লিলিথ কিংবা লীলাবতী থেকে আজকের নারীবাদী নারী

শাহরিয়া দিনা:

মিথ বলি আর গল্প বলি লিলিথ এক ইন্টারেস্টিং চরিত্র।

লিলিথ বুদ্ধিদীপ্ত, আত্মসম্মানবোধে পরিপূর্ণ এক নারী। তার জন্ম সেই মাটি থেকেই, যা থেকে এডামের জন্ম। যার কারণে লিলিথ নিজেকে দাবি করেছে এডামের সমকক্ষ, মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এডামের আধিপত্য। যা এডামের মনে লিলিথের প্রতি বিতৃষ্ণা এবং বিরুদ্ধ চিন্তা নিয়ে আসে।

লিলিথ চরিত্রটি উপাখ্যানে পরিণত হওয়ার পেছনে মূলত যে ঘটনাটি প্রচলিত সেটি পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদী মানসিকতার প্রাথমিক নিদর্শন। ভালোবাসার মধুরতম পর্যায়েও পৃথিবীর প্রথম পুরুষ এগিয়ে থাকতে চান নারীর চাইতে। একই মাটির সৃষ্টি যুক্তিতে নারীও মানতে পারে না পুরুষের আধিপত্য। মতানৈক্যের চূড়ান্ত, লিলিথ স্বর্গ ছেড়ে মাটির পৃথিবীতে চলে আসেন।

লিলিথ চলে যাবার পর ঈশ্বর কয়েকজন দূতকে পাঠালেন তাকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সে আর ফিরলো না। বরং মেনে নিল ঈশ্বরের ভয়াবহ অভিশাপ। তখন আদম ঈশ্বরের কাছে এমন একজন নারীকে প্রার্থনা করল যে হবে তার অনুগত, বিনম্র, পতি-অন্ত-প্রাণ।

ঈশ্বর এবার আর কোনও ঝুঁকি নিলেন না। তিনি নারীকে পুরুষের অনুগত করে রাখার অভিপ্রায়ে ঘুমন্ত আদমের বাম পাঁজরের হাড় থেকে ইভকে সৃষ্টি করলেন। ইভ হয়ে উঠল আদমের প্রিয়তমা নারী বা স্ত্রী।

নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার অপরাধে আদম ও ইভ যখন স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে নির্বাসিত হলো তখন ইভ আদমকে বলেছিল, এই নির্বাসনে আমার কোনও দুঃখ নেই । কারণ তুমি যেখানে থাকবে সেটাই আমার কাছে স্বর্গ।

সেই থেকে আজ অব্দি পুরুষ ইভের মতো এমন নারীকেই কামনা করে এসেছে সঙ্গিনী হিসেবে। আজও এই মাটির পৃথিবীতে নারী মূলত দুই প্রকার : লিলিথপন্থী আর ইভপন্থী।

যে নারী জ্ঞানী, সাহসী, স্পষ্টবাদী সমাজ তাকে খুব ভালো ভাবে নেয়নি কখনো, হয়নি তার ভালো পরিণাম। খনাই তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। খনা, বা ক্ষণা ছিলেন জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক বিদুষী নারী। যিনি বচন রচনার জন্যেই বেশি বিখ্যাত এবং সমাদৃত। কথিত আছে তার আসল নাম লীলাবতী। মূলতঃ খনার ভবিষ্যতবাণীগুলোই ‘খনার বচন’ নামে বহুল পরিচিত। জ্ঞানী এবং স্পষ্টবাদী বিধায় খনা’র জিভ কেটে নেয়া হয়েছিল সে গল্প প্রায় সবারই জানা।

আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের সর্বকালেই যেসব নারী পুরুষের আরোপিত নিয়ম ভেঙেছেন, বাক্ স্বাধীনতা চেয়েছেন, দেহের স্বাধীনতা চেয়েছেন, বা জ্ঞানলাভ করেছেন, বিদুষী হয়েছেন, সমাজ তাদের প্রায় সবাইকেই হত্যা করেছে বা করতে উদ্যত হয়েছে নানাভাবে।

শুরুর মিথ বা মধ্যখানের কথা বাদ দিয়ে আসি বর্তমানে। মুখের উপর সত্যিটা বলে দিলে, নিজের অধিকার নিয়ে সচেতন হলে তাকে আজকাল নারীবাদী বলে ট্যাগ দেয়া হয়। খুব দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, নারীবাদ/নারীবাদীদের নিয়ে এদের অনেকের মানসিকতাই নেতিবাচক। কেউ কেউ তো একদম শত্রুভাবাপন্ন। ধরেই নেয়, এরা বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো টাইপ। এদের সংসার নেই, বাচ্চাকাচ্চা নেই। কি হাস্যকর ধ্যান-ধারণা! যে নারী চিন্তা করতে জানে, যিনি পারিপার্শ্বিকতা বিশ্লেষণ করতে পারে, জোড়ালোভাবে নিজের মতামত দিতে সক্ষম, যুগ যুগ ধরে চলা একটা অন্যায়-অসামাঞ্জস্যের প্রতিবাদী সে হয় নারীবাদী।

নারীবাদীদের নিয়ে কটাক্ষ করে ব্যাঙ্গ করে সার্কাজম মূলক কথাবার্তা তো খুবই কমন ঘটনা। সমাজের মুমিন বান্দা থেকে শুধু করে আমজনতা কিংবা সেলিব্রিটি পুরুষ কেউ বাদ যায় না। এই যে তাদের প্রতি এত বিদ্বেষ মজার ব্যাপার হচ্ছে, তবুও আড়ালে-আবডালে তাদের কাছেই মনের দুঃখ শেয়ার করতে চায় কিংবা যায় প্রেমিক রুপি পুরুষ! কারণ ওই পুরুষটিও জানে দিনশেষে শুধু খাওয়া আর বাচ্চা পালনই নয়, এমন একজন পার্টনার চাই যিনি হবেন মানসিকতার মিলের বন্ধু, জ্ঞানে হবেন নির্ভরযোগ্য, বিপদের দিনে যার থাকবে পরামর্শ দেবার যোগ্যতা, দুঃখের দিনে হবে একান্ত আশ্রয়। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার আধিপত্য ধরে রাখতেই তারা তা স্বীকার করে না।

নারীবাদীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলারাই আবার কোন দুর্ঘটনায় অনিয়মের প্রতিবাদ টানায় গিয়ে খুঁজতে থাকেন, এখন নারীবাদীরা কোথায়? তারা কেন বলছে না এ বিষয়? এসব না বলে একসাথেই বলুন, প্রতিবাদ করুন। অহেতুক পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড়ানোর কিছু নেই তো! মানুষের পৃথিবীতে চন্দ্র-সূর্য, গাছপালা, আকাশ তথা প্রকৃতির সবই কত সুশৃঙ্খল যত বিশৃঙ্খলা মানুষের মাঝে। এত এত বিভাজনের আসলেই কি দরকার আছে! দিনশেষে তুমিও মানুষ, আমিও মানুষ।

নারী দিবস এলেই বলা শুরু হয়, নারীদের সম্মান করুন, শ্রদ্ধা করুন, মায়ের জাত ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে সম্মান-শ্রদ্ধা তো চেয়ে বেড়ানোর জিনিস না বরং মন থেকে আসতে হয়। মা’য়ের জাত বলে মহিমান্বিত করারও কিছু নেই। শুধু মানুষ হিসেবে তার প্রাপ্য অধিকারটুকু নিশ্চিত করুন তাতেই যথেষ্ট। একজন অচেনা পুরুষ রাস্তায় আহত বা বিপদগ্রস্ত হলে যেভাবে তার পাশে দাঁড়ান ঠিক সেভাবেই একজন নারীর পাশে দাঁড়ান। একজন পুরুষ সহযাত্রীর সাথে চলার পথে বাসে/ট্রেনে যেই আচরণ করেন একজন নারীর সাথেও ঠিক তেমন আচরণ করুন।

মানুষ মাত্রেই দোষ-গুণের সংমিশ্রণ। পুরুষ মাত্রেই খারাপ নারী মাত্রই ভালো এমন তো না বিষয়টা। ভালো পুরুষ যেমন আছে তেমনি খারাপ নারীও আছে। চরিত্রবান নারী যেমন আছে চরিত্রহীন পুরুষও আছে। লিলিথ কিংবা লীলাবতীর যুগ আর নাই এখন ছেলে-মেয়ে সবাই সমান শিক্ষিত হচ্ছে। বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা টিকে থাকাটা যেখানে কঠিন হয়ে যাচ্ছে সেখানে অহেতুক আর বিভাজন বাড়াবার নিশ্চিতভাবেই কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।

প্রথমতঃ আমরা সবাই মানুষ তারপরে নারী কিংবা পুরুষ। একটি সমান পৃথিবী একটি সক্ষম পৃথিবী। স্বতন্ত্রভাবে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের চিন্তাভাবনা এবং ক্রিয়াকলাপের জন্য দায়বদ্ধ।
#EachforEqual

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.