নারী দিবস ও রুবানা হকের বক্তব্যের শ্রেণি চরিত্র

রাহাত মুস্তাফিজ:

পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমই- এর বর্তমান সভাপতি রুবানা হক বলেছেন, ‘আজকে নারী দিবস আমাদের জন্য বড় কোনো ব্যাপার না। মানুষের দিন চাই। মানুষ দিবস হওয়া উচিত, নারী না।’

রুবানা হকের এই জাতীয় কথার মধ্যে একটা ফাঁকি আছে, একটা রাজনীতি আছে, একটা দর্শন আছে, একটা শ্রেণি চরিত্র আছে। একটা অংক আছে। “এই অংক বুঝিতে হইবে”।

রুবানা হক

রুবানা হক বাংলাটা বলেন চমৎকার। প্রয়াত আনিসুল হকের বাগ্মিতাও ছিল অসাধারণ! আমি এঁদের কথা বলার স্টাইলের গুণমুগ্ধ। মিস রুবানার নামের শেষে যে প্রয়াত স্বামীর “হক” আছে, এই ব্যাপারটা প্রায়শই ভুলে যাই তাঁর দুর্দান্ত বাংলা বলতে পারার দক্ষতায়। তাঁকে আমার বাচিক শিল্পী মনে হয়।

তথাপি কথাটা কে বলছে, কোথায়, কখন বলছে এগুলো আমার কাছে ওই “শিল্পের” চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সবসময়। আজকে নরেন্দ মোদি যদি বলেন, ভারত একটি অসাম্প্রদায়িক, সেক্যুলার রাষ্ট্র, হিন্দু-মুসলমানসহ সব ধর্মের সহবস্থান তিনি নিশ্চিত করবেন তাহলে নিশ্চয়ই আমার সাম্প্রতিক দিল্লির হানাহানির কথা মনে পড়ে যাবে। তাঁর কথাবার্তাকে ‘ভূতের মুখে রাম নাম’ মনে হবে।

ঠিক তেমনি রুবানা হকরা যখন ‘শ্রমিকের স্বার্থ’ রক্ষার কথা বলেন, তখন আমার মনে পড়ে যায় স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসের কথা, তাজরিন গার্মেন্টসে রোস্ট হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের কথা মনে পড়ে যায়, আমি ভুলতে পারি না রানা প্লাজার ১২শ মৃতদেহের কথা।

রুবানা হকের শ্রেণী চরিত্র বড়লোকের, বুর্জোয়ার। ঠিক যেমনটি আনিসুল হকের ছিল। শ্রমিকের শ্রমকে সস্তা বানিয়ে, তাঁকে চুষে, শোষণ করে আখের ছোবড়া বানিয়ে মুনাফা (উদ্বৃত্ত মূল্য) তৈরি করা তাদের উদ্দেশ্য।

শ্রমিকের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত কর্ম পরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও শ্রম আইনের যথাযথ অনুশীলন তাদের সিলেবাসে নেই। রুবানা হকেরা শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলনকে মনে করতে চান না, নারী আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি, ৮ মার্চ নারী দিবসের প্রেক্ষাপট তাদের জন্য মানে ক্যাপিটালিস্টের জন্য সুখকর কোনো ঘটনা নয়।

রাহাত মুস্তাফিজ

সেকারণেই পরিশীলিত, নান্দনিক উচ্চারণে, বুর্জোয়ার শিখিয়ে দেওয়া পাপেট মুখে দ্ব্যর্থহীন বলে ফেলেন, “নারী দিবস আমাদের জন্য বড় কোনো ব্যাপার না”। রুবানা হকের দর্শন এটা, ধনিক শ্রেণীর অবস্থান এটা। এই দর্শনে ও অবস্থানে রোল প্লে করে যাওয়া তাঁর ও তাঁদের এজেন্ডা। সেকারণেই নারী দিবসের তাৎপর্যকে ইনভ্যালিড করে দিয়ে “মানুষের দিবস চাই” নামক বায়বীয় কথার রি-প্রোডাকশন।

এবং আসলেই তাই। নারী দিবস তাদের জন্য বড় কোনো ব্যাপার না৷ কিন্তু নারী দিবস নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রোলেতারিয়েতের জন্য অবশ্যই বিশেষ দিবস। এইটা তাঁদের আত্ম উপলব্ধির, সংগ্রামি চেতনার এবং জেগে ওঠাকে স্মরণ করে পুনর্বার প্রত্যয়ী হবার দিবস।

হাজার বছরের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ-সংস্কৃতির শিকার প্রতিটি নারী-পুরুষের জন্য “নারী দিবস” অনেক বড় ব্যাপার। এই দিনে নারীর পাশাপাশি প্রতিটি পুরুষের বিশেষভাবে খুঁজে দেখা উচিৎ পুরুষতান্ত্রিকতা তাকে কীভাবে অবিবর্তিত, অসম্পূর্ণ, আধা মানুষ বানিয়ে রেখেছে।

সেই সাথে আরও একবার স্মরণ করতে হবে একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেত্রী, পাবলিক ভার্সিটির ভিসি, শিল্পমালিক নারী হলেও সেই রাষ্ট্র নারী বান্ধব নাও হতে পারে। উদাহরণ, আপনার – আমার প্রিয় বাংলাদেশ। পিতৃতান্ত্রিকতা একটা কাঠামো। ক্ষমতার শীর্ষে, অর্থনীতির উচ্চাসনে নারী অধিষ্ঠিত থাকলেও পিতৃতান্ত্রিক ওই কাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে না পারলে তা নারীর জন্য কোনদিনই কল্যাণ বয়ে আনবে না। এমনকি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাম্যাবস্থা নিশ্চিত করলেও পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার অবসান নিশ্চিত করে না। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাথে সাথে পিতৃতান্ত্রিক চেতনার বিরুদ্ধে বিপ্লবে জয়ী হতে না পারলে নারী কমরেডদের “অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন” মনে হতেই থাকবে।

নারী দিবসের প্রাক্কালে শেষ করছি এই বলে, পিতৃতান্ত্রিক নির্মাণের করুণ শিকার কমবেশি আমরা প্রতিটি পুরুষ। আগামী একবছর যেনো আরও বেশি অনুধাবন করতে পারি যে কোথায়, কীভাবে, কোন কোন জায়গায় পিতৃতান্ত্রিক মায়াস্ত্রে ধরাশায়ী হয়ে আছি। চর্চার মাধ্যমে ওগুলো থেকে যেনো নিজেকে মুক্ত করতে সক্ষম হই।

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.