চলো, বদলে যাই!

জেবুন্নেছা জোৎস্না:

বিশ্বজুড়ে নানা দিবস পালনের মধ্যে নিঃসন্দেহে নারী দিবস খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সমাজে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি, লিঙ্গ সমতার অধিকার আদায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এ দিবসটির উদ্দেশ্য। কয়েক যুগ আগে কবি নজরুল ইসলাম তাঁর নারী কবিতায় লিখে গেছেন,

‘সাম্যের গান গাই –

আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।

বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,

অর্ধেক তার নর।’

—-কিন্তু আমরা নারীরা এ কথাগুলো কতটুকু বিশ্বাস করি? যদিও দিন পাল্টেছে; মেয়েরা আগের তুলনায় অনেক স্বাবলম্বী এবং আত্মবিশ্বাসী এখন, তথাপি আজও অনেক মেয়েরাই সমাজে এবং সংসারে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের শিকার। আমরা সমাজ অথবা সংসারকে বদলাতে পারবো না ঠিকই, কিন্তু নিজেকে বদলানোর মাধ্যমে আমাদের নারীদের প্রতি অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলাতে অবশ্যই সক্ষম। আসুন আজ থেকে আমরা নিজেকে বদলাই।

যতক্ষণ জীবন আছে, ততক্ষণই আশা থাকে— তাই নিজেকে যোগ্য করার সময় ফুরিয়ে যাইনি, বয়স কোন ব্যাপারই না জীবনকে নতুন ভাবে শুরু করতে। পাশ্চত্য দেশে অনেক মধ্য বয়সী পুরুষ, নারী আবার পড়াশুনা শুরু করে ভালোভাবে বাকি জীবনটা কাটানোর জন্যে। কেউ আবার কোন শর্ট কোর্স করে; কেউ আবার পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়।

পড়াশুনা কেবল অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, নিজের আত্মতৃপ্তি আর আত্ম বিশ্বাস বাড়াতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কেউ স্বল্প পূঁজি নিয়ে ব্যবসাও করে। বর্তমান যুগে স্বামীর একা সৎ উপার্জনে সংসার চালানো দুস্কর; এছাড়া আজ মাথার ওপর বাবা অথবা স্বামী থাকায় মেয়েরা একটা আশ্রয় পায়, কিন্তু হঠাৎ এমন যদি হয় যে কোনো কারণে হোক মেয়েটির আশ্রয়টুকু হারিয়ে গেল, সেই দুরাবস্থায় নিজেকে বেঁচে থাকার জন্য টিকে থাকতেও মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়া খুব প্রয়োজন।

আমরা নারীরা নিজেদের অযোগ্যতা অথবা ব্যর্থতার জন্য অনেক সময় পুরুষদের দায়ী করি অবলীলায়। হ্যাঁ, পুরুষরা তো চাইবেই আপনাকে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী করে রেখে গরম ভাত আর ভর্তা-ভাজি খেতে। তবে মনে রাখবেন, আপনি সেই নারী যে একটু কৌশল করলেই ঘাড় ত্যাড়া পুরুষের ঘাড় যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে ঘুরাতে পারেন। পুরুষকে তার চাহিদা মাফিক সব ব্যবস্থা করেই আপনি আপনার সময়ের যথার্থ ব্যবহার করেন।

মনে রাখবেন, কেউ আপনার চলার পথ তৈরি করে দেবে না, আপনার পথটি আপনাকেই তৈরি করে নিতে হবে আশেপাশের জঞ্জাল সরিয়ে। আর তাই আপনি যখন আপনার ঘরের পুরুষটির সামনে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন যে, হ্যাঁ আপনিও দিন বদলে দেবার সামর্থ্য রাখেন, বিশ্বাস করেন, সেই পুরুষটি যদি মানুষ হয়, তাহলে সে আপনাকে তখন পূর্ণ সমর্থন দিবে… কেবল চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজের যোগ্যতাকে একটু প্রমাণ করুন।

হে নারী, যদি আপনি ভালো থাকতে চান, তবে কেউ আপনাকে দুঃখ দিলেই, সে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে নিজের জীবনের মূল্যবান সময়, আর শক্তির প্রতি অবিচার করবেন না দয়া করে। ভাবুন একবার, আপনি সত্যিই কি এমন দুঃখ পাবার যোগ্য? নাকি যে আপনাকে দুঃখ দিলো সে মানুষটা আপনাকে অনুধাবনে ব্যর্থ? উত্তর পেলে নিজের ওপর আস্থা রাখুন; প্রতিজ্ঞা করুন, কারো অপমানে আপনি আর কাঁদবেন না; একেকটা অপমানকে বুলেট করে, সেই প্রচণ্ড শক্তির প্রয়োগে নিজেকে ছোটান রকেটের গতিতে। নিজেকে যোগ্য করুন, এমন ভাবে যোগ্য করুন যে আপনাকে যারা অপমান করে তারা আপনার পা’য়ের কাছে এসে কুর্নিশ করে।

হ্যাঁ, আপনি প্রথমতঃ কেবল আপনার জন্য বাঁচবেন, আর আপনার আলোয় আপনা-আপনিই তখন দেখবেন আপনার সংসার, চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠছে; শুধু একটাই মন্ত্র, নিজেকে সম্মানজনকভাবে যোগ্য করুন, যেটুকু আপনার সাধ্য আর সামর্থ্য তার মধ্য দিয়েই। দুঃখ, যন্ত্রণাকে আকাশে মুখ করে খোলা বাতাসে ফুঁঃ দিয়ে উড়িয়ে একবার দেখুন তো, কেমন সতেজ লাগে! পৃথিবীটা তখন আসলেই খুব সুন্দর মনে হবে; বেঁচে থাকবার জন্য মন চাইবে!

শেয়ার করুন:
  • 98
  •  
  •  
  •  
  •  
    98
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.