ফের সংগঠিত হচ্ছে জঙ্গিরা, গ্রেপ্তার ৯

Jongi 1
ছবি: প্রথম আলোর সৌজন্যে

উইমেন চ্যাপ্টার ডেস্ক: বরগুনায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীমউদ্দিন রাহমানীসহ ৩১ জনকে গ্রেপ্তারের দুই দিন পর ঝালকাঠির নলছিটিতে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) নয়জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এরা সবাই জঙ্গি সংগঠন তাআমীর উদ-দীন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং তাদের নেতা হচ্ছেন  হুজির সাবেক চিফ কমান্ডার (সামরিক শাখার প্রধান) মুফতি আবদুর রউফ।

মুফতি রউফ নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে হুজি থেকে বেরিয়ে গড়ে তোলেন আরেক জঙ্গি সংগঠন তাআমীর উদ-দীন বাংলাদেশ। তিনি ২০০৬ সালে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন। সংগঠনটি আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে ঢাকায় একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, গত বুধবার রাতে নলছিটি উপজেলার কামদেবপুরের খাদেমুল ইসলাম কওমি মাদ্রাসার মসজিদে অভিযান চালিয়ে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি গ্রেনেড, চারটি রামদা, কয়েকটি পুস্তিকা, কম্পিউটার কম্পোজ করা সাংগঠনিক নির্দেশিকা ও আটটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়। তবে গ্রেনেডটি অকেজো।

গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করা হয়েছে। দুই মামলায় নয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিন করে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আদালত ১৮ আগস্ট রিমান্ড শুনানির তারিখ ধার্য করেছেন।

নলছিটি থানার পুলিশ কর্মকর্তা জানান, হরকাতুল জিহাদের প্রধান মুফতি হান্নান ও সেকেন্ড ইন কমান্ড আবদুর রউফ কারাগারে থাকায় সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণের দায়িত্ব পান নলছিটি উপজেলার নাচনমহল গ্রামের মশিউর রহমান ওরফে মিলন তালুকদার। দায়িত্ব পেয়ে তিনি কারাগারে থাকা মুফতি হান্নানের নির্দেশে ভোলায় এক মাসের প্রশিক্ষণ শেষে গত ১০ আগস্ট নলছিটির কামদেবপুর গ্রামে আসেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কোরআন শিক্ষার নাম করে নয় সদস্যকে নিয়ে আশ্রয় নেন কামদেবপুর খাদেমুল ইসলাম কওমিয়া মাদ্রাসার মসজিদে। মাদ্রাসাটি বর্তমানে ঈদের ছুটি উপলক্ষে বন্ধ থাকায় ১১ আগস্ট সকাল থেকে সদস্যদের গ্রেনেড ও দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশ সুপার মো. মজিদ আলীর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল বুধবার রাতে প্রশিক্ষণ চলাকালে ওই মাদ্রাসা এলাকা ঘিরে ফেলে অভিযান চালায়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার সরমঙ্গল গ্রামের আবুল বাসার মৃধা (৪০), পূর্ব সরমঙ্গল গ্রামের মিনহাজুল আবেদীন (১৯), মজুমদারকান্দি গ্রামের আবদুল আজিজ (২৮), গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার জাকোর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম (৪৩), ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নাচনমহল গ্রামের মশিউর রহমান (৩২), মালুহার গ্রামের নুরুল ইসলাম (২৫), বাকি বিল্লাহ (২০), হারদল গ্রামের সোহাগ হাওলাদার (৩২) ও কাঠালিয়া উপজেলার আওরাবুনিয়া গ্রামের মো. জুবায়ের (২৫)। তাঁদের গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কারাবন্দী মুফতি আবদুর রউফের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে গ্রেপ্তারকৃত মশিউর জঙ্গিদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছিলেন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য নলছিটির মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলকে বেছে নেন তিনি। এ ছাড়া মশিউরের সঙ্গে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতা তালহার যোগাযোগ ছিল। এর আগে তাঁরা দুজন পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন অরণ্যে প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।

গ্রেপ্তারকৃত হুজি নেতা মশিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সংগঠনে যোগদানের পর বেশ কয়েকবার কাশিমপুর কারাগারে হুজি নেতা মাওলানা আবদুর রউফের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁকে খাবারও দিয়েছেন। তিনিই তাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সদস্য সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণের নির্দেশ দেন। এর মধ্যে ভোলায় এক মাসের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। আট থেকে ১০ জন সদস্য হলেই তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।’ একসময় ময়মনসিংহের ভালুকার জঙ্গলে রউফের প্রতিষ্ঠিত জীবনতলা মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতেন বলে স্বীকার করেন।

প্রসঙ্গত, মুফতি রউফের নেতৃত্বে তাআমীর উদ-দীন প্রতিষ্ঠার পর ভালুকার ওই মাদ্রাসাটি ছিল প্রধান আস্তানা। এখানে বাংকার খনন করে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো জঙ্গিদের। ২০০৬ সালের ২ আগস্ট এ মাদ্রাসায় র‌্যাব অভিযান চালিয়ে মুফতি রউফসহ ২৫ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ প্রশিক্ষণ সামগ্রী উদ্ধার করে।

আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুফতি রউফ এ দেশে হুজি’র প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির চিফ কমান্ডার ছিলেন। পরে তিনি হুজি ছেড়ে তাআমীর উদ-দীন প্রতিষ্ঠা করেন। এসব তথ্য মশিউর জানেন বলে স্বীকার করেন। একই সঙ্গে দাবি করেন, রউফ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাআমীর উদ-দীন ভেঙে গেছে।

মশিউর সাংবাদিকদের কাছে আরও দাবি করেন, মাদারীপুরের টেকেরহাট মোড়ে অবস্থিত তামীরুল কোরআন নামে নুরানি শিক্ষা বোর্ডের প্রধান সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সূত্রে নলছিটির ওই মাদ্রাসায় নুরানি কোরআন শিক্ষার কর্মসূচি চালু করার জন্য চেষ্টা করছিলেন।

সিরাজুল ইসলামও বুধবার রাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে। আর মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার মজুমদারকান্দি গ্রামে মুফতি আবদুর রউফের বাড়ি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.