সব দায় কি একা নারীর?

শামীম আরা নীপা:

একজন নারীর যখন বিয়ে হয় তখন তার পরিবার থেকে আশা থাকে যে সেই নারী তার স্বামী’র সংসারে সম্মানের সাথে স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকবে এবং মৃত্যুর সময় খাটিয়ায় করেই সেই স্বামীর ঘর সংসার থেকে কবরে যাবে – খুব অস্বাভাবিক চাওয়া কিনা জানি না, তবে চিন্তার ধরনটাকে কিন্তু অস্বাভাবিক লাগে না।
কিন্তু আমাদের সমাজে কি বিয়েটা এতোই সহজ স্বাভাবিক কিছু? কারো কারো ক্ষেত্রে বিয়ে সুন্দর ও স্বাভাবিক, কিন্তু তার হার খুব কম।

আমাদের দেশের সংস্কৃতি ইউরোপ আমেরিকার মতো না। আমাদের দেশে যে বিয়েগুলো হয় তার সাথে পরিবার যুক্ত থাকে। দুইজন ব্যক্তির দুইটা পরিবার। তাদের কথা বলা, আচার আচরণ, থাকা, খাওয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিন্ন মাত্রার হয়। এই ভিন্ন মাত্রাগুলোকে সংসারে পরিতৃপ্ত করতে হয়। এই ভিন্ন মাত্রাগুলো পরিতৃপ্ত করার দায়ভার বেশীটাই এসে পরে নারীর উপর। পুরুষ সেখানে অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে যেহেতু পুরুষটিকে তার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে থাকতে হয়না। মাঝে মাঝে শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যাওয়া আর চিরস্থায়ীভাবে শ্বশুরবাড়ি থাকা এক বিষয় কখনোই না।

শ্বশুরের মন রাখো, শাশুড়ির মন রাখো, দ্বেবর- ভাশুর, ননদ- ননাসের সাথে তাদের জীবনসঙ্গীদের মন রাখো, আরো আত্মীয় স্বজন আছে সেই পরিবারে তাদের মন রাখো – এসবের দায় কেবল নারীর।
মন রাখতে না পারলে শ্বশুরবাড়ির সবার থেকেও বেশী স্বামী’র মুখ বেজার। অভিযোগ উঠবে, সবাইকে পরিতৃপ্ত করে সবার মন রেখে মিলেমিশে থাকতে পারোনা? এমন কথা নারী কিন্তু পুরুষকে বলেনা। পুরুষ বিয়ে করে নারীর ঘরেও উঠতে চায়না, তার মা বাবা পরিবারের দায়িত্ব নিতে চায়না। পুরুষ ঘরজামাই নামক অজুহাত দেখায়। পুরুষের তাতে ঘর পরিবার বন্ধু সমাজের কাছে মান থাকেনা অথচ নারীর মান এতে বাড়ে যখন সে পুরুষের ঘর পরিবারকে নিজের করে নেয়- এ কেমন সমাজ ব্যবস্থা?

আচ্ছা বিয়েটা কি সবার মন রক্ষা করার জন্য? বিয়ে মানে কি একজন মানুষের সকল স্বকীয়তাকে বিসর্জন দেয়া? নারী পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই বিয়ে মানে পারস্পরিক সহাবস্থান যেখানে সম্মান, বিশ্বাস, ভালোবাসা, সংবেদনশীলতা, সমন্বয়, আপোষ, ত্যাগ থাকবেই কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সংসারে নারীর উপরই সব দায় কেন চাপিয়ে দেয়া হয়?

আমাদের দেশে নারীর ক্ষেত্রে ধর্মের রেফারেন্স বেশী দেয়া হয় যা পুরুষের বেলায় প্রায় অদৃশ্যমান অথচ ধর্মেও কোথাও এমন বলা নাই যে বিয়ে করে স্বামীর পরিবারের খেদমত করতে হবে কিংবা করা ফরয সুন্নত ওয়াজিব। ধর্মকে আসলে নারীর ক্ষেত্রে পুরুষতন্ত্র স্বার্থ অনুযায়ী ব্যাবহার করে থাকে।

ধর্মের অনেক জায়গায় বলা আছে নারীর সম্মানের কথা কিন্তু সেই সম্মান পুরুষ কিংবা সমাজ তাকে কোথায় দেয়? নারীর সাথে দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ’র ঘোষণা আছে বিদায়ী হজ্বের ভাষণেও, পুরুষের ভালোত্বের সার্টিফিকেট দিবে তার স্ত্রী – এমন কথাও বলা আছে, কন্যা তার পিতামাতাকে বেহেশতে নিবে –এমন কথাও বলা আছে কিন্তু সেসবের প্রয়োগ কোথায় সমাজে? নারীর সাথে ধর্ম মিলিয়ে সমাজ ও পুরুষতন্ত্র কেবল নিজের স্বার্থকেই পরিতৃপ্ত করে।

আবার যেই নারী- পুরুষ পরিবারের অমতে বিয়ে করে বসে তাদের প্রতি পরিবারের অসমর্থন এবং বিভিন্ন কটু কথার ঝড়ও বয়ে যায় বেশীরভাগ নারীর উপর। বিয়ে করে দুইজন মিলে কিন্তু দোষ হয় কেবল নারীর। নারীই যেন পুরুষকে এক সম্মোহনী শক্তি দিয়ে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়- নারীকে কতটা অপমানজনক অবস্থায় ফেলে দেয় ঘর পরিবার সমাজ। কোন কোন ক্ষেত্রে নারী পুরুষের পরিবার থেকে বিয়ে ভেঙে তালাক পর্যন্ত গড়ানোর সমস্ত চেষ্টা করা হয়। কি উপকার তাতে তারা কি কখনো ভেবে দেখেছে? ভাবেনি, তারা ভেবেছে নিজেদের অহংকার ইগো বিদ্বেষ আর জেদের কথা। পুরুষের চাইতে নারী বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন পরিস্থিতিতে। স্বামীর কান ভরে নারীর প্রতি বিদ্বেষ জাগানোই যেন পরিবারের মুখ্য ভূমিকা হয়ে দাঁড়ায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে।

বিয়ের পর একজন পুরুষকে কতবার বাচ্চা নেয়ার কথা শুনতে হয়? বাচ্চা কেন নিচ্ছে না, কিংবা বাচ্চা কেন হচ্ছে না – এসব প্রশ্ন কয়টা পুরুষকে শুনতে হয়? এমন নারী খুব কম পাওয়া যাবে যে বাপের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, আত্মীয় স্বজন, সমাজের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন শুনে নাই। ঘুরে ফিরে সংসার সন্তান সংক্রান্ত সকল দায় নারীর, পুরুষ চাকরী করে টাকা দিয়েই অনেকাংশে পার পেয়ে যায়।

অকারণে কেউ নিশ্চয়ই নারীকে ভিক্টিমাইজড দেখাবে না কারণ তাতে নারীরই অসম্মান হয়। একটা বিয়ে যখন দুইজনের দায়িত্ব সেইখানে নারী ভিক্টিমাইজড হয়ে পড়ে আমাদের সমাজে।

নুতন একটা সম্পর্ক যার নাম বিয়ে তার মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ দুইজনের পারস্পরিক সমঝোতার জন্য তো অনেকটা সময় প্রয়োজন হয় সেইখানে যদি পুরো পরিবারকে পরিতৃপ্ত করার দায়ভার এককভাবে এসে পরে কোন নারী কিংবা পুরুষের উপর তবে তারা পরস্পরকে বুঝবে কখন/ চিনবে কখন? সংসার করবে কিভাবে, সংসার বুঝবে কখন?

আমি যৌথ পরিবারের দম্পতিদের অনেককে বলতে শুনেছি যে, স্বামী-স্ত্রীর কোন প্রাইভেসি থাকেনা পারিপার্শ্বিক দেখতে দেখতে বুঝতে বুঝতে। আমাদের দেশের পরিবারগুলো বেশিরভাগই বুঝে না যে কোথায় থামতে হবে! কোথায় থামতে হবে তা স্বয়ং নারী পুরুষও বুঝে না। কোথায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না এবং কোথায় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, তা আমাদের পরিবার বুঝে না এবং বাম হাত ঠেলতেই থাকে জায়গায় অজায়গায়।

যৌথ পরিবার খুব জরুরি প্রতিটা মানুষের জন্য। সত্যিই। বিশেষ করে সন্তান লালনে পালনের জন্য যৌথ পরিবারের কোন বিকল্প নাই। আবার যদি কর্মজীবী বাবা মা হয় তবে তাদের সন্তানের জন্য যৌথ পরিবার অনেক সাহায্যে আসে। তাছাড়া মা বাবা’র সাথে থাকার, তাদেরকে দেখার দায়িত্ব তো সন্তানেরই। শুধু জানতে হবে কোথায় থেমে যাওয়া প্রয়োজন, কোথায় একটু একান্ত গোপনীয়তার সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। সবার সাথে মিলেমিশে থাকা প্রয়োজন স্বপ্রণোদিতভাবেই, কারো চাপের মুখে পরে নয় এবং এই মিলেমিশে থাকার জন্য দাম্পত্যকেও উপেক্ষা অবহেলা করা যাবে না। দাম্পত্যের ক্ষেত্রে অসংবেদনশীল হওয়া চলবে না।
যৌথ পরিবারে গভীর রাতের পূর্বে অন্য যেকোনো সময় যেকোনো প্রয়োজনে স্বামী স্ত্রী ঘরের দুয়ার দিলেই বাকি সদস্যদের কারো কারো মাথা পাগল হয়ে যায়। ছেলেকে বৌ নামক শাঁকচুন্নি কব্জা করে নিলো বুঝি ! অথচ এই দুয়ার দেয়াকে স্বাভাবিক বলে স্বীকৃতি দেয়াটাই সুস্থ দাম্পত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া- এই সুস্থ বোধ আমাদের পরিবারগুলোর হোক।

অনেক পুরুষ বলে স্ত্রী’র কাছে তার কিছু চাওয়ার নাই কেবল তার পরিবারের যত্ন নিবে – এ কেমন বিয়ে?!? স্ত্রী তো ঐ পুরুষের পরিবারকে বিয়ে করে নাই। তাহলে নিজেকে উজার করে পরিবারের যত্ন নেয়ার জন্য পয়সার বিনিময়ে সার্ভিস প্রভাইডার পাওয়া যায় তো, তবে বিয়ে কেন? বিনে পয়সায় একজন সার্ভিস প্রভাইডার কাম সেক্স ওয়ার্কার পাওয়া যায় বলে? কি চায় সেইসব পুরুষ?

যেসব পুরুষ বাহিরে বাহিরে বেশী থাকে তাদের স্ত্রীদেরকে বলা হয়, স্বামীকে ভুলিয়ে ভালিয়ে আঁচলের তলে লুকিয়ে রাখতে নইলে অন্য নারী স্বামীটিকে হরণ করে নিবে! এ কেমন কথা? স্বামীকে ভুলিয়ে আঁচলের তলে কেন রাখতে হবে? সমাজ ধরেই নিচ্ছে পুরুষ বহুগামী এবং তাকে ধরে বেঁধে না রাখলে সে পিছলে আরেক নারীর যোনীতে গিয়ে ঢুকবে! এ তো নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই অসম্মানজনক অভিগমন। আবার কেউ কিন্তু পুরুষকে বোঝায় না তার বহুগামিতার ব্যাপারে, বরং নারীকেই বলে তার চাতুরি, তার শরীর, তার সেবাযত্ন এবং সর্বোপরি সন্তান দিয়ে পুরুষকে ধরে রাখতে!

পুরুষ রাগ করে, খামখেয়ালিপনা করে, ইতরামি করে – বলা হয় পুরুষ কিছু বুঝে না, তাদের কাণ্ডজ্ঞান কম, তাই স্ত্রীকে কখনো কখনো মা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তাকে বুঝে বুঝিয়ে সংসার করতে হয় – তওবাস্তাগফিরুল্লাহ। নারী খামখেয়ালি করলে তাকে শুনতে হয় ‘বেশ্যা‘ আর পিঠে পরে তাল। এতো দায় কেন নারীর? আর এতো ছাড় কেন পুরুষের?

সংসারে পুরুষের কোন দোষ থাকে না, যত দোষ তার সব নারীর কারণ ঘর সংসারের সকল দায় নারীর কিন্তু নারীর সিদ্ধান্ত নেয়ার এবং সিদ্ধান্ত দেয়ার কোন অধিকার থাকেনা। নারীকে অনুমতির মুখাপেক্ষী হতে হয় বারবার। এ কেমন অন্যায্য সমাজব্যবস্থা আর কেমন গৃহ পরিচালনা?

স্বামী অপমানজনক কথা বলবে, আচরণ করবে, মারবে পিটবে আর সেই স্বামীর সম্মান রক্ষা করার জন্য স্ত্রী টি একটা টু শব্দও করতে পারবেনা এবং একইভাবে স্ত্রী স্বামীর উপর মানসিক বুলডোজার চালাবে, কখনো মারপিটও করবে কিন্তু স্ত্রীর সম্মানের জন্য স্বামী ‘আমার বৌ মহান, আমার বৌ মহান’ বইলা নাচবে সেইটাও বা কেমন বিচার?

স্বামী বাইরে পরকীয়া করবে আর স্ত্রীকে সেই স্বামীর ফিরে আসার জন্য নানান কসরত করতে হবে কেন? এমন নারীদের উপর পরিবারের চাপ থাকে কুলটা স্বামীকে ঘরে ফিরিয়ে তার সাথে সম্মানের সাথে সংসার করার। নারীর অবস্থানটা কোথায়, বোঝা যায়? সব দায় কেবল নারীর, নারীর কোন আত্মসম্মানবোধ নাই, তার আছে শুধু দায় আর সব ফর্মে দাসত্ব করার সামাজিক নিয়ম- কেমন অসভ্য আবদার এসব কোন নারীর প্রতি!

স্বামী স্ত্রীকে ধর্ষণ করে – এই কথা শুনে পরিবার ও সমাজ পাগল বলে সেই স্ত্রীকে। পুরুষের হোক নারীর শরীর ভোগ করার তাই এই ধর্ষণের তো কোন স্বীকৃতিই নাই বরং নারীকেই আবারও দায়ী করা হয় এমন পরাবাস্তব কথা বলার জন্য।

স্বামীর পরিবারের অন্য পুরুষের দ্বারা নারী যৌন হেনস্থার শিকার হয়, সেইক্ষেত্রেও নারী কোন সাহায্য সমর্থন পায়না বরং বলা হয় – সেই নারীই প্রলুব্ধ করেছে অপর পুরুষকে, সুযোগ দিয়েছে। সব দোষ নারীর, সকল দায় নারীর।

আমাদের সমাজে, আমাদের পরিবারগুলোতে আরো বহুমুখী অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন হয় নারীর উপর যার কোন স্বীকৃতিই নাই আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এবং কোন প্রতিকারও নাই। নির্যাতন ও সহিংসতার কোন সুষ্ঠু সমাধান নাই যার জন্য নারীই ক্ষতিগ্রস্ত হয় আবার সেই নারীই দায়প্রাপ্ত ও দোষের ভাগী হয়।

নারীর কাঁধে একক দায়িত্ব ও দোষ দেয়া বন্ধ করুন। পুরুষকে শেখান কীভাবে দায়িত্ব নিতে হয়, কীভাবে দোষ নিতে হয়, কীভাবে সমন্বয় করতে হয়, কীভাবে পারস্পরিক সম্মানবোধের সাথে পরমতসহিষ্ণুতার সাথে নারীর সাথে সংসার করতে হয়। পুরুষ যেদিন এসব শিখে যাবে লিঙ্গ বৈষম্য সেদিন থেকে মাইনাসের ঘরে চলে যেতে থাকবে এবং তখন আর এই একই পুরনো কথাগুলো আমাদেরকে বার বার বলতে হবে না আশা করি।

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.