রুবানা হক “রুগ্ন পিতৃতন্ত্রের প্রিয় সেবাদাসী”

অনন্য আজাদ:

মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব কৌশলে রুবানা হক’কে বিজিএমইএর গদিতে বসিয়ে দেন। শেখ হাসিনা বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দেন- তিনি রুবানা হকের মাধ্যমে আবারও নারীর ক্ষমতায়ন করেছেন।

তখন রুবানা হককে গদিতে বসতে দেখে নারীবাদীরা খুব ভক্তির সাথে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তখন নারীবাদীদের মনেই হয়নি যে, রুবানা হক “রুগ্ন পিতৃতন্ত্রের প্রিয় সেবাদাসী।”– হুমায়ুন আজাদ।

গতকাল পর্যন্ত নারীবাদীরা রুবানা হকের বক্তব্যকে নারীর অগ্রগতি হিশেবে বোধ করতেন। প্রায় সময়ই রুবানা হকের অতি সাধারণ কথাও খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে উক্তি হিশেবে ব্যবহার করতেন। কিন্তু, গতকাল, রুবানা হক ‘নারী অধিকার মানবাধিকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এক অবার্চীন বক্তব্য পেশ করেন, যা নারীবাদীদের ক্ষিপ্ত করে তোলে। অধিকাংশ দেশীয় নারীবাদীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- তারা দূরদর্শী নয় এবং গোঁড়ায় আঘাত দেওয়ার মতো শক্তি ও সাহস অর্জন করেননি। যার ফলে নারীবাদী আন্দোলন বদনবইয়েই (ফেসবুক) সীমাবদ্ধ। যেহেতু তারা দূরদর্শী ও সূক্ষ্ম চিন্তার অধিকারী নন, সেহেতু তারা বোধ করেন কোন নারী কোন প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার অর্থই হলো নারীর ক্ষমতায়ন। যা সম্পূর্ণ ভুল।

প্রথমত, রুবানা হকের উচিত ‘নারী অধিকার মানবাধিকার’ অনুষ্ঠানে তাও আবার নারী দিবস উপলক্ষে, তার দেওয়া বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়া। একুশ শতাব্দীতে এসে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে নারী দিবস কেনো হয়, দরকার কী- তাহলে বুঝে নিবেন যে, সে একজন অশিক্ষিত ও ইতিহাসবিমুখ পুরুষতন্ত্রের রক্ষক।

নারীদের উচিত রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, ধর্মগ্রন্থকে কট্টর সমালোচনা করা, প্রতিষ্ঠানসংস্থার নিয়মনীতি পদ্ধতির আগাগোড়া ধুয়েমুছে ফেলা, সমাজের প্রতিবন্ধকতা, লিখিত-অলিখিত আইনকানুন, ভদ্রতা-সভ্যতার সংজ্ঞাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া, অথচ বাঙলাদেশের নারীবাদীরা নীতির প্রশ্নেও একাধিকভাবে বিভক্ত। যার ফলে, পুরুষতন্ত্রের পুরুষ ও নারী রক্ষকেরা নারীবাদী আন্দোলনকে ভিন্নদিকে প্রবাহিত করতে প্রায় সময়ই সক্ষম হয়।

যেই গার্মেন্টস কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের উপর দেশ দাঁড়িয়ে আছে, সেই কর্মীদের বুকফাটা যন্ত্রণা নিয়ে নারীবিদ্বেষী, অযৌক্তিক, ইতিহাসবিমুখ বক্তব্য প্রদান করে অশ্লীল হাসিতামাশা করা শোভা পায় না।

একদিকে, আহমদ শফী নারীদের বলেন- তেঁতুল। আরেকদিকে, রুবানা হক বলেন- নারী দিবসের প্রয়োজন নেই। অথচ, প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস আগে “বিএসআরএম মিট দ্য এক্সপার্ট” শীর্ষক অনুষ্ঠানে রুবানা হক বলেন, ‘নারী বলে দ্বিগুণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।’ (অর্থনীতি, প্রথম আলো, ১৫ অক্টোবর ২০১৯) এই যে বাঙালির দ্বিচারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, এই বৈশিষ্ট্যের কারণেও নারীরা পুরুষের দ্বারা নানাভাবেই বিদ্রূপে পরিণত হয়। এমন নয় যে, পুরুষেরা এক কথার মানুষ, কিন্তু এই রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে শুরু করে সমাজব্যবস্থা, ধর্ম সব কিছুই নারীর প্রতিকূলে থাকার কারণে নারীরা আরও বেশি শোষণের শিকার হয়।

রুবানা হক আরও বলেন, ‘নারী নেতৃত্ব থাকলেই যে নারী ক্ষমতায়ন হবে, সেটা ঠিক নয়।’ তাহলে কী বলা যায়, রুবানা হক নিজের সম্বন্ধে অবগত? এটাও তো বলা যেতে পারে যে, তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য নানা সময়ই নানা ধরণের চমৎকার সকল কথা বলে দর্শকপ্রীতি অর্জন করতে সক্ষম। লজিক্যাল ফ্যালাসির কাতারেও তার অনেক বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়।

হাজার বছর ধরে নারীর সাথে যেই লৈঙ্গিক বৈষম্য, নিপীড়ন, অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শোষণ হয়ে আসছে তার জাগরণই নারীবাদ।

শেয়ার করুন:
  • 378
  •  
  •  
  •  
  •  
    378
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.