নারীর অনিশ্চিত জীবন

তামান্না ইসলাম:

কয়েকদিন আগে একটা কাজে উবারে উঠতে হলো। রেন্ট-এ-কারের গাড়ি জমা দিতে গিয়েছিলাম, ফেরার পথে ওরা উবার ডেকে দিল।

চালক একজন বয়স্ক নারী। আমার সেদিন নানা কারণে মনটা একটু বিক্ষিপ্ত ছিল, কী মনে করে যেন চালকের পাশের সিটে বসলাম। এখানে সচরাচর যেটা করা হয় না, উবার বা ট্যাক্সি ড্রাইভারদের পাশের সিটে জায়গার অভাব না হলে কেউ বসে না। আমার মনে হয় একা লাগছিল, হয়তো কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। আর ওর পাশে বসে সেই প্রথম আমার বেশ অনুশোচনা হচ্ছিল যে কেন এতোদিন আমি কোন চালকের পাশে বসি নাই, ওরাও মানুষ, নিশ্চয়ই খারাপ লাগে।

‘তুমি কতদিন ধরে এই কাজ করো?’ এভাবে কথা শুরু হলো। তারপরে আস্তে আস্তে গল্প জমে গেলো। ওনি বেশ মিশুক। তার গল্প শুনে আমার সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অনেকগুলো ঘটনা হুড়মুড় করে মনে পড়ে গেল।

ওর বয়স ৭৪। একসময় কেশবিন্যাসের কাজ করতো। তিন মেয়ের মা, মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত, কর্মজীবী এবং সংসারী। বিভিন্ন বয়সের নাতি নাতনি আছে। বিধবা হয়েছে সাত বছর আগে। সে একসময় কাজ থেকে অবসর নিয়েছিল। তার স্বামী সংসারের আয়ের ব্যাপারটা দেখতো। সে নাতি, নাতনিদের যত্ন নিত। স্বামীর মৃত্যুর আগে সে তার ছোট মেয়েকে ডেকে বলেছিল, তার অবর্তমানে মায়ের দেখাশোনা করতে। মেয়ে থাকে অন্য শহরে।

কিন্তু ওই নারীটি রাজি হয়নি। সে তার নিজের ঘর, বন্ধু, আত্মীয় রেখে, পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। সে মেয়েদের বা কারও কাছ থেকে কোন সাহায্যও নিতে চায় না। তাই ৬৭ বছর বয়সে বিধবা হয়ে সে নতুন করে ভাবতে শুরু করে যে কী কাজ করে নিজের খরচ চালাতে পারে। তারই সূত্র ধরে এই উবার চালানো। সপ্তাহে চারদিন সে ১২ ঘণ্টা রাস্তায় থাকে, সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা। ঘরে বসে বসে একাকিত্বের অভিশাপ সে সহ্য করেনি, অন্যের বোঝা হওয়ার আত্মগ্লানি সে মেনে নেয়নি। সম্পূর্ণ স্বনির্ভর, সুখী, স্বাধীন একজন মানুষ। অসংখ্য চামড়ার ভাঁজকে ঢেকে দিয়েছে প্রাণখোলা হাসি, এমনকি রুচিসম্মত হাল্কা মেকআপও আছে যেটা নিজেকে ভালোবাসার, জীবনের প্রতি আগ্রহ বলেই আমি মনে করি।

শুরুতেই বলেছিলাম এই মহিলা সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা মনে করিয়ে দিয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরে আমি বেশ কিছু মহিলার অকাল বৈধব্য এবং ডিভোর্স দেখেছি। দেখেছি স্বামীর হটাত অসুস্থতায় উপার্জনের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পথে বসা স্ত্রীদের। কাছের বন্ধুদের কাছে গল্প শুনেছি স্বামী মারা যাওয়া বা ডিভোর্সের পর অর্থনৈতিক সঙ্কটের কথা। দেখেছি, স্বামীর অসুস্ততা বা মৃত্যুর পর সংসার চালানর জন্য মানুষের কাছে সাহায্যের হাত পাতা। এমনি এক মৃত্যুর সূত্র ধরে মনের ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছি। না, গৃহবধূদের আমি মানুষ হিসেবে অসম্মান করি না।

সন্তান লালন, পালন একটি যথেষ্ট কঠিন কাজ। কিন্তু এ কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো নারী মনে করে, আয় উপার্জনের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে স্বামীর এবং তার এ ব্যাপারে একদমই মাথা ঘামানোর কোন দরকার নেই, সে বিরাট বোকামি করছে।

ভবিষ্যতের কথা কেউ জানে না। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তায় হাবুডুবু না খেয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া ভালো। অবশ্যই মানসিক প্রস্তুতিটা সবার আগে জরুরি। আমি মনে করি এক্ষেত্রে স্বামীদেরও দায়িত্ব আছে স্ত্রীকে উপার্জনে উৎসাহিত করা, কাজের পথ সুগম করে দেওয়া অর্থাৎ সংসারের কাজে সাহায্য করা যেন স্ত্রী বাইরের কাজের সুযোগ পায়।

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে ‘never say never’। আমরা কেউ জানি না জীবন আমাদের জন্য কী নিয়ে অপেক্ষা করছে, তাই খারাপ পরিস্থিতির জন্য সবারই কম বেশি তৈরি থাকা দরকার।

শেয়ার করুন:
  • 526
  •  
  •  
  •  
  •  
    526
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.