আমি ওর এই চাওয়াকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে ওকে একা বড় হবার পথ দেখাই। মৌলি প্রায়ই আসে আমাদের বাসায়, সাথে তার বর। অনেক রাত পর্যন্ত থেকে আড্ডা দিয়ে কোনও কোনও দিন মৌকে নিয়ে যায় তাদের বাসায়। আমি নিশ্চিন্ত মনে মৌকে তার বোন আর ভগ্নিপতির সাথে যাবার অনুমতি দেই।

একদিন দুপুরবেলা নির্জন ঘরে আমি একা বসে ভাবছিলাম আকাশ পাতাল ভাবনা। আমার চোখ বুঁজে গিয়েছিল কখন তা আমিও বলতে পারবো না। হঠাৎ বুকের মধ্যে চাপ অনুভব করে উঠে দেখি মৌ আমার বুকে। তার দুর্বল দুটো হাতে সে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে আর কাঁদছে। আমি উঠে জানতে চাইলাম।

যা শুনলাম তা বিশ্বাস করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি মৌ এর মুখ চেপে ধরে বললাম, এ ঘটনা কেউ যেন না জানে। মেয়েটা খুব কাঁদলো। বললো, আর যাবো না ঐ বাড়িতে। আমি শুনলাম না তার কথা। বড় মেয়ে যখনই বলতো আমি ছোটটাকে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিতাম। মৌ যখন বাসায় ফিরতো, তখন সে খুব ক্লান্ত থাকতো।

মৌ এর এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে ওকে নিয়ে আমরা গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেলাম। গ্রামের বাড়ির কারও সাথে তার ভাব হলো না। গ্রামের সমবয়সীরা তাকে জ্বীন ভূতে ধরা বলতে লাগলো। এর মাঝেই বড় মেয়ের ফোন পেয়ে আমরা দৌড়ে ছুটে এলাম শহরে। বড়মেয়ের আবদার “মৌ আমার কাছে থাকুক মা”। আমি তো আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। মৌ যেতে চাইলো না তার বড় বোনের বাসায়। আমি জোর করে পাঠালাম।

প্রায় পনেরদিন পর মৌ বাড়ি ফিরলো। কালো মেয়েটা আরও কালো হয়ে গেছে। চোখের নিচের কালো দাগগুলো তার অনিদ্রা আর দুঃশ্চিন্তার চিহ্ন বহন করছে। সেদিন রাতে মৌলি ও তার বর আমাদের বাসায় হাজির। তারা দুজন মিলে মৌকে অনেক মারলো। মৌ এর দোষ সে বড়বোনের বরকে ‘চরিত্রহীন’ বলেছে।আমরা তিনজন মিলে মৌকে পিটালাম। মৌ’র বাবা এসে মেয়েকে সরিয়ে নিলেন। মেয়ের মাথার উপর এখন তার বাবার হাত। বাবা-মেয়ে মিলে কেঁদে কেঁদে সারারাত কাটালো। আমার মনেও একপশলা ঝড় হয়ে গেলো। আমি কি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না? নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করছিলাম? নাকি ঝড় আসন্ন জেনেও ঝড়ের মধ্যে মেয়েকে একা পাঠিয়েছিলাম?

আজ সব প্রশ্ন অবান্তর। মেয়ে আমার হাসপাতালে। মেয়েটা একা হাসে, একা কাঁদে। ওর বাবা গেলে চুপ করে বসে থাকে। আর কোনো পুরুষকে সে সহ্য করতে পারে না। ডাক্তার এখন আমাকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছেন। আমি তো কিছুই খেয়াল করিনি। আমি তো দেখিনি আমার মেয়ের পরিবর্তন। দেখিনি কি? আসলে তো দেখেছি। মেয়ের এরকম মনোবৈকল্যের কারণ তো আমি জানি। আমি ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু হয়নি, হয় না।

[সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখা। আমরা মায়েরা আরও একটু সচেতন হই আমাদের মেয়েদের প্রতি। একটি ছোট্ট ঘটনা একটি মেয়ে শিশুর মনে অনেক বড় ধরনের রেখাপাত করতে পারে। শিশুটির মনোজগতে সেই ঘটনার গভীরতা কতটুকু তা বোঝার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। তাই সচেতন হই, চলুন, আগলে রাখি, আঁকড়ে রাখি, নিরাপদে রাখি আমাদের মেয়েদের।]

রীমা
১৬/০৩/২০২০
রাত ১২.২০

শেয়ার করুন:
  • 244
  •  
  •  
  •  
  •  
    244
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.