‘ক্যামন করে পত্র লিখিরে’

লাবণ্য সায়মা রহমান:

পত্র ১
শোনো বলি ফিসফাস কানে কানে, যে কথা রয়েছিলো গোপনে এতো এতো কাল। সে আমার কিশোরীবেলার অব্যক্ত কথামালা। তোমাকেই বলছি, কী গো শুনছো? জীবনের চার দশক পেরিয়ে গেলো কী করে, কতোটা দ্রুততায় বুঝে ওঠার আগেই দেখি বুড়িয়ে গেছি, কানের দুপাশ থেকে শাদা চুলগুলো উঁকিঝুকি দেয় আর হাসে, চোখের কোলে কালশিটে দাগগুলো প্রগাঢ় হতে হতে জানান দেয়, বয়েস হলো তো। কিন্তু জানো মনে মনে আমি তোমায় না পাওয়া সেই কিশোরী।

অন্তরের ভেতরে গেঁথে রাখা ইচ্ছেরা আজ ডানা মেলছে, কী কারণ কে জানে! যে মায়ার জন্য ব্যাকুল পরান, যে ভালোবাসায় সিক্ত হতে তৃষ্ণার্ত হৃদয়, ওরা আর বাঁধ মানতে চাইছে না। লোকাচার সংসার সমাজ সকল তুচ্ছ করে বিবাগী হতে চাইছে। কীসে কী হয়ে যায় তা বোঝা বড্ড কঠিন। আমি আজ শরণাগত। দিও ঠাঁই দিও তোমার অন্তরে প্রিয়। আমায় না হয় এক টুকরো মেঘ করে রেখো তোমার মনের আকাশে। ভয় নেই বৃষ্টি হয়ে ঝরবো না। সে মেঘে একটু রং বুলিয়ো ইচ্ছেমতো, আর সুর দিও একটু খানিক।

পত্র ২

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁর কল্পনা শক্তি দিয়ে আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখার কথা বলেছিলেন। সেই কৈশোরে কি জানতাম ইথারে একদিন সত্যি ভাসিয়ে দেয়া যাবে মনের কথা। আজ পারছি তো তোমার জন্য জমিয়ে রাখা গল্পগুলো বলতে। জানো আজ অগ্নির কথা মনে পড়ে গেছে?

অগ্নিরা দুবোন, ওদের নাম ছিলো অগ্নি আর শিখা, সুন্দর না বলো? বাঙ্গালী মুসলমান মেয়েদের নাম সহসা এতো সুন্দর হয় না। অগ্নির মতো উচ্ছ্বল আর দাপুটে মেয়ে আমি আর কখনো দেখিনি। আমার একেবারেই ছোট্টবেলার খেলার সাথী ছিলো মেয়েটা। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে আমি চলে গেলাম ঢাকা শহরের নামী এক স্কুলে আর অগ্নি রয়ে গেলো ওখানেই। তবু আমাদের দেখা হতো, কথা হতো, একসঙ্গে খেলতামও কতো।

যখন চৌদ্দ পেরোয় বয়স, তখন আমির খানের কেয়ামত সে কেয়ামত তক্ ওই কিশোরী মনে সত্যি কেয়ামত নিয়ে আসে। পাড়ার এক ষণ্ডামতো ছেলে যে কিনা দেখতে অনেকটা আমির খানের মতো ছিলো, তার হাত ধরে অগ্নি পালিয়ে যায় হঠাৎ, আর কোনোদিন ওকে দেখিনি। অগ্নি কিশোরীবেলায় গর্ভবতী হয়ে সন্তান প্রসবের সময় ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। আমার খেলার সাথী অগ্নির জন্য আজও প্রাণ কাঁদে, ওর গল্পটা তোমায় বলবো বলে এতোকাল জমিয়ে রেখেছিলাম। আজ বলতে পেরে নির্ভার লাগছে।

পত্র ৩

ভালোবাসার রং কেমন হয় জানো তুমি? হরেক রকম হয়। এই যেমন সন্তানের প্রতি যে ভালোবাসা সেটা চিরহরিৎ, কখনো ফিকে হয় না। বাবা মায়ের প্রতি ভালোবাসার রং খানিকটা হলদে সবুজ, বন্ধুর জন্য ভালোবাসার রংটা হয় লাল। আর তোমার জন্যে যে ভালোবাসা আমার, সেটা নীল, শুধুই নীল। প্রেম বেদনায় প্রস্ফুটিত হয় সবচাইতে বেশি তাই বুঝি ওর রং নীল?

ওই যে কৈশোরে দুরন্ত আমি ব্যাডমিন্টন খেলি তো কেরামের বোর্ডে ডুবে থাকি, নয়তো দাবা খেলায় ব্যস্ত, তবু তখন থেকেই কেমন করে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করি। ভিক্টোর হুগোর ‘লা মিজারেবল’ তখন আমার পড়ে ওঠা সবচাইতে মোটা পুস্তক। কতো যে কেঁদেছিলাম আমি পড়তে পড়তে জাঁ ভালজাঁর জন্য, সে কান্না কেউ দেখেনি, তোমায় বলবো তাই স্মৃতিটা জমিয়ে রেখেছিলাম।

মৈত্রেয়ী দেবীর ন’হন্যতে পড়ে প্রেমে পড়তে শিখেছিলাম, কিন্তু জানো সেই মানুষটার সঙ্গে দেখা না হলে প্রেম হয়ে ওঠে না। সেটা একটা মিশ্র বিষয় ঘটে, মেনে নাও মানিয়ে নাও ধরনের কিছু একটা। গগন হরকরা সত্যি বুঝেছিলেন যে তাঁর সনে দেখা হয়ে ওঠে না এক জীবনে, সে জন্যেই তিনি রচনা করতে পেরেছিলেন অসামান্য সৃষ্টি –

“ কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে”।

পত্র ৪

রিকশাচালক পেশাটা খুব অমানবিক যদিও, তবু রিকশা এখনও পর্যন্ত আমার প্রিয় বাহন। আমি সবসময় চেষ্টা করি রিকশাচালককে আপনি সম্বোধন করতে এবং দরাদরি করি না একদম। যারা রিকশাচালককে তাচ্ছিল্য করে, তাদের আমি খুব নিচু মনের মানুষ হিসেবে গণ্য করি। ইচ্ছে ছিলো কোনো এক বসন্তের সন্ধ্যায় রিকশায় ঘুরবো তোমার সঙ্গে, কিংবা তুমুল বৃষ্টিতে ভিজবো রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে।

স্বপ্নটা অধরাই থেকে গেলো আমার। বিষন্নতার কবি প্রিয় জীবনানন্দ ঠিক জানতেন “জীবনের রং তবু ফলানো কি হয়” সত্যিই তাই কিছু কিছু স্বপ্ন কেবল স্বপ্নেই বিরাজ করে, তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া হয়ে ওঠে না। রিকশার কথা বলতে বলতে একটা বিভৎস স্মৃতি মনে পড়ে গেলো জানো? তখন আমি মেডিক্যালের তৃতীয় বর্ষে পড়ছি, ছুটির দিনের সকালে সিলেট শহরের মধুশহীদ এলাকায় যেতাম উস্তাদ রামকানাইজির কাছে উচ্চাঙ্গের তালিম নিতে।

একদিন ফেরার পথে বৃষ্টি হচ্ছিল, আমি ও আরেকজন অনুজ ছাত্রী রিকশার হুড তুলে নীল প্লাস্টিকের পর্দায় গা ঢেকে পার হচ্ছিলাম রিকাবীবাজার এবং সেদিন ওখানে মেলা বসেছিলো কী জন্যে যেনো! অকস্মাৎ একদল কিশোর হামলে পড়লো আমাদের ওপর, চারদিক থেকে ১০ কি ১৫ টা হাত আমাদের শরীর স্পর্শ করছিলো কুৎসিতভাবে। আমরা চিৎকার করলাম, রিকশাচালক মৃদু স্বরে প্রতিবাদ করলো, তবু কিছুতেই ওরা থামছিলো না। মিনিট খানেকের ওই পথটুকু ফুরোনো পর্যন্ত কদাকার উল্লাসে মেতেছিলো মানুষেরই মতো দেখতে একদল পশু। কেউ ওদের থামতে বলেনি, জানো? মনে হয়েছিলো হায়েনার দল যেমন একজোটে আক্রমণ করে একটা হরিণশাবককে, ওরা তেমনই কোনো জঙ্গলী প্রাণী। রাগে ক্ষোভে কষ্টে থরথর করে কেঁপেছিলাম সেদিন, আরও ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতেই পারতো। বাস্তবতা হলো আমার দেশে কন্যারা এখনো বড্ড অনিরাপদ নিজ গৃহে কিংবা বাইরে।

পত্র ৫
শোনো, পশুদের নাম ধরে আমরা গালাগাল করি, কুশ্রী বা সুশ্রী, কিন্তু আদতে নিরীহ যে প্রাণীটি তাকে কেনো যে ভিকটিম করি? বরং মানুষের অবয়বে যেসব কুৎসিত প্রাণী আছে, তা বারংবার বিস্মিত করে আমাকে।
একটা রোমহর্ষক ঘটনা বলি আজকে তোমায়। ওই কদাকার প্রাণীটার নাম মনে করতে আবার খানিকটা সময় ব্যয় হয়েছে যদিও, কিন্তু মনে করতে পেরেছি শেষ পর্যন্ত। হারিছ, আমাদের ফার্মাকোলজি ডিপার্টমেন্টের একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি ছিলো।

আমাদের মেয়েদের হোস্টেলের পাশেই দারোয়ান চাপরাশিদের আবাসস্থল বরাদ্দ ছিলো। হোস্টেলটা দুটো ব্লকে ভাগ করা ছিলো, সামনের অংশটা পিছনের অংশের সঙ্গে একটা বারান্দা দিয়ে সংযোগ করা। দুটো ব্লকের মাঝে বেশ খানিকটা অংশ ফাঁকা ছিলো। আমি থাকতাম নিচ তলায় পেছনের ব্লকে। বেশ কিছুদিন একটা অদ্ভুদ ছায়া সন্ধ্যা হলেই আমরা পেছনের ব্লকের মেয়েরা দেখা শুরু করলাম, প্রথমে সবাই ভাবতাম দৃষ্টিভ্রম। একদিন আমি গভীর রাতে মুখে পানির ঝাঁপটা দিতে বেরিয়েছি, কারণ পড়তে হবে রাত জেগে, দেখি একজন নিচতলার সামনের ব্লকের একটা জানালায় উঁকি দিয়ে খোলামেলা পোশাক পরা ঘুমন্ত মেয়েদের দেখছে। আমি কে কে চিৎকার করতেই সে উধাও হয়ে গেলো বাতাসের গতিতে। সেদিন আকৃতি দেখেই আমি চিনতে পেরেছিলাম এটা হারিছ।

কদাকার প্রাণীটা এরপর শুরু করলো অন্যরকম আক্রমণ। কেমন শোনো। রাত আরও গভীর হলে পুরো ন্যাঙটো হয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে ঝুলে থাকা শুরু করলো। আমাদের চিৎকারে কয়দিন পর পরই হোস্টেলটা কেঁপে উঠতে লাগলো। প্রিন্সিপালের কাছে অভিযোগ করলাম আমরা, হোস্টেলের সীমানার দেয়াল উঁচু করে দেবার অনুরোধ করা হলো যেনো দেয়াল টপকে ভেতরে আসতে না পারে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। আমি সরাসরি নাম ধরে অভিযোগ করতে চাইলাম, কিন্তু বন্ধুরা সবাই আমাকে থামিয়ে দিলো। কারণ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিদের জোট নাকি ভীষণ শক্ত এবং তাতে আমারই বিপদ হতে পারে।

কী আর করা! আমি চুপ করেই রইলাম। তারপর সেই নরাধমটি কতোদিন হোস্টেলের মেয়েদের যন্ত্রণা করেছিলো জানি না, ততোদিনে আমি মেডিক্যালের পাঠ চুকিয়ে ফেলেছি। কিন্তু ভেবে দেখো মানুষের বিকৃতির রকম? এই নোংরামির কী মানে, আমি আজও বুঝে পাই না।

পত্র ৬

জানো, এতো সব বিচ্ছিরি অভিজ্ঞতার পরেও বলতে পারি জীবন সুন্দর এবং বেঁচে থাকা মধুময়। তোমার কথা ভাবতেই বসন্ত খেলা করে অন্তরে, তখন সব কষ্টই ম্লান হয়ে যায়। তুমি হয়তো আছো কোথাও কোনো দূর দেশে কিংবা তুমি শুধু এক সুখ স্বপ্নের নাম, নাকি তুমি শুকতারা?

জয়শ্রীকে মনে আছে তোমার? সীমানা পেরিয়ে ছবির নায়িকা? ওনার সঙ্গে দেখা হলো একবার লন্ডন শহরে, ঝলসে দেবার মতো রূপ আছে তাঁর এতোকাল পরেও। তাঁর সামনে ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানটা গেয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন গানটা রেকর্ডিংয়ের ইতিহাস। বলেছিলেন আমি অন্তর দিয়ে গেয়েছি, এটুকুনই আমাকে বিশাল আনন্দ দিয়েছিলো। ছোট্ট কিন্তু মধুর এমন কতো স্মৃতি সুখ জাগানিয়া জীবনের জন্য, তাই না বলো?

সিনেমা প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেলো শত্রুঘ্ন সিনহা অভিনীত অন্তর্জলী যাত্রা সিনেমার কথা, অসম্ভব দক্ষতায় তৈরি করা সমাজের বঞ্চিত মানুষের চিত্রগাঁথা। তবে আমার আজ অব্দি ভালো লাগে মেইল গিবসন নির্মিত এপোক্যালিপ্টো সিনেমাটা। লড়াকু এক তরুণের গল্প। জীবন তো একটা চলমান যুদ্ধক্ষেত্র, সাহসী আর লড়াকু না হলে এখানে টিকে থাকা দায়। সে তুমি যে শ্রেণির মানুষই হও না কেনো, বেঁচে আছো মানেই তুমি যোদ্ধা।

পত্র ৭

“সুরে সুরে ওগো তোমায় ছুঁয়ে যাই
নাইবা পেলাম দরশ তোমার গানে গানে যদি তোমার পাই”

অজয় চক্রবর্তীর এই গানটাকে হৃদপিণ্ডে ধারণ করে পথ চলি। তুমি এই যে আমার তুমি, ভালোবাসি, অথচ তোমায় পাওয়া হয়ে উঠবে না, কারণ তুমি এক অলীক স্বপ্ন আমার কল্পনার সুখ, মানুষের ঈশ্বর বিশ্বাসের মতো। তোমায় ভেবে কাঁদবো, গাইবো আর হাসবো সেই আমার প্রাপ্তি। কতোগুলো চিঠি লিখে ফেললাম দেখো, উত্তরের আশায় নয়, আদতে আমার জমানো কথাগুলোকে মুক্তি দিলাম।

প্রকৃত প্রেম কোনটা বোঝা সহজ নয়। আমরা যেটাকে প্রেম বলি, যেমন এক সুন্দরী মেয়ে প্রেমে পড়বে প্রতিষ্ঠিত কোনো একজনের, সেটা কি প্রেম হয়? সেটা হয় জীবনের হিসেব মেলানো। প্রেম আসবে স্রোতের মতো, ভেঙ্গে তছনছ করে দেবে সব কূল, একদমই এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে প্রেম। পশ্চিমে থাকতে থাকতে দেখেছি, বাস ড্রাইভারের সঙ্গী হয়তো একজন গবেষক কিংবা একজন ডাক্তার বিয়ে করছেন কোনো আয়াকে। ওরা চিন্তায় আমাদের চাইতে উন্নত। কে আমার জন্য যথার্থ মানুষ সেটা বুঝে নিতে পারলে জীবন সহজ হয়। তারপরও হিসেব মেলে না, সম্পর্কের ভাঙ্গনও অনায়াসে হয়। কারণ মানব মন এক জটিলতম বিষয় এবং প্রেম ক্ষণস্থায়ী।

যতই হিসেব মেলাতে যাই, জীবন আসলে এক শুভঙ্করের ফাঁকি। আমার সাধারণ একটা জীবনের মহানায়ক আব্বা যেদিন চলে গেলেন অনন্তের পথে, সেদিন থেকেই জেনেছি শূন্যতার সংজ্ঞা। নিজের সকল শক্তি নিয়ে একা পথ চলার অভ্যেস করেছি প্রাণপণে। মাথার ওপরের ছায়াটা সরে গেলে জানো বোঝা যায় আশেপাশের মানুষ কতো নিষ্ঠুর হতে পারে। চিন্তাশক্তি সম্পন্ন প্রাণী এই যে আমরা মানুষ যদি ভাবতে জানতাম জীবনের সারাংশ তবে কতো হাহাকার লোভ সংকট কমে যেতো।

শূন্যে থেকে যাত্রা শুরু শূন্যেই করি শেষ
তবে ক্যানো জীবন নিয়ে এতো হাপিত্যেস।

সমাপ্ত

শেয়ার করুন:
  • 396
  •  
  •  
  •  
  •  
    396
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.