আসলেই কি ক্ষমা চান পুরুষ?

নাসরীন রহমান:

আপাতদৃষ্টিতে দু’টো ঘটনাই আলাদা আলাদা, কিন্তু চারিত্রিক দিক বিবেচনায় নিলে এদের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে।

একটি ঘটনার নায়ক রাজশাহী বিশব্বিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক এবং অন্য ঘটনার নায়ক টঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কমকর্তা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি তাঁর ছাত্রীদের সাথে যৌন হয়রানিমূলক আচরণ করতেন। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী ছাত্রীরা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করলে শিক্ষকের টনক নড়ে এবং উপায়ান্তর না দেখে ওই শিক্ষক তখন ভুক্তভোগী ছাত্রীর কাছে ফোন করে ক্ষমা চান।

এবং টঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কমকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জেন্ডার অসংবেদনশীল আচরণের।
ঘটনার বর্ণনায় জানা যায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি অ্যাক্টিভিস্ট মারজিয়া প্রভার সহযোগিতায় একজন গার্মেন্টস কর্মী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করতে গেলে তাঁদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন উক্ত থানার ভারপ্রাপ্ত কমকর্তা। তাদের সাথে জেন্ডার অসংবেদনশীল আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে মারজিয়া প্রভা
আইজিপি বরাবর অভিযোগ করার প্রস্তুতি নেয়ামাত্র টনক নড়ে উক্ত কর্মকর্তার।
এবং একপর্যায়ে উক্ত কর্মকর্তা ক্ষমা চান মারজিয়া প্রভা’র কাছে।

দেখা যাচ্ছে দুটো ঘটনার নায়ক শেষপর্যন্ত ক্ষমা চেয়েছেন; আমার বক্তব্য ঠিক এখানেই।

এই যে ক্ষমা চাওয়া এটা কি আসলেই ক্ষমা চাওয়া?
আসলেই কি তারা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চেয়েছেন?

পাঠক আপনাদের কী মনে হয়?

না তাঁরা অনুতপ্ত হননি; তাই ক্ষমা চাওয়াটাও পুরোপুরি ভণ্ডামি।
আর এটাই পুরুষতন্ত্রের কৌশল!
এরা আসলে কখনোই নারীকে সন্মান করতে শেখেননি বা চানও না।

ক্ষমা চাওয়ার নিখুঁত অভিনয় করে এরা আসলে আপাত পরিস্থিতি সামাল দেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে লালন করেন নারীর প্রতি
অশ্রদ্ধা!
বিদ্বেষ!

এরা খুব ভালো করেই জানেন আপাত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলে বিপদ এড়ানো গেল।
তখন হাজারও ইস্যুর ভিড়ে হারিয়ে যাবে এই ইস্যু!
আই সুচতুর পুরুষতন্ত্র বিপদে পড়লে ক্ষমা চাওয়ার নিখুঁত অভিনয় করেন।
আর এটাই পুরুষতন্ত্রের কৌশল!

আমরা যদি এই বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনায় যাই তবে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, যেমন যদি গ্রাম্য সালিশগুলোর দিকে তাকাই লক্ষ্য করবো, সেখানেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে!

নির্যাতিতা নারী যখন নালিশ করেন বা প্রতিকার চান তাঁর উপর প্রযুক্ত অন্যায়, অত্যাচারের তখন অভিযুক্ত স্বামী সালিশে স্ত্রী’র কাছে ক্ষমা চাওয়ার নিখুঁত অভিনয় করে আপাত পরিস্থিতি সামাল দেন, কিন্তু স্ত্রী পুনরায় স্বামীর সংসারে ফিরে গেলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

পুনরায় স্ত্রী নির্যাতনের শিকার হোন!
তার মানে অভিযুক্ত স্বামী আসলে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাননি, সেটা ছিলো পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিনয়, কারণ কেউ অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলে পুনরায় একই কাজ করতে পারেন না।

অনুরূপভাবে যদি লক্ষ্য করি, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাগুলোর দিকে, সেখানেও একই চিত্র!
ক্ষমা চেয়ে বিয়ের ব্যাপারে রাজি হয়ে পরবর্তীতে আবার ভিকটিমকে ভয় দেখানো হয়।

এমন আরও অসংখ্য ঘটনার উল্লেখ করা যাবে; একজন প্রবাসী নারী তার স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে আইনের আশ্রয় নিতে গেলে স্বামী ও তাঁর পরিবারের লোকজন ওই নারীর কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, এমনটি আর হবে না। কিন্তু ওই নারী পুনরায় তাঁর স্বামীর দ্বারা অত্যাচারিত হোন।

সুতরং পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন কোনো পুরুষ বা তার আত্মীয়স্বজনেরা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চেয়েছে ভেবে খুশি হওয়ার কোনও কারণ নেই, বরং এটাই ভাবতে হবে নারীর প্রতিবাদী চেতনাকে দমিয়ে দিতেই তারা এই কৌশলগত অভিনয় করেন।
কারণ একবার নারীর প্রতিবাদী চেতনাকে ক্ষমা চাওয়ার অভিনয় করে স্তিমিত করে দিলে পুনরায় জ্বলে উঠা অনেকসময় আর হয়ে উঠে না, বা সময়ের স্রোতে ঘটনার গুরুত্বও কমে যায়!

যারা নারীবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত বা এর জন্য নারীবাদী হওয়ারও প্রয়োজন নেই; একজন সাধারণ নারীও তাঁর স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করলেই বুঝবেন যে পুরুষতন্ত্র এতো দাপট দেখাচ্ছে, শাসন -শোষণ করছে নারীকে তাঁরা কেন এত সহজে ক্ষমা চাচ্ছেন?
একটু ভাবলেই নারী বুঝতে পারবেন, চালাকিটা কোথায়?

তাই ওইসব পুরুষের ক্ষমা চাওয়াকে তাদের বিনয় না ভেবে আরেকটু যাচাই করুন নারী।
নারীমুক্তি আন্দোলনের দীর্ঘ কণ্টকপথ আপনাদের পাড়ি দিতে হবে আর সেই পথ পাড়ি দিতে আরেকটু বুঝে নিন পুরুষতন্ত্রের কৌশলগত দিকগুলো আর তাদের ষড়যন্ত্রের আদিম অন্ধকার রূপ!

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.