আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২০ এর শুভেচ্ছা

সুপ্রীতি ধর:

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২০ এর প্রতিপাদ্য হচ্ছে #EachForEqual, এর বাংলা করা হয়েছে, ‘সবার জন্য সমতা’। বলা হচ্ছে একটি সমতাপূর্ণ বিশ্ব মানেই একটি সক্ষম বিশ্ব।

তো, প্রশ্নটা এখানেই আমার যে দীর্ঘদিনের বহুলচর্চিত পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক চিন্তা ও ধ্যানধারণায় সমৃদ্ধ কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে হঠাৎ করে ‘নারী-পুরুষ সবার জন্য সমতাপূর্ণ রাষ্ট্র’ গঠন কি সহজসাধ্য? আমাদের অতীত, বর্তমান ইতিহাস কী বলে? তার উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে আমরা কতোটুকু সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো সবার জন্য। আপাতদৃষ্টে এই সমতা শব্দটি একটি ‘মিথ’ ছাড়া কিছুই নয়। যে রাষ্ট্রের ভিত্তিই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে, সেই রাষ্ট্র একরাতের ব্যবধানেই সাম্যাবস্থা জারি করে ফেলবে, এটা মিথ ছাড়া আর কী! বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই চাওয়াকে ইউটোপিয়ান বলেই মনে করি। তবে এও সত্য যে এরকম একটি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা অসাধ্য ছিল না। মন্দের ভালো যে দেরিতে হলেও রাষ্ট্রগুলো উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে নারীর প্রতি সমতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সমগ্র মানবজাতিই ধ্বংসের মুখে পড়তে বাধ্য।

এখন একটু দেখি কী বলা হচ্ছে এই সমতাপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে-

ব্যক্তিগতভাবে আমরা সবাই আমাদের নিত্যদিনের চিন্তাভাবনা এবং কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী। আমরাই পারি সক্রিয়ভাবে যেকোনো স্টেরিওটাইপকে বেছে নিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাতে, পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, নিজেদের ধারণাকে সম্যক উপলব্ধির মাধ্যমে বিস্তৃত করতে, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে এবং সর্বোপরি নারীর অর্জনকে উদযাপন করতে।
এটা গেল ব্যক্তিগতভাবে পারার কথা। সামষ্টিকভাবে আমাদের প্রত্যেকেই পারি এমন একটি বিশ্ব তৈরি করতে যেভাবে জেন্ডার সমতা বিরাজমান। কিন্তু যখনই সমষ্টির কথা বলা হলো, বিপত্তিটা বাধলো সেখানেই।

বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত কথাগুলো কেবলই ‘বুকিশ’ কথামালা বলেই মনে হবে সবার। কারণ এই প্রতিযোগিতামূলক পুঁজিবাদী বিশ্বে মানুষে মানুষে সমতা কে চায়! ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র, যারা নারী-পুরুষের সমতা নির্ধারণ করতে বদ্ধপরিকর ছিল, অন্তত তাদের ইশতেহারে ছিল, সংবিধানে ছিল। যদিও সেখানেও ছিল নানান ধরনের বৈষম্য। কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বৈষম্য জিইয়ে রেখে শুধুমাত্র নারী-পুরুষে সমতা আনা সম্ভবপর হয় না। সোভিয়েত ইউনিয়নেও হয়নি।

কিন্তু একটি জেন্ডার সমতাপূর্ণ বিশ্ব আমরা নির্মাণ করতে কেন পারবো না! কারণ, জেন্ডার সমতা একটি দেশের তথা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি এবং কমিউনিটির উন্নতির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এটা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত তথ্য। জেন্ডার সমতাপূর্ণ বিশ্বই হয়ে উঠতে পারে স্বাস্থ্যকর, সমৃদ্ধশালী এবং সবার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন।

তাহলে আমাদের লক্ষ্যটা হচ্ছে জেন্ডার সমতাপূর্ণ কর্মক্ষেত্র, জেন্ডার সমতাপূর্ণ সরকার, গণমাধ্যম, গণমাধ্যমের সম্প্রচারে জেন্ডার সমতার প্রতিফলন, স্বাস্থ্য এবং ধনসম্পদে জেন্ডার সমতা। সুতরাং আসুন, আমরা এমন একটি বিশ্বের জন্য এখন থেকেই কাজ করি।

এদিক দিয়ে কানাডায় এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যে প্রতিপাদ্যটি বেছে নেয়া হয়েছে, সেটি বেশ মনে ধরেছে। বলা হয়েছে, BecauseOfYou’, ‘তোমার জন্য হে নারী—আমাদের যা কিছু অর্জন’- সেগুলো সবাইকে জানাতে চায় কানাডা। আর সেটি করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চালু করেছে হ্যাশট্যাগ #BecauseOfYou.

কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর এর কথার রেশ ধরেই বলছি, আন্তর্জাতিক নারী দিবস- International Women’s Day – সবার কাছে একই রকম অর্থ নিয়ে আসে না। দেশভেদে, মানুষভেদে, মানুষের শ্রেণীভেদে এর অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হয়, এর উদযাপনও ভিন্ন হয়। মাতৃভূমি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের যে অর্থ কিংবা গুরুত্ব, আবাসভূমি কানাডায় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। হয়তোবা পশ্চিমা দেশগুলোর কাছেই ভিন্ন অর্থ বহন করে।
কানাডার কাছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস কী? কানাডার কাছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হচ্ছে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অর্জনের স্বীকৃতি এবং তা উদযাপন, যা কিছু এখনো করা বাকি, সেগুলো চিহ্নিত করে সে সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি।
সচেতনতা তৈরির বিষয়টা বুঝলাম, কিন্তু নারীর অর্জনের উদযাপনটা কীভাবে হবে?

রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজ, এমনকি ব্যক্তি জীবনে ‘চেঞ্জমেকার’ হিসেবে ভূমিকা রাখা নারীদের কথা এই হ্যাশট্যাগে বলতে বলছে কানাডা। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বলছে, সকল লিঙ্গের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সমতা অর্জনে ভূমিকা রাখা নারীদের কথা সমাজকে জানাও, তাদের কথা সবাইকে বলে দাও।

রাষ্ট্র নিশ্চয়ই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভূমিকা রাখা নারীদের কথা বলবে, জনপ্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ এলাকার চেঞ্জমেকার নারীদের সম্পর্কে বলতে, জানাতে শুরু করেছেন। বাঙালি অধ্যুষিত স্কারবোরো সাউথ্ওয়েষ্টের এমপি এবং ফেডারেল মন্ত্রী বিল ব্লেয়ার তাঁর নির্বাচনী এলাকার ‘চেঞ্জ মেকার’ পাঁচ নারীকে নিয়ে সামাজিক যোগযোগের মাধ্যমে পোষ্ট দিতে শুরু করেছেন। প্রথম দিনেই তিনি যে নারীর কথা বলেছেন, তিনি আফসানা চৌধুরী, একজন বাংলাদেশি কানাডীয়ান।

আবারও ফিরে আসি শুরুর প্রসঙ্গে। #EachforEqual হচ্ছে সামষ্টিক ব্যক্তিবাদ বিষয়ে। বলা হচ্ছে আমরা সবাই একটি সামগ্রিক সত্তার অংশ। আমাদের ব্যক্তিগত পদক্ষেপ, আলোচনা, আচরণ এবং মানসিকতা সবই প্রভাব ফেলে বৃহত্তর সমাজে। এবং এই কারণেই সামষ্টিকভাবেই আমরা পারি পরিবর্তন আনতে। তার মানে, ব্যক্তিগত নয়, সামষ্টিকতার ওপর জোরারোপ করা হয়েছে এবছর।

যেসব সংস্থা বা সংগঠন কাজ করবে এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে, তাদের কাজ কেবল দিবসটিকে ঘিরেই নয়, বরং পুরো বছর ধরে তারা কাজটি সম্পন্ন করবে। কারণ নারীর সমতা কোনকিছুর জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না। এজন্য সবাইকে সকল সময় এবং সর্বত্র চিন্তা করতে, অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করবে রীতিমতোন।
সুতরাং কিছুটা আশা থেকেই যায় যে একদিন এই বিশ্ব সাম্যের বিশ্ব হবে, সমতাই হবে মূলমন্ত্র। সবার সমান অধিকার থাকবে, সবাই তাদের প্রাপ্য সমানভাবে যুঝে নেবে।

উইমেন চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে সবাইকে আবারও নারী দিবসের শুভেচ্ছা ও ভালবাসা।

শেয়ার করুন:
  • 629
  •  
  •  
  •  
  •  
    629
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.