দ্বৈত সত্তার দ্বান্দ্বিকতায় নারী

শামিমা নাসরিন:

দৈনন্দিন জীবনে প্রতিটি ব্যক্তিকেই বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ভূমিকা পালন করতে হয়। সামাজিক ভূমিকা বলতে কতগুলো আচরণের সমষ্টিকে বোঝায়, যেগুলো কোনো সামাজিক অবস্থানে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির কাছ থেকে সমাজ প্রত্যাশা করে।

সমাজের মৌলিক প্রতিষ্ঠান পরিবারের দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যেতে পারে। পরিবারের সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তি তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে, লৈঙ্গিক পার্থ্যক্যের ভিত্তিতে পুত্র কিংবা কন্যা, ভাই কিংবা বোন, স্বামী কিংবা স্ত্রী, বাবা কিংবা মা–এরকম বহুবিধ ভিন্নধর্মী অবস্থানে অধিষ্ঠিত হোন। সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ীই তাঁকে এসব অবস্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট ভূমিকাগুলো পালন করতে হয়। যেমন সন্তান হিসেবে তিনি বাবা-মায়ের প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল থাকেন, আবার বাবা কিংবা মা হিসেবে তাঁর সন্তানকে স্নেহে লালন-পালন করেন। একইভাবে পরিবারের বাইরেও তাঁকে নানাবিধ সমাজিক ভূমিকা পালন করতে হয়।

সমাজবিজ্ঞানী আরভিং গফম্যান এ প্রসঙ্গে একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি সমাজ জীবনকে অভিনেতাগণ কর্তৃক এক বা একাধিক মেয়ে অভিনীত নাটক হিসেবে দেখেছেন। কারণ একজন ব্যক্তি কীভাবে কোন কাজ করবেন, তা নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তিনি যেই ভূমিকাটি পালন করছেন তার উপর। উদাহরণ হিসেবে একজন কর্মজীবী মায়ের দৈনিক কার্যসূচির উল্লেখ করা যেতে পারে। সাধারণত তিনি তাঁর প্রতিটি দিন শুরু করেন ঘরকন্নার কাজের মধ্য দিয়ে। এরপর পরিপাটি সাজপোশাকে নিজেকে তৈরি করেন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। সেখানে তিনি নিয়োজিত হোন কর্মীর ভূমিকায়, প্রকাশ করেন পরিশীলিত ব্যক্তিত্ব। কাজের সময় সন্তানের জন্য মন উদ্বিগ্ন হলেও আচরণে যেন তা প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক থাকেন। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আবার তিনি হয়ে ওঠেন মা, স্ত্রী কিংবা গৃহিণী।

নিজের ভাবমূর্তি সম্পর্কে অন্যদের উপলব্ধিকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যক্তিসত্তার উপস্থাপনের এমন পরিবর্তনকে গফম্যান বলেছেন ইমপ্রেশন ম্যানেজমেন্ট। দৈনন্দিন মিথস্ক্রিয়ায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রেই এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখনই, যখন পিতৃতন্ত্র টিকে থাকার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে কেবল নারীর ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে।

এবার আসি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীর সমাজিক ভূমিকাকে কীভাবে দেখে সেই প্রসঙ্গে। ‘মা’ এবং ‘স্ত্রী’–নারীর এই দুটি ভূমিকা তাঁর অন্যান্য ভূমিকার তুলনায় প্রায় সকল সমাজেই বিশেষ ব্যঞ্জনা পেয়েছে। আমাদের সমাজেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়। এমনকি আমাদের সাহিত্যেও এর কিছুটা প্রতিফলন দেখা যায়।

যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর দুই বোন (১৩৩৯) উপন্যাসের শুরুতে লিখেছেন, ‘মেয়েরা দুই জাতের, কোনো কোনো পণ্ডিতের কাছে এমন কথা শুনেছি। এক জাত প্রধানত মা, আর-এক জাত প্রিয়া।’ উক্তিটি বিশ্লেষণ করলে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, মা এবং প্রিয়া–এই দুটি ভূমিকা ছাড়াও যে নারীর আরও অনেক ভূমিকা রয়েছে, সেগুলো উক্ত পণ্ডিতদের দৃষ্টিগোচর হয়নি।

দ্বিতীয়ত, তাঁরা এই দুটি ভূমিকার ভিত্তিতে সমগ্র নারী জাতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন, যা যুক্তিযুক্ত নয়।

তৃতীয়ত এর অর্থ দাঁড়ায়, যে নারী মা জাতের, তাঁর মধ্যে প্রিয়ার চরিত্র অনুপস্থিত। অন্যদিকে যিনি প্রিয়ার জাত, তাঁর মধ্যে মাতৃসুলভ আচরণ অনুপস্থিত। আমার বিবেচনায়, এই ধরনের শ্রেণীকরণ বাস্তবতা বিবর্জিত। কারণ একই নারী তাঁর সন্তানের নিকট মাতৃরূপ প্রকাশ করেন এবং স্বামীর কাছে স্ত্রী কিংবা প্রিয়ার ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন।

কোনো কোনো পুরুষ আবার মায়ের সাথে স্ত্রীকে তুলনা করেন। তাঁদের বিবেচনায় স্ত্রীর তুলনায় মা অগ্রগণ্য। তাঁদের কারও কারও দৃষ্টিতে মা এবং স্ত্রীর মধ্যকার মর্যাদাগত ব্যবধান যে কতখানি, তা বুঝতে পারলাম জনৈক ব্যক্তির এই উক্তিটির মাধ্যমে, ‘বউ মরলে বউ পাওয়া যায়, কিন্তু মা মরলে মা পাওয়া যায় না।’ যাঁরা এমনটি মনে করেন, তাঁদের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, একজন বিবাহিত নারী যাঁর এক বা একাধিক সন্তান আছে, তিনি মারা গেলে তাঁর স্বামী হয়তো আরেকজন স্ত্রী পেতে পারেন, কিন্তু ঐ নারীর সন্তানেরা মা পাবে কোথায়?

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোনো কোনো নারীও এমনটি বিশ্বাস করেন। কারণ তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার ছাঁচে তৈরি। একদিক থেকে দেখলে এই তুলনা করা হয় দুজন নারীর মধ্যে। কিন্তু একই নারী যখন কারও মা এবং কারও স্ত্রী, তখন এই তুলনা আসলে করা হয় একজন নারীর সামগ্রিক সত্তার একটি অংশের সাথে আরেকটি অংশের। অর্থাৎ একজন নারী সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত নিয়মে মা এবং স্ত্রীর ভূমিকা পালন করতে গিয়ে একদিকে মহিমান্বিত হচ্ছেন, অন্যদিকে আবার অবহেলিত হচ্ছেন।

বউ-শাশুড়ির মধ্যকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে নারীসত্তার এরূপ আংশিক মূল্যায়নের একটি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এই দ্বন্দ্বের জন্য নারী নিজেই দায়ী। তবে আমি বলবো, এই আপাত সত্যের আড়ালে লুকায়িত আছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা।

বিষয়টি ব্যাখ্যার প্রয়োজনে প্রথমেই সেসব পরিবারের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক, যেখানে নারীরা কেবল গৃহকর্মের মধ্যেই আবদ্ধ থাকেন। এ ধরনের পরিবারে গৃহের সকল কাজ সুচারুরূপে সম্পাদনের দায়িত্ব নারীর উপর ন্যস্ত থাকলেও কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের হাতে। তাই কর্তৃত্বের প্রয়োগ হয় নারীর উপর।

অন্যদিকে গৃহে বন্দী নারীও যেহেতু মানুষ, তাই তাঁর মধ্যেও ক্ষমতা চর্চার আকাঙ্খা থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি কার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন? নিঃসন্দেহে তাঁর স্বামীর উপর নয়, কারণ তিনি পরিবারের কর্তা এবং উপার্জনকারী। পুত্রের উপরও নয়, কারণ তিনিও পুরুষ এবং উপার্জনকারী, কিংবা বর্তমানে উপার্জন না করলেও ভবিষ্যতে এই দায়িত্ব তাঁর উপরই ন্যস্ত হবে। বাকি থাকলো নারী সদস্যগণ, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন কন্যা আর পুত্রবধূ। স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার প্রয়োগ নিজের সন্তানের উপর না হয়ে হয় অন্যের সন্তানের উপর। এখান থেকেই বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। আর শাশুড়ি যখন বার্ধক্যে পৌঁছান, তখন এই ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটে বিপরীত দিক থেকে। এই পর্যায়ে দ্বন্দ্বের কারণ নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। ফলে দ্বন্দ্বটি ক্রমান্বয়ে ঘনীভূত হতে থাকে সেই উপার্জনকারীকে কেন্দ্র করে, যিনি উক্ত শাশুড়ির পুত্র আর বউটির স্বামী।

অনেক সময় যৌতুককে কেন্দ্র করে এ ধরনের পরিবারে বউ-শাশুড়ির মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আসলে পিতৃতন্ত্র শুধু নারীর বিচরণ ক্ষেত্রকেই নিয়ন্ত্রণ করেনি, নিয়ন্ত্রণ করেছে তাঁদের মনোজগৎকেও। তাই যেসব নারী আজও পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেননি, তাঁদের কেউ কেউ পুরুষের হয়ে যৌতুক প্রথাকে বহাল রাখার কাজে অংশ নিচ্ছেন।

তাছাড়া নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাকেও এর জন্য দায়ী করা যায়। কারণ অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা থেকেই একজন নারীর মধ্যে তাঁর পুত্রবধূর বাবা-মায়ের সম্পত্তির প্রতি লোভ জন্ম নিতে পারে। অন্যদিকে কোন নারী যদি নিজেই অর্থোপার্জন করতে পারেন, তাহলে স্বামীর পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে বাবা-মায়ের দারস্থ হতে হয় না। তবে এটাও ঠিক যে অনেক শাশুড়িই চান না ছেলের বউ চাকুরী করুক। কারণ পুরুষতন্ত্রে দীক্ষিত এসব নারী ঘরকন্নার কাজকেই তাঁদের একমাত্র পেশা হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই একজন পুরুষের চিন্তার একটা বড় অংশ জুড়ে থাকেন তাঁর স্ত্রী। অধিকাংশ মা-ই এটা মেনে নিতে পারেন না। অন্যদিকে স্ত্রী হিসেবে একজন নারী প্রত্যাশা করেন স্বামীর পূর্ণ মনোযোগ। ফলে মা এবং স্ত্রীর অবস্থানে অধিষ্ঠিত দুজন নারী হয়ে ওঠেন একে অন্যের প্রতিযোগী। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতাই হতে পারে দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণ। সাধারণত যাঁরা গৃহিণী অর্থাৎ ঘর-সংসার এবং পরিবারের গুটিকয়েক সদস্যকে ঘিরেই যাঁদের চিন্তা আবর্তিত হয়, তাঁরাই এ ধরনের মনোভাব পোষন করেন।

যেসব পরিবারে বউ এবং শাশুড়ি উভয়ই অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর, উভয়েরই গৃহের বাইরে চিন্তা ও কর্মের বিস্তৃত ক্ষেত্র রয়েছে, সেখানে এ ধরনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয় না এমনটি বলা যাবে না। তবে তা তুলনামূলকভাবে কম। দুই প্রজন্মের দুই নারীর চিন্তাগত পার্থক্যই এক্ষেত্রে দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ। তাছাড়া বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব আমাদের সমাজে যেন এক চিরাচরিত রূপ পেয়েছে। তাই একে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরে নিয়েই সব শাশুড়ি তাঁর ছেলের বউকে ঘরে তোলেন আর সব বউ তাঁর শ্বশুরালয়ে প্রবেশ করেন। ফলে শুরু থেকেই এই সম্পর্ককে তাঁরা সহজভাবে নিতে পারেন না। তবে এর পরিণাম কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে কিংবা পিটিয়ে হত্যার পর্যায়ে পৌঁছায় না।

দৈনিক পত্রিকাগুলোতে চোখ রাখলেই তার প্রমাণ মেলে।
সুতরাং এটা পরিষ্কার যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজই একজন নারীকে আরেকজন নারীর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রাসঙ্গিকভাবেই এখন প্রশ্ন আসে, কীভাবে এই দ্বন্দ্বের নিরসন হতে পারে!

নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনকেই আমি এর প্রথম সোপান বলবো। এরপর প্রয়োজন সচেতনতা। যতটা সচেতন হলে একজন নারী বুঝতে পারবেন, পিতৃতন্ত্র তাঁর সামগ্রিক সত্তাকে ভেঙ্গে ‘মা’ এবং ‘স্ত্রী’–এই দুটি খন্ডে বিভক্ত করে একটিকে আরেকটির প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। ফলে পরস্পর বিরোধী দ্বৈত সত্তার সমন্বয়ে তিনি হয়ে ওঠেছেন এক দ্বৈরাজ্য।

অন্যদিকে তাঁর ‘স্ত্রী’ সত্তাটি লড়াই করছে আরেকজন নারীর ‘মা’ সত্তার সাথে এবং সময়ের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে তাঁর ‘মা’ সত্তাটি লড়ছে আরেকজন নারীর ‘স্ত্রী’ সত্তার সাথে। আর যতদিন নারীসত্তার এক অংশ অন্য অংশের সাথে তথা নারীরা একে অন্যের সাথে এভাবে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থাকবেন, ততদিন তাঁদের পক্ষে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব হবে না।

সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

শেয়ার করুন:
  • 2.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.3K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.