কতোটা দুর্গম পথ পেরিয়ে আজ এই নারী দিবস!

লিপিকা তাপসী:

প্রতিবারের মতো এবারও কেউ কেউ, আবার তার মধ্যে সেলিব্রিটি, মালিক নেতাও আছেন, যারা বলেছেন যে নারী দিবস না, মানুষ দিবস দরকার। তা ধুমছে শেয়ারও হয়েছে। সহমত ভাইবোনদের তো অভাব নেই! কারও তা মনে ধরেছে বলে শেয়ার করছেন। আবার কেউ কেউ এটাকে মশকরা করার দিবস হিসেবে ভাবেন। কেউ কেউ বলেন ‘নারী দিবস আবার কী জিনিষ? এটি থাকতে হবে কেন? আমি কোন নারী দিবস ফিবস মানি না। আমি মানুষ।’

আরে ভাইবোন, এই দিবসটিও মানুষ হিসেবে সমান অধিকারের কথাই বলে, বার বার বলেও কেন আপনাদের মস্তিষ্কে প্রবেশ করাতে পারছি না আমরা! আপনারা ভালো করেই জানেন যে, এই দিবসের একটি তাৎপর্য আছে, আছে অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস।

একসময় নারীদের ভোটের অধিকার ছিল না। নারীদেরকে দোররা মারা হতো, পাথর ছুঁড়ে মারা হতো, কন্যা সন্তান হলে জ্যান্ত কবর দেওয়া হতো, স্বামীর চিতায় জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হতো, বিধবারা দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারতো না, তাদেরকে হিল্লা বিয়ে দেওয়া হতো। আজকে যে নারীরা যেটুকু অধিকার ভোগ করছেন যেমন, ভোট দিতে পারছেন, শ্রমের মজুরি পাচ্ছেন, প্রসবকালীন ছুটি, সুস্থ-সুন্দর কাজের পরিবেশে নারীরা কাজ করতে পারছেন, তারা সকল পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে যেমন তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতা তেমনি আছে ৮ মার্চের অধিকার আদায়ের ইতিহাস।

১৯০৯ সালের ২৮ ফেব্রয়ারি নিউইয়র্কে ‘জাতীয় নারী দিবস’ হিসেবে প্রথম নারী দিবস পালন করা হয়।
১৯১০ খ্রিস্টাব্দে আগস্টে ডেনমার্কে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আমেরিকান সমাজতান্ত্রিকদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে জার্মান সমাজতান্ত্রিক লুইস জিটস আরেক সমাজতান্ত্রিক এবং পরবর্তীতে কমিউনিস্ট নেতা ক্লারা জেটকিন এবং কেট ডাঙ্কারের সমর্থনে বছরে একটি দিন আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব করেন। কিন্তু সম্মেলনে কোনো নিদিষ্ট তারিখ নির্ধারিত হয় না।

ফিনিস পার্লমেন্টের প্রথমবারের মত নির্বাচিত নারীসহ ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। নারীর ভোটাধিকার, এবং প্রার্থী হবার অধিকারসহ নারীর সার্বিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম কে এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। নারী অধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে এই প্রস্তাবে প্রতিনিধিরা সম্মত হন।

১৯১১ সালে প্রথমবারের মত কোপেনহেগেনের সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৯ শে মার্চ অষ্ট্রিয়াতে, ডেনমার্ক জার্মানী এবং সুইজারল্যান্ড নারী দিবস পালন করা হয়। এই র‌্যালিতে প্রায় এক মিলিয়ন নারী পুরুষ অংশগ্রহণ করে। শুধু অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়াতেই ৩০০টি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে নারীর ভোটাখিকার, প্রার্থী হওয়ার অধিকার, কর্মসংস্থান এবং সেক্স বৈষম্যর উপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রতিবাদ জানানো হয়। তবে আমেরিকানরা ফেব্রুয়ারির শেষ রোববার জাতীয় নারী দিবস পালন অব্যাহত রাখে।

১৯১৩ সালে রুশ নারীরা শান্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করেন ফেব্রুয়ারির শেষ শনিবার। ১৯১৪ সাল পর্যন্ত আরও কিছু ধর্মঘট, পদযাত্রা এবং প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু তার কোনটিই ৮ই মার্চ নয়। ১৯১৪ সালে রবিবার হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয় ৮ই মার্চ। যদিও বর্তমানে সারা বিশ্বে ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। ১৯৭৫ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে পালিত হয় দিনটি।

এই সংগ্রাম এখনো প্রাসঙ্গিক। দিনটি এখনো অর্থবহ। কেন-
-ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’ (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১ নামের সমন্বিত এ জরিপেবলা হয়েছে, ৮৫ শতাংশ নারীর উপার্জনের স্বাধীনতা নেই, ২৪ শতাংশেরই নিজের আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। মাত্র ১৫ শতাংশ নারী নিজের ইচ্ছায় উপার্জনের স্বাধীনতা পান।
-বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর নারী নির্যাতন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৮৭ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হন।
– আপনাকে ঘরের মধ্যে ১৮ ঘন্টা কাজ করেও বলতে হয় ’আমি কোন কাজ করি না‘
– সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকার থাকে না
– কোন বড় পদে উন্নীত হলে এখনো আপনাকে শুনতে হয় আপনি তা বস বা নেতার সাথে অনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে তা আদায় করেছেন
– নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও সামাজ তাকেই অপদস্থ করে
– সন্তান জন্ম দিতে মৃত্যু ঝুঁকি আপনিই নেন, দীর্ঘ ১০ মাস অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করেও সন্তানের আইনি অভিভাবক হতে পারেন না, সন্তানের নামের পরেও আপনার নাম ঝোলে না
– নারীর জন্যে নিরাপদ পরিবেশ থাকে না
– সন্তান লালন পালনের জন্যে চাকুরী নারীকেই ছাড়তে হয় অথবা কাজ বা ব্যবসার সুযোগই থাকে না।

তাই নারী দিবস আবার কী জিনিষ? এটি থাকতে হবে কেন? আমি কোন নারী দিবস ফিবস মানি না। আমি মানুষ।’ এসব বলা বন্ধ করেন। আরে ভাইবোন এই দিবসটিও মানুষ হিসেবে সমান অধিকারের কথাই বলে। তাই নারীদবসে বুকফুলিয়ে বলেন নিজের বৈষম্যের কথা, অধিকারের কথা। আর যারা এগুলো বলেন তারা না জেনে বুঝে বলেন অথবা তারা এই বৈষম্য সৃষ্টিকারীদের দলের একজন অথবা আপনার এই বৈষম্যের কথা স্বীকার করলে তাদের লস এজন্যে বলেন। আমি সবজায়গায় সমান সুযোগ চাই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.