“সবার জন্য সমতা স্লোগান” এবং বাংলাদেশে নারীর বর্তমান পরিস্থিতি

রাহিমা আক্তার:

৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯১১ সাল থেকে দিনটি পালন করা হচ্ছে। প্রতি বছরই দিবসটি নারীর সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং আর্থসামাজিক সাফল্যের উপর আলোকপাত করে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২০ লিঙ্গ সমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই বছরটি বেইজিং ঘোষণাপত্রের ২৫তম বার্ষিকী। বেইজিং ঘোষণাপত্রে ১২ টি ক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা অর্জনের কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ঘোষণার ২৫ বছর পরে সেই লক্ষ্য কতোটা অর্জিত হয়েছে, তা মূল্যায়ন করার সময় এসেছে এবং এই ক্ষেত্রে এ বছরে নারী দিবসের থিম হলো “সবার জন্য সমতা”, যা লিঙ্গ সমতার কথাই বলছে।

সমতাভিত্তিক বিশ্ব, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষ উভয়ের জন্য সমান অধিকারের আন্দোলনে নারী দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচি বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকে। একটি সমৃদ্ধ ও সম-অধিকারভিত্তিক বিশ্ব জোরালোভাবে প্রত্যাশিত।

কিন্তু সমতার এই লড়াইয়ে বাংলাদেশ কোথায় অবস্থান করছে? বাংলাদেশ কি নারীর জন্য নিরাপদ, সুরক্ষিত? আমাদের দেশ কি আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে? বর্তমান কর্মসংস্থান পরিসংখ্যান, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন পরিস্থিতি এবং লিঙ্গ ভিত্তিক যৌন হয়রানি এবং নির্যাতন বাংলাদেশের নারীদের অবস্থানের এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক যে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক ক্ষ্মতায়ন, বৈষম্যহীন সমান সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আমরা আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

প্রথমত, বর্তমানে বাংলাদেষে নারী কর্মসংস্থানের হার ৩৬% (বিশ্বব্যাংক ডেটা ২০১৯)। সমস্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ ৫ ম স্থান অধিকার করেছে যেখানে নেপাল ৮১% মহিলা কর্মসংস্থান হার রয়েছে। বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে (২৩%) এবং পাকিস্তান (২৪%)। যদিও দেখতে ভাল লাগছে যে কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। মূলত বাংলাদেশের নারীর বড় একটা অংশের কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক খাতেই নিয়োজিত। শ্রমজীবী ​​পুরুষদের ১৭.৭% তুলনায় (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৬) মাত্র ৪.৬% নারী আনুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। ক্ষমতায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর কর্মসংস্থান অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া উদ্যোক্তা হিসেবে সম্পদে, সঞ্চয়, উদ্যোক্তা ঋন সুবিধা পাওয়া ইত্যাদিতেও দেশের নারীরা অনেক পিছিয়ে আছে, যা লিঙ্গভিত্তিক সমতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীদের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। বর্তমান প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নারী হলেও, মাত্র 8% নারী মন্ত্রিসভায় এবং ২০% নারী সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। নারীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সামগ্রিক উন্নতির জন্য নারীরা পিছিয়ে আছেন অনেক।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশেও বিশ্বব্যাপী নারীদের প্রতি সহিংসতা মহামারী আকারে ছড়িয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের তথ্য অনুসারে প্রতি তিনজন মহিলার মধ্যে একজন তার জীবনকালে কোনও না কোনওভাবে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন। নিরাপত্তার অভাবে সকল বয়সের নারী-শিশুরা প্রায় প্রতিদিনই রাস্তায়, কর্মস্থলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ২০১৬/২০১৯ সালে ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র মনিটরিংয়ের প্রতিবেদন সংখ্যা উদ্বেগজনক:

সাল ধর্ষণ
২০১৯ ১৪১৩
২০১৮ ৭৩২
২০১৭ ৮১৮
২০১৬ ৭২৪

এই বিশাল সংখ্যার কতজন সঠিক বিচার পেয়েছেন, কতজন ধর্ষক যথাযথ শাস্তি পেয়েছে সে তথ্য কারও কাছে নেই বোধয়। আর ২০২০ সালের শুরুটা আরও ভয়াবহ। কেবল জানুয়ারী মাসেই ৯৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দেশ নারী ও শিশুদের জন্য ধর্ষণের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে যেন। রাষ্ট্র নারী -শিশুদের যথাযথ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হতে চলেছে। কিন্তু সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য, রাস্ট্রকে অবশ্যই নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ এবং হত্যা যতক্ষণ বন্ধ না হবে, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সমান অংশীদারিত্ব না থাকবে, ততক্ষণ সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। এছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিভিন্ন খাতে নারীরা পিছিয়ে আছে অনেক। সেখানেও কাজ করতে হবে।

দেশে ৮ই মার্চ নারী দিবস পালিত হবে আর নানা কর্মসূচি পালন শুরু হয়েও গেছে। সরকার, বিভিন্ন সংগঠন “সবার জন্য সমতা” স্লোগানকে সামনে রেখেই দিনটি উদযাপন করতে যেয়ে যেন ভুলে না যায় যে প্রতিটা দিনই নারীর।

প্রতিদিনই নারীর জন্য সমান অধিকার, নিরাপত্তা নিশ্চিতের দিন। আর তাই নারীর প্রতি সহিংসতা হ্রাস করার জন্য সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে, রাষ্ট্রকে অবশ্যই কঠোর আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন করতে হবে, যথাযথ আইনি শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা না হলে যেখানে সারা বিশ্ব উন্নতির শির্ষে এগিযে যাচ্ছে, বাংলাদেশ তার উল্টো রথের যেতে যেতে এক সময় তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।

রাহিমা আক্তার,
ভুর্জবুর্গ, জার্মানি থেকে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.