ইশরাত জাহান ঊর্মির উপন্যাস একটি নারীবাদী পাঠ

রোখসানা চৌধুরী:

১. কেউ খুঁজছিল আলো (২০১১)

ইশরাত জাহান ঊর্মি ভিজুয়াল মিডিয়ার একজন পরিচিত মুখ এবং সাংবাদিক। তবে তার কথাসাহিত্যিক হিসেবেও পথটা খুব ছোট নয়। চারটি উপন্যাস, একটি ছোটগল্পের বই, একটি কলাম সংকলন রয়েছে তার রচনা সম্ভারে। বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নারীবাদ বিষয়ক টক শো ‘অন্যপক্ষ’ সঞ্চালনা করেন। নারীবাদ তার আগ্রহের মূল জায়গা। কিন্তু কোনো ব্যক্তি নারীবাদের ভাবনায় বিশ্বাসী হলেও তার লেখায় তা নাও উঠতে পারে। আবার হুমায়ুন আজাদের মতো বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে।
ইশরাত জাহানের উপন্যাস মূলত নারীর জীবনকে কেন্দ্রে রেখেই আবর্তিত হয়। কিন্তু নারীবাদী উপন্যাসের কি নির্দিষ্ট কোন পরিকাঠামো আছে? অথবা সংজ্ঞা?

বিশেষজ্ঞ মতের আলোকে বলা যায়, নারীবাদী উপন্যাস তাকেই বলা যাবে যেখানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অবস্থানকে তুলে ধরা হয় নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে। নারীবাদী গল্প-উপন্যাস, নাটক কিংবা কবিতায় উপস্থাপিত হবে নারীর আর্থ-সামাজিক বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি, এবং নারীর অধিকার বিষয়ক সংগ্রাম।
ইশরাত জাহান ঊর্মির উপন্যাস গুলোকে কি এইসব পরিকাঠামোয় ফেলা যাবে? দেখা যাক।

‘কেউ খুঁজেছিল আলো’ একান্তই রোকসানা হক তিতলির গল্প। এটি লেখকের প্রথম উপন্যাস। একার গল্প তার আশেপাশে যারা থাকে বা ছিল তাদের প্রায় দেখাই যায় না। যেটুকু দেখা যায় তা তিতলির চোখ দিয়েই। এমনকি গল্পের প্রধান চরিত্র বাদল তার প্রেমিক, পরবর্তী সময়ে স্বামী, তাকেও পুরোপুরি তিতলিই দেখায় আমাদের। যে কারণে পুরুষরচিত উপন্যাসে বর্ণিত ‘নারী চরিত্রের মতো একপাশ্বিক, এক রৈখিক, অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত এবং প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যায় বাদল চরিত্রটি।

বাদল কেন যে শুরুতে ভালো মানুষের ভান ধরেছিল, মিমি নামে বিবাহিত নারীর প্রতি প্রেমাসক্ত বাদলের মনের গোপন গহীন রহস্যটি অধরাই থেকে যায় শেষ পর্যন্ত। তিতলিকে ভালোবাসতে না পেরেও হয়তো চাপের মুখে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল বাদল। কিন্তু কেন, তা বোঝার উপায় থাকে না। তিতলি চরিত্রটি আমাদের অসম্ভব চেনা। আপনি, আমি কিংবা আমাদের আশেপাশে খুজলেই এমন কোন মেয়েকে পাওয়া যাবে না যে মেয়েটি রোমান্স ভালোবাসে না। কল্পনাপ্রবণ এই মেয়েরা মধ্যবিত্ত সমাজে বেড়ে ওঠে এক প্রস্থ নিরাপত্তায়, বাস্তব সমাজের সাথে যাদের যোগসূত্র প্রায় ঘটেই না। সাধারণত তারা এক গ্লাস পানিও ঢেলে খায় না। অনেক রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকলেও সত্যিকার অর্থে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীতেই বিচরণ করে। তাই তারা বেড়ে উঠতে উঠতে ক্রমাগত হোঁচট খায়, সংসারে বা কর্মক্ষেত্রে। বেশির ভাগ নারী কেবল বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা বা সেফটি জোন সামাজিক পরিচিতি কিংবা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে সেই বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। সহকর্মী, সন্তানের বেড়ে ওঠা কিংবা পরিজনদের প্রতিযোগিতায়, প্রতিবেশি, কলহ-কোন্দল, কেনাকাটায় একটা জীবন কাটায়।

এই উপন্যাসের রোকসানা হক তিতলি কিন্তু অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সুস্থির ভাবনা শেষে ‘নোরা’র পথে পা বাড়ায়। তবে সন্তানহীন তিতলির এই সংসার ভেঙে বেরিয়ে আসাটা কোন চমক জাগানিয়া ঘটনা মনে হয় না। এই ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে। তিতলির একতরফা প্রেম শুরু থেকেই আত্মমর্যাদা হানিকর ছিল। তিতলি বিয়ের আগেই অবমাননাকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে অসংখ্যবার। তাই বিবাহ পরবর্তী ‘শাশুড়ির সংসারে’ বহিরাগত হয়ে থাকাটা পাঠকের কাছে নতুন কোন পরিস্থিতি বলে মনে হয় না আর।

উপন্যাসটি অপূর্ণাঙ্গ মনে হতে পারে এর সমাপ্তির জন্য নয়। মূলত নিজেকে প্রকাশ করার ঝোঁকে চারপাশকে সম্পপূর্ণভাবে উপেক্ষা করার ফলে তিতলি হক শেষ পর্যন্ত মৃত্তিকাচ্যূত, কল্পনাবিলাসী, আবেগ জর্জরিত চরিত্রই থেকে যায়। বাদলের ঘর ছেড়ে আসাটা ‘আত্মমর্যাদার পুনরুদ্ধার’ জাতীয় কোন নারীবাদী মেসেজ পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে না। তবে লেখকের প্রথম উপন্যাস হিসেবে এটিকে পূর্বপ্রস্তুতির খসড়া বলা যেতে পারে। তার গল্প বলার ভঙ্গিটি সহজ এবং সাবলীল।

লাভজনক দিক হলো, খসড়া এই উপন্যাস থেকে জন্ম নেয় ভিন্ন দুটি পূর্ণাঙ্গ রচনা। একটি নারীর ঘরের জীবন দাম্পত্য, সন্তান, যৌনজীবন, যৌনতা বিষয়ক নানা জটিল ভাবনার প্রকাশ।
অন্যটিতে নারীর বাইরের জগৎ। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, নারীর নিঃসঙ্গ পথচলা।

২. ‘আবছায়া’ (২০১৫)

‘আবছায়া’ উপন্যাসটি বর্তমান কর্পোরেট মিডিয়ার চকচকে মোহজাগানো গতিময় জগতের ভেতরকার উন্মোচন।

লেখক উর্মি মূলত নারীর দৃষ্টিতেই নারীর জীবনকে অবলোকন করেছেন এখানেও। একজন নারী, সাংবাদিক হিসেবেই তুলে ধরছে তার ভিজ্যুয়াল মিডিয়া জগতের যাবতীয় সুখ-দুঃখ, হয়রানির কাহিনী।
তবুও ফোকাস পয়েন্ট নারীর জীবন। কর্মক্ষেত্রের জটিলতার গল্প। সবচেয়ে বড় কথা, প্রথম উপন্যাসের পর দীর্ঘ বিরতি শেষে (২০১১ থেকে ২০১৫) লেখকের গল্প বলার মূল জায়গায় পরিবর্তন এসেছে। এখানে নাজ এবং সৌমীর গল্প প্রধান হলেও পাশাপাশি এটা মনিদীপা কিংবা মালিহা জেসিন্তা নয়নাদেরও গল্প। গল্প আসলে কখনো একার হয় না। একার হলে তা পূর্ণাঙ্গ হয় না, বিশেষত নারীর। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিঃসঙ্গতাও নির্জন আর মৌন হয় না। পরাধীন বলেই সে আউটসাইডারের মার্সল হতে পারে না।

‘আবছায়া’ উপন্যাসের প্রধান দুটি চরিত্র নাজ ও সৌমী প্রত্যক্ষ করে কর্মক্ষেত্রেও ‘নারী’ পরিচয়ের জন্যই তারা অবজ্ঞা-উপেক্ষা কিংবা অবমাননাকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। ভিজ্যুয়াল মিডিয়া বলেই বাইরের দেখনদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা এই জগতে আরো অধিক। এবং অবশ্যইতা নারীর ক্ষেত্রে। সংবাদ পরিবেশন কিংবা সাংবাদিকতার সাথে যদিও সত্যিকার অর্থে বাইরের রূপের সম্পর্ক খুবই নগণ্য।
পুরুষতান্ত্রিক মেল শভিনিস্ট আচরণ, কাস্টিং কাউচ, বডি শেমিং, পিএনপিসি সবকিছুই এই জগতে বিদ্যমান।

স্বাধীনতার পর নারীর কর্মপরিসর ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ঘর বাইরের জগৎ সামাল দিতে গিয়ে মূলত নারীর জীবন জেরবার হয়েছে। তবে এই উপন্যাসে সংসার আর কর্মক্ষেত্রের সমন্বয় বিষয়ক জটিলতাটি ততোটা উঠে আসেনি। যতটা এসেছে কর্মক্ষেত্রে নারীর হয়রানির বিষয়টি। অতিরিক্ত কাজ করানো, রাতের শিডিউল বেশি দেয়া, প্রোগাম সেটিংএ স্বাধীনতা না দেয়া ইত্যাদি পুঁজিবাদী মনোভাবে কর্পোরেট চ্যানেলগুলোতে সংবাদ বিক্রিই মুখ্য বিষয়, তাই কখনো নারীর রূপ বিক্রিযোগ্য হয়, আবার কখনো কোন যোগ্যতা না থাকলেও ধনুকবেরের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। সর্বাগ্রে আছে নারীর বাড়তি পাওনা- ‘বেশ্যা’ ‘প্রসটিটিউট’ খেতাব পাওয়া। সুন্দর ফিগার, নারী-পুরুষ সবার সাথে সহজভাবে মেলামেশা করার পুরষ্কার স্বরূপ।
এই উপন্যাসে বর্তমান বাংলাদেশের সর্বাধুনিক কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি শক্ত হওয়া মানেই ক্ষমতায়িত হওয়া নয়। কারণ, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীটি রাষ্ট্র বা সমাজের, এমনকি ঘরের ভেতরকার কোন সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারে না। কর্মক্ষেত্রেও প্রকারান্তরে দাসত্ব মেনে সমঝোতা করে চলতে হয়, মেল শভিনিস্ট পরিবেশের সঙ্গে। লেখক অবশ্য কনফেস করছেন যে, একজন নারী সাংবাদিকও নেম, ফেম, মানির জন্যই এই জগতে প্রবেশ করে। কিন্তু আগাপাশতলা দুর্নীতি আর ভণ্ডামির সাথে একসময় আর মানিয়ে নিতে পারে না।

রোকেয়ার ‘পদ্মরাগ’ আর ‘সুলতানার স্বপ্নে’ কর্মজীবী নারীর অবয়বের কল্পিত রূপ তুলে ধরা হয়েছিল। শতাব্দীকাল পেরিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সর্বাধুনিক দেশে বসবাস করেও ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার ক্ষমতাবান বিলিওনিয়ার নারী শেরিল স্যান্ডবার্গ তার ‘লিন ইন’ বইতে কর্মজীবী নারীর জীবনের লক্ষ্য পরিকল্পনা, কণ্ঠস্বরের বিনির্মান বিষয়ে বলেছেন। একাগ্রতা, কর্মনিষ্ঠা, কখনো কখনো যোগ্যতার চেয়ে অধিক ‘কৌশলী’ হতেও পরামর্শ দিয়েছেন। কর্মক্ষেত্রের রেসে এগিয়ে থাকতে তিনি উপমা ব্যবহার করে বলেন, ‘আপনাকে যদি স্পেসশীপে ওঠার দুর্লভ সুযোগ দেয়া হয় তাহলে কোন প্রশ্ন না করে উঠে যাবেন, জিজ্ঞেস করবেন না কোন সিট পেয়েছেন?’ রোকেয়া শতাব্দী প্রাচীন, তার সীমাবদ্ধতা মানা যায়। কিন্তু শেরিলও বলেননি কর্মক্ষেত্রে আয়ুক্ষয়ী গতিশীলতা আর চাতুর্যের সাথে বাঁচতে বাঁচতে শরীর মনে যে বিষ জমা হয় তার সমাধান কোথায়? ডিটক্সিফিকেশনের নিমিত্তে এই উপন্যাসের নাজ চাকরি পরিবর্তন করে, আর সৌমী চাকরিই ছেড়ে দেয়। দুজনার পথ আলাদা হলেও লক্ষ্য এক।
দুজনারই এই সমঝোতা করতে না পারা বর্তমান রাষ্ট্রের পরিকল্পনাকারীদের জন্য অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে দিয়ে যায়।
এই উপন্যাসে ব্যবহৃত ভিজুয়াল মিডিয়ার বেশ কিছু টার্মিনোলজি টীকাভাষ্য দাবি করে। যেমন- ভক্সপপ, উভ, প্যাকেজ, রানডাউন ইত্যাদি।

৩. জেন্টলম্যান ওয়াক

এই উপন্যাসের প্রধান দুটি চরিত্র বিভা আর বর্ণা দুই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছে। বিভা আর বর্ণার যৌনভাবনা এবং যৌন অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসের বিস্তার। বর্ণা লেখকের মানস চরিত্র। যে চরিত্রটি তার প্রথম উপন্যাসের প্রধান চরিত্ররূপে বিবৃত হয়েছে।

সেখানে তিতলি অর্ধসত্যের দাম্পত্যকে গ্রহণ করেনি। ঘর ছেড়েছিল তিতলি। এই উপন্যাসের বর্ণা একই রকম দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করছে। কিন্তু কন্যা নিষাদের জন্য স্বামী-স্ত্রী দ্জুনই আপাত সম্পর্কের বাঁধনে আটকে আছে।

একটি বিষয় উল্লেখ্য, তিতলি কিংবা বর্ণার বিবাহিত জীবনে যৌন অভিজ্ঞতার কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। পাঠককে অনুমান করে নিতে হয়, দাম্পত্যের শীতলতা, মানসিক দূরত্ব তাদের শরীরী সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

এটা কি লেখকের ছুঁৎমার্গ হিসেবে ধরা যায়? পূর্ব প্রজন্মের আধা রোমান্টিক ভাবনার ভাষাগত জড়িমাময় প্রকাশ যা হুমায়ূন আহমেদে দেখা যায়। বিভা চরিত্রটি বর্তমান প্রজন্মের একটা অংশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। বিভারা প্রেমে বিশ্বাসী না, রোমান্টিকতা তাদের কাছে উদ্ভট অবাস্তব মর্ষকামী আচরণ বলে প্রতিভাত। তাই বিভা এমনকি প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ডের সাথেও শরীরী সম্পর্কে দ্বিধা করে না। অপরিচিত ছেলে বন্ধুদের সাথে একসাথে বসে উইকেন্ডের রাতে পার্টি করে, মদ খায়। কিন্তু ঐ পার্টিতেই বিভা অপরিচিত ছেলেদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়।

বিভা মামলা করতে চায়, তখনই প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ডের মুখোশ খুলে যায়, সে বলে এসব পার্টিতে এমনটা হতেই পারে, তাছাড়া বিভা তো বহু পুরুষের সাথে সম্পর্ক করে, কাজেই এটাই বা দোষের কি? সে তো কোর্টে তার কুমারীত্ব প্রমান করতে পারবে না। বন্ধু হলেও মামলার ভয় দেখানোতে সে তার পয়সায় মদ খেয়ে পার্টি করার খোঁটা দেয়। যেভাবে বর্ণাকে তার স্বামী তাচ্ছিল্যভরে বলে মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়ালেই বা লাভ কি? তারা তাদের পয়সায় সংসারে কোন অবদানটা রাখছে, নিজেদের বিলাস-ব্যসন বাহুল্য খরচ চালিয়ে নেয়া ছাড়া?

পার্টিতে ধর্ষণের ঘটনাটি সাম্প্রতিক সময়ের বহুল আলোচিত ভারতীয় হিন্দী ছবি ‘পিংক’এর কথা মনে করিয়ে দেয়। পার্টিতে গেলে, মদ খেলে, একাধিক সম্পর্ক রাখলেও একজন পুরুষ যেমন সহজলভ্য, ধর্ষণের যোগ্য হয়ে যায় না, নারীর বেলাতে কেন তা হবে, বিভাদের প্রজন্ম এভাবেই ভাবে।

বর্ণার সাথে বিভার পোশাক, ভাষা, রুচি-পছন্দে না মিললেও তাদের বন্ধুত্ব নিবিড়, তারা সোলমেট। বিভিন্ন ঘটনায় পরস্পরকে মনে মনে সমালোচনা করলেও বড় বিপদে তারা সিস্টারহুডের জন্ম দেয়। উপন্যাসের শেষে, আকস্মিকভাবে, একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে বর্ণার হাজব্যান্ডের সঙ্গে বিভা শরীরী সম্পর্কে যায়। কিন্তু ঘটনার এই টুইস্ট ঘটে যাবার পর বর্ণা এবং বিভা দুজনারই ভাবনায় বদল ঘটে। ধর্ষণের ঘটনায় বিভা ক্রুদ্ধ হয়েছে, দুঃখ পেয়েছে কিন্তু ভেঙ্গে পড়েনি। কিন্তু এই ঘটনায় বিভা অনুতপ্ত হয়, এই প্রথম শরীরী সম্পর্ককে ঘৃণার চোখে দেখে আর বোঝে, শরীর আর যৌনতাই শেষ কথা নয়, সম্পর্ক তার চাইতে বড়। বর্ণাও উল্টো দিক থেকে ভাবে, তার স্বামী মিলনের শরীর তো পচে যায়নি। তাহলে এসব ছুঁৎমার্গের কি মানে আছে, কি মানে আছে অর্ধসত্যে জীবন অপচয়ের?

আসলে পৃথিবীর চিরায়ত এইসব সম্পর্ক বিষয়ক জটিলতার কখনো শেষ হবার নয়। তাই এই বিষয়ে গল্প লেখাও শেষ হবে না, অবতারণা হতে থাকবে নব নব তত্ত্বের। বিভা আর বর্ণাদের নতুন পৃথিবী কেমন হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

রোখসানা চৌধুরী

ইশরাতের উপন্যাসের পাত্র পাত্রীর সাধারণত উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে বিচরণ করে। বাংলাদেশে এই শ্রেণী সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা খুব একটা ভালো না। দুর্নীতি কিংবা পুঁজিপতি হওয়া সবই একটা সিস্টেমের অংশ। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাসের চরিত্র বলেছিল, আজকাল আর শূন্য থেকে পরিশ্রমের মাধ্যমে কেউ ধনকুবের হয় না। আবার ধনকুবেরাও সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। সিস্টেম তাদের আটকে দেবে। সর্বত্রই আছে সিস্টেমের অদৃশ্য মার্জিনাল লাইন। কাজেই ধনীলোক মানেই মন্দ ভিলেন, এটা দরিদ্র দেশের রোমান্টিক ভাবনা। ঠিক একইভাবে ‘নারীবাদ’ একটি আধুনিক অভিধা হওয়ায় এবং এর সাথে নারীর আর্থ-সামাজিক ও শারিরীক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বিষয়টি জড়িত বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে চরম ট্যাবু কাজ করে। তারা নারীবাদ বিষয়টিকে মৃত্তিকাচ্যুত এলিট শ্রেণীর বিলাসী সমস্যা হিসেবে খারিজ করে দেয়।

অথচ তিক্ত সত্য এটাই যে, সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অবকাঠামো পরিবর্তনের আশায় বসে থাকলে নারী পিছিয়ে পড়বে আরো কয়েকশ বছর। একদিক থেকে কর্পোরেট অফিসে কাজ করা নারীর সাথে গার্মেন্টস কর্মী বা মাটিকাটা শ্রমিকের পার্থক্য শুধুই অর্থনৈতিক। কিন্তু তাদের প্রতি শোষণ-নির্যাতন, মজুরি বা কর্ম পরিবেশের বৈষম্যে তারা একই সমতলে।

প্রসঙ্গক্রমে ‘নারীবাদ’ সম্পর্কে একটি ভুল ব্যাখ্যা বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। অনেকেই শ্রমজীবী নারীর পিঠে সন্তান, মাথায় ইট মাটির ঝাঁকাওয়ালা ছবি দেখিয়ে বলে এরাই আসল নারীবাদী। কিন্তু ঐ নারীরা কি জীবনের এই সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত ছিল? এই জীবন কি তারা স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছে? নাকি তারা যাপন করছে শৃঙ্খলিত দাসের জীবন? তারা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আগপাশতলা ভিকটিম। যে সমাজ চায় নারী এভাবেই জীবনের বেদনাময় সংগ্রামে কখনো যেন মাথা উঁচু করে না দাঁড়ায়। নারীবাদী তাত্ত্বিকদের কাজ এই সংগ্রামের পথ অপেক্ষাকৃত মসৃণ করার দিক নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে একটা লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া যাতে লড়াইটা শেষ হয়।

তাত্ত্বিকরা বুদ্ধিজীবী গোত্রভুক্ত। মনে রাখতে হবে, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ কখনো কুবের মাঝির পক্ষে লেখা সম্ভব না। বাংলাদেশ সেই অদ্ভুত রাষ্ট্র, যেখানে মেয়র নিজের কাজটা না করলে প্রতিবাদ হয় না, কিন্তু নিজের কাজ বাদ দিয়ে চা বানালে লোকে কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে। ইশরাত জাহান ঊর্মিও তাই তার অভিজ্ঞতাপ্রসূত স্ব-শ্রেণী থেকেই অবলোকন করেছেন নারীর ভেতর-বাহির।

এ প্রসঙ্গে আরো একটুখানি আলাপ। তাহমিমা আনাম একবার গার্মেন্টস নারী কর্মীকে নিয়ে ছোটগল্প লিখতে গিয়ে তার শারিরীক তৃপ্তি/অতৃপ্তির প্রসঙ্গটি টেনে এনে তুমুল বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন।
নিশ্চয়ই শারিরীক তৃপ্তি-অতৃপ্তির বিষয়টি অর্থনৈতিক সমস্যা চাইতে বড় না। আবার এই বিষয়টি একইসাথে বহুকাল ধরে ঢেকে রাখা, আড়াল করে রাখা ট্যাবুর অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। এমন তো না যে, শ্রমজীবী নারীর শরীর ঊর্মি বর্ণিত বিভা-বর্ণার শরীরের চাইতে আলাদা ধাতুতে গড়া।

দারিদ্রে, শ্রমে-ঘামে, দুশ্চিন্তায় শ্রমজীবী নারীর উৎসব কি বন্ধ হয়ে যায়? উদযাপন কি ফুরিয়ে যায়? কিন্তু সেই সব ট্যাবু ভাঙার জন্য তসলিমা নাসরীনকে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়। অসংখ্য নারীবাদী এ্যাকটিভিস্টিকে সাইবার হ্যারাসমেন্টের শিকার হতে হয়।

সেদিক থেকে বিচার করলে ইশরাত জাহান ঊর্মির এই টেক্সটগুলো একটি ট্যাবু আক্রান্ত সময়ের ক্রান্তিলগ্নে মাইল ফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তত্ত্বের ফ্রেমে কথাসাহিত্য রচিত হয় না। সমাধানের পথ দেখানোও সাহিত্যিকের দায়িত্ব নয়। নতুন সময়ে নতুনতর বেদনায় আক্রান্ত রক্ত-মাংস-মজ্জায় পরাধীন মানুষের জীবনের অসহায়ত্বটুকু তুলে ধরেছেন লেখক।

আমরা অনুভব করেছি, সৌমী আর নাজের আধুনিক জীবন যাপনের পেছনের কারাগারে আবদ্ধ দাসখত লেখা দাসত্বের জীবন। আমরা দেখেছি, বর্ণা আর বিভার প্রথা ভাঙা র‌্যাডিক্যাল ভাবনার ছবি। যে ছবি শেষ পর্যন্ত মানুষের ভালো থাকার আকুতিকেই প্রকাশ করে। এই চাওয়াটুকু চিরকালীন, ক্লাসিক।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক

শেয়ার করুন:
  • 237
  •  
  •  
  •  
  •  
    237
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.