করোনা থেকে আসুন শুধু নিজে বাঁচি!

সুচিত্রা সরকার:

মেঘমল্লার ভূমিষ্ঠ হলো। তার আগেই হ্যাক্সিসল নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছি। বেশ গাব্বাসাইজ। চলেছে বেশ কদিন। পরে কিনবো কিনবো করে আর কেনা হয়ে ওঠেনি।

করোনার প্রতাপ আর প্রচারে বেরোলাম সেদিন ফার্মেসির উদ্দেশ্যে। একে পুরান ঢাকা। দুই এ ঘিঞ্জি এলাকা। সবই বেশি বেশি। ফার্মেসি এক কিলোমিটারের মধ্যে শ’খানেক। সবগুলোয় খোঁজা শেষ। শেষের দিকে ভিক্ষার মত চাইছিলাম।

কেউ দিতে পারলো না। শেষে লতিফ আংকেলকে (বাবার বন্ধু) বলে আসলাম, পরবর্তী লট এলে অবশ্যই একটা যেন রাখে বাবিনের জন্য। তিনি তিনটা ছোট হেক্সিসল, দুটো সেনিটাইজার রেখেছেন আমার জন্য।

মাস্কেরও একই অবস্থা। বেশি দাম দিয়ে কিনবো কেন? দশ টাকায় পেলাম এক দোকানে। তিনি বললেন, তিন টাকা লাভ করেছি। এরকম কিছু মানুষ আজও আছে?

আরণ্যক হবার পর থেকে ডেঙ্গু নিয়ে ডিপ্রেশানে ছিলাম। রাত জেগে মশা মারতাম। বেড়ালের মত হয়ে গেছি। অন্ধকারেও মশা দেখতে পাই। আমি খুঁজে খুঁজে দেই, সৌমিত্র মারে- এহেন দশা!

এবার কি করবো? অফিসে গেলাম পরদিন। সারাদিন ভালই নিয়ম মানলাম। বাসায় ঢোকার আগেই নাকে হাত ঘষলাম!
মেজাজটাই গেল বিগড়ে।

এদেশে, যেখানে এক মিনিট হাঁটলে দশ জনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে, সেখানে সঙ্গ-রোধ অসম্ভব।
সম্ভবের একমাত্র উপায়, বাসায় বসে থাকা। তাতে চাকরিটা চলে যাবে। না খেতে পেয়ে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী!

করোনা নিয়ে চমৎকার একটা ভিডিও দেখলাম আজ সকালে! একজন চিকিৎসকের। খুব মিহি মিষ্টি কণ্ঠে, কাদের করোনা হবে না এবং ইত্যাদি ইত্যাদি বয়ান দিয়ে চলেছেন। দারুন পারসোনালিটি। এমন লোকের প্রেমে ফুটফাট পরে যাই। এবার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।

ভদ্রলোক বললেন, যারা শিশু, তাদের হয় না। যারা তরুণ কিশোর, তাদের হয় না। ঝুঁকি কেবল বয়স্কদের জন্য। আর যাদের হার্ট, ফুসফুস, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগ আগে থেকে আছে, ঝুঁকি তাদের। সুতরাং ভয়ের কিছু নেই।

সেই চিকিৎসকের করোনা হবে না। তার কথা শুনে মনে হলো, তিনি উপরের কোনো ঝুঁকির পর্যায়েই পড়েন না। কিন্তু তাঁর কোনো আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবও কি পড়ে না এই তালিকায়?

বিপুল জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ। সবচে দূষিত নগরীর নাম ঢাকা। যেখানে ফুসফসের সংক্রমণ কম বেশি সকলেরই থাকতে পারে। আর হার্ট, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগী, সংখ্যায় কতো, তা হাসপাতালগুলোয় ঢুঁ মারলেই বোঝা যাবে। বা গুগল করলে!

তবু আমরা চিন্তা করবো না? কেন? নিজে বাঁচবো বলে? আশপাশের মানুষ, স্বজন, আত্মীয় যদি মরেই যায়, আমার বাঁচার মাহাত্ম্য তবে কী? যদি দেশের এক পারসেন্ট জনগণও ঝুঁকিতে থাকে, আমি কী করে নিশ্চিন্ত হই?

বলবেন যে সড়ক দুর্ঘটনায় এরচে বেশি মানুষ মরে। ভাইসব, বোনেরা আমরা, কোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুই আমার কাম্য নয়। তাই করোনায়ও নয়!

তিনি আরো বললেন, এদেশে তো ভয়ের কিছু নেই-ই। ২৩ ডিগ্রির ওপর তাপমাত্রায় করোনা ছড়াতে পারে না। মার্চের পর এদেশ থেকে আশংকা একেবারে কমে যাবে। সমস্যা শীতপ্রধান যেসব দেশে এখনো শীত রয়েছে।

ডাক্তারের দ্বিতীয় স্বস্তিবাক্যের উত্তরে বলি, শুধু দেশ বাঁচলেই কি হবে? পৃথিবীতে এখনো কত শতাংশ শীতের দেশে মানুষ বাস করে, ধারণা আছে? ওটা শুধু নিজের দেশ নয় বলে, নিজে সেখানে উপস্থিত নেই বলে, ওদের যা খুশি হোক?

মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব- একটা ফালতু টার্ম। অন্য পশু প্রাণীকে তো জিজ্ঞেস করিনি, তারা শ্রেষ্ঠ কিনা! নিজে নিজে বানিয়ে বসে আছি! চারপাশে মানুষ, সমাজের যা আচরণ দেখছি, শ্রেষ্ঠ কথাটা তো মানতে পারছি না।

একটা ভিডিও ধরে বললাম। আদতে সমাজের পরতে পরতে এই মানসিকতা। যে হারে হেক্সিসল মার্কেট আউট, যে হারে মাস্কের দাম বেড়েছে, যে হারে মানুষ স্বার্থপর- কিছুদিন বাদে দেশে মড়ক লাগলে কাফনের কাপড়ের ব্যবসায় নামবে এরা! কারণ এদের বাঁচার একটাই মন্ত্র- আসুন কেবল নিজে বাঁচি।

তাই তারা এখন বলছে, করোনা থেকে আসুন শুধু নিজে বাঁচি!

আর ফ্যাচফ্যাচ করে লাভ নেই। ইতোমধ্যে স্বার্থপর জনগণ বিরক্ত হয়েছেন। তাদেরকে বলি, নিজে বাঁচলে পরের ব্যবসাটা কার উপর চালাবেন? তারচে চলুন সকলে বাঁচি একসঙ্গে। দেশের। পৃথিবীর। যাতে আপনিও অল্প স্বল্প ব্যবসা করতে পারেন, অন্যরাও সুখে শান্তিতে বাঁচতে পারে!

শেয়ার করুন:
  • 101
  •  
  •  
  •  
  •  
    101
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.