নির্লিপ্তি কিংবা সেলিব্রিটিভক্তি যখন বিষাক্ত ধর্ষকামিতাকে প্রশ্রয় দেয়

সুমু হক:

যে সামাজিক অবকাঠামোটি যৌন সন্ত্রাসের শিকার ব্যক্তিদেরকেই তাদের ওপর ঘটে যাওয়া যৌন শোষণের জন্যে দায়ী করে যৌন সন্ত্রাসীদের পক্ষে অজুহাত সৃষ্টি করে যুগের পর যুগ ধরে ক্রমাগতভাবে এই যৌনশোষণের ধারাটিকে অবাধ প্রবাহে চলতে সাহায্য করে এসেছে, তাকে বোঝাবার জন্যে গত শতকের সত্তরের দশক থেকে নারীবাদীরা ইংরেজিতে “Rape Culture” শব্দ দুটোকে (বাংলায় বলা যেতে পারে
“ধর্ষকামিতার সংস্কৃতি”) ব্যবহার করতে শুরু করেন।

ধর্ষকামিতার সংস্কৃতি মানে নারীর চরিত্রের ইন্টেগ্রিটিকে তার পোশাকের দৈর্ঘ্য আর পুরুষের পৌরষকে তার শয্যাসংগীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা। ধর্ষকামিতার সংস্কৃতি মানে নারীদেহ মানেই খাদ্য আর পুরুষ মানেই ভক্ষক এই পঁচে যাওয়া নিয়মটাকেই অবিসংবাদিত বলে ধরে নেয়া। ধর্ষকামিতার সংস্কৃতি মানে বিলবোর্ডে গাড়ির কিংবা শেভিং ক্রিমের বিজ্ঞাপনে নারীর মেলে দেয়া দেহে আলোর ফোকাস। ধর্ষকামিতার সংস্কৃতি মানে প্রকাশ্য রাজপথে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা নিথর নারীদেহের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরের চোখে লকলকে ধারালো লোভের আগুন।

উডি এলেন, হার্ভে ওয়েইনস্টাইন, রোমান পোলান্সকি, বিল কসবি, কোবি ব্রায়ান্ট, জিয়ান গোমেশি, জুলিয়ান আসাঞ্জ, অলোকনাথ, কিরণ খের, ড্যানিয়েল শ্রাবণ, সেলিম আল দীন, অনুরাগ কাশ্যপ, তাপস পাল। প্রশ্ন উঠতে পারে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন আলাদা আলাদা ক্ষেত্র যেমন রাজনীতি, চলচ্চিত্র, সাংবাদিকতা এমনকি খেলার জগতের মত ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের এই জীবিত এবং মৃত সেলিব্রেটিদের নামগুলো আমি এক জায়গায় একসাথে উল্লেখ করছি কেন। কী এমন সাধারণ সূত্র, যা এদেরকে এক জায়গায় গেঁথে রেখেছে?

উত্তর একটাই।
কোন না কোনভাবে, কোন না কোন সময় এইসব ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই হয় সক্রিয়ভাবে যৌন সন্ত্রাসের কোন ঘটনা ঘটিয়েছেন, কিংবা ঘটাবার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন আর নয়তো ধর্ষণের দায়ে ধর্ষকের পরিবর্তে ধর্ষণের শিকার নারীকে অভিযুক্ত করে যৌন সন্ত্রাস এবং ধর্ষকামিতার আবহমান সংস্কৃতিটি প্রবাহমান
রাখতে সক্রিয় কোন একটি ভূমিকা রেখেছেন।

যে প্রশ্নটি প্রায়ই সামনে আসে, সেটি হলো, আমরা কি এইসব ক্ষেত্রে ব্যক্তির কাজ কিংবা সমাজে তাদের অবদানের কথা ভেবে তাদের অপরাধগুলোকে এড়িয়ে যাবো, নাকি তাদের অবদানগুলোকে, তাদের কাজগুলোকে তাদের কাজের জায়গায় রেখে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তাদের অপরাধগুলোকে বিচার করবো? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনার জায়গা, এবং অত্যন্ত বিপদের জায়গাও বটে।

একদিকে যেমন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মতো একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার অপরাধটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে তথ্য এবং তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহের স্বপক্ষে তার আজীবনের কাজ এবং উইকিলিকসের মতো একটি উদ্যোগকে দমিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি আবার সেই একই সেলিব্রেটি স্ট্যাটাসের ব্যবহারে আমরা দেখেছি কোবি ব্রায়ান্টের মতো জনপ্রিয় একজন খেলোয়াড়কে
ধর্ষণের মামলা থেকে অবলীলায় নিষ্কৃতি পেতে।

এতো গেলো সেই ঘটনাগুলোর কথা, যা খবরের কাগজ কিংবা পুলিশের অভিযোগের খাতা
পর্যন্ত পৌঁছায়। এর থেকে অনেক গুণ বেশি ঘটনা যে সে পর্যন্ত পৌঁছোয় না, সে আমরা সবাই জানি,
আর কেন পৌঁছোয় না, জানি সেটাও।

গতকাল পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রাভিনেতা তাপস পাল মারা গেছেন। এই নিয়ে অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন, স্মরণ করেছেন তার অভিনয়ের কথা, তা তারা করতেই পারেন, উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে তাদের উচিত ছিল তাপস পালের রাজনীতি নিয়েও কিছু বলা।

মৃত মানুষটি যখন একজন সেলিব্রেটি হয়, তখন তার জীবন নিয়ে কথা বলতে গেলে তার সম্পর্কে শুধুমাত্র মিষ্টিমধুর স্মৃতিকথা লিখে গেলেই আমাদের কাজ শেষ হয়ে যায় না, অন্তত সেক্ষেত্রে তো নয়ই যেখানে মৃত মানুষটির জীবনে কোথাও একটা অত্যন্ত ভয়ংকর আপত্তির জায়গা আছে, আর যিনি তার সম্পর্কে লিখছেন কিংবা বলছেন, তিনিও একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসিবে পরিচিত এবং সেই
হিসিবে সমাজের কাছে তাঁর খানিকটা দায়ও আছে।

আপনারা বলতেই পারেন যে
১. তাপস পাল যে বিতর্কিত মন্তব্যটি করেছিলেন, অর্থাৎ, তার দলের ছেলেদের দিয়ে প্রতিপক্ষের পরিবারের নারীদের ধর্ষণ করতে পাঠাতে চেয়েছিলেন (বিবিসির রিপোর্টের লিংকটি এখানে দেয়া হলো, চাইলে দেখতে পারেন https://www.bbc.com/bengali/news/2014/07/140701_mrk_india_west_bengal_tapas_rape?fbclid=IwAR1QiVwfK0plMlfIQOdDQxuKsfYoOYZSogh_s0_wZSBlln1vKIBrN-yESDk)

সেটা তার উত্তেজনার মুহূর্তের কথা,
২. রাজনীতির মাঠে এমন অনেকেই বলে,
৩. এরপর তিনি অকপটে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

তাহলে এবার আপনাদের বলছি শুনুন, উত্তেজনার মুহূর্তে আমরা যা বলি, সেটা সাধারণত আমাদের অবচেতন চিন্তাগুলোরই বহিঃপ্রকাশ, অর্থাৎ, তার চিন্তার কোথাও এই ধরনের একটি নোংরা ধারণা না থাকলে উত্তেজনার মুহূর্তেও কথাটি তিনি বলতেন না।

হ্যাঁ, রাজনীতির মাঠে এমন কথা অনেকেই বলে, এবং তারা প্রত্যেকেই একেকজন ধর্ষকামী, তাদের রাজনৈতিক নেতার মুখোশের আড়ালে একেকজন ধর্ষক লুকিয়ে বসে আছে এবং তাদের প্রত্যেকের প্রতিই ঠিক একইরকমভাবে প্রতিবাদের আঙ্গুল ওঠাটাই উচিত এবং স্বাভাবিক।। আর এমন অন্যায়ের পর ক্ষমা চাইলেই সব স্বাভাবিক হয়ে যায় না, যদি না সেই ক্ষমা কোন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন থেকে আসে।
আর সেই পরিবর্তন, বিশ্বাস করুন, এতো সহজ নয়।

Rape Culture নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই শুনতে হয়, এত ছোট ছোট ঘটনা ধরো কেন? তাহলে তো সবকিছুই ধরতে হয়! সবকিছু নিয়েই সারাক্ষণই তর্ক চালিয়ে যেতে হয়!
হ্যাঁ, ধরতে হয় বৈকি।

একজন তাপস পালের একটি আকস্মিক ধর্ষণের হুমকি এবং পরমুহূর্তে যেন খুব সামান্য অন্যায় করেছেন, এমনভাবে ক্ষমা প্রার্থনা, ও সেই ক্ষমা প্রার্থনার সারল্য দেখে আমাদের বিগলিত হয়ে যাওয়া, একজন উডি এলেনের নিজের কন্যার ওপর চালিয়ে যাওয়া যৌন অত্যাচারকে তাঁর প্রতিভার কথা মাথায় রেখে উড়িয়ে দেয়া, সমস্ত পৃথিবীজোড়া কতসব গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র সৃষ্টির পেছনে যার অবদান, পৃথিবীর মাথা মাথা নারীবাদীরা যেই হিলারি ক্লিনটনকে মার্কিন নির্বাচনে সমর্থন জানিয়ে এসেছেন সেই হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচারণায় টাকা ঢালা এবং ক্ষমতার দাপটে পৃথিবী কাঁপানো হার্ভে ওয়েইনস্টাইন, প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার রোমান পোলান্সকি, অভিনেতা বিল কসবি, দুটো চারটে ধর্ষণ টর্ষণ করতেই পারেন।

একজন সেলিম আল-দ্বীনকে নিয়ে আলোচনা চলছে? তা ওসব সৃষ্টিশীল মানুষদের
ওরকম একটু আধটু নাহলে আবার চলে নাকি!
মুভি থিয়েটারে বসে নায়িকার হাজার প্রতিবাদ সত্ত্বেও নায়কের তাকে জোর জবরদস্তি করে প্রেম কিংবা বিয়েতে রাজি করানো দেখে দর্শকের আসনে বসে উল্লাসে ফেটে পড়া, পথে ঘটে নারীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য করাকে আমাদের পিতৃদত্ত অধিকার বলে মনে করা, অফিসে পুরুষ কলিগেরা বসে নারী কলিগদের সামনে অশ্লীল যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলে তাদেরকে অস্বস্তিতে ফেলা, কেউ ধর্ষণের শিকার হলে প্রথমেই তার চরিত্র এবং পোষাক -আষাক নিয়ে গবেষণা করতে বসা এসব খুবই ছোটখাটো ব্যাপার!
কিন্তু এইসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনা জমে উঠে পাহাড়প্রমাণ হয়ে তবেই ধর্ষকামিতার সংস্কৃতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে চলে।

গতকাল আমার এক অগ্রজাকে তাপস পাল প্রসঙ্গে এই কথাগুলো বলতেই ও বললো, ও
তাপস পালের সারল্যভরা দিকটিই শুধু মনে রাখতে চায়। আমরা সবাই বোধহয় কম বেশি তাই ই চাই।
তিক্ততা, সিরিয়াস আলোচনা, Rape Culture, কী হবে এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে? যে যা করছে করুক না কেন! মরেই যখন গেছে লোকটা তখন আর এসব মনে রেখে কী লাভ, তার ভালো কাজগুলো মনে রাখলেই হয়!

না, হয় না!
হয় না তার কারণ, এমন এক এক করে এক একেকটি মানুষের এক একেকটি ছোট বড় অন্যায়কে অগ্রাহ্য করতে করতে একসময় আমরা ক্রমশ: আরো বড় বড় অন্যায়কেও অগ্রাহ্য করতে শুরু করি। আর সেখানটাতেই পতনের শুরু।

বেশ ক’বছর আগের কথা। কেনেডিয়ান মিলিটারির অত্যন্ত উচ্চপদস্থ একজন কর্নেল অভিযুক্ত হলেন ধর্ষণ এবং হত্যার অভিযোগে। তার যৌন বিকৃতির কতখানি পত্রিকায় ছাপা উচিত হবে এ নিয়ে সেসময় টরন্টো স্টারের সম্পাদকীয় পর্যায়ে বিস্তর আলোচনার পর অবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যে আপাতদৃষ্টিতে যত বিকৃতই হোক, সব ডিটেইলই তারা প্রকাশ করবেন। কারণ আর কিছুই নয়, আজ থেকে ২০ কী ২৫
বছর পর যখন এই ব্যক্তিটি আবার প্যারোলের (এক ধরনের বিশেষ জামানত) জন্যে
আবেদন করতে পারবেন, তখন পর্যন্ত যেন এই অপরাধের ভয়াবহতা মানুষের মনে গভীর
দাগ কেটে থাকে।

হ্যাঁ, ক্যানাডার মতো সভ্য দেশে এমন চরম অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় না বটে, ফাঁসি দিয়েই সেই অপরাধকে সমাজের সামষ্টিক মানস থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়া হয় না, স্মৃতি থেকেও মুছে ফেলার চেষ্টা
করা হয় না। বরং চেষ্টা করা হয়, এই অপরাধ এবং এর ভয়াবহতা যেন অনন্তকাল ধরে সবাইকে তাড়া করে বেড়ায়। সভ্যতার এটাই লক্ষণ।

ধর্ষণ ঘটে কেবল একজন ধর্ষককে দিয়ে, কিন্তু ধর্ষকামিতার সংস্কৃতি প্রতিদিন হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ ধর্ষককে জন্ম দেয়, লালন পালন করে, আশ্রয় দেয়। তার থেকেও ভয়ংকর যা, একজন ধর্ষককে নাহয় ফাঁসি দিয়ে দিলেন, কিন্তু যে সমাজ তাকে তৈরি করছে, তাকে ফাঁসি দেবেন কী করে? সে কী! জানেন না!
এবার তাহলে একটু করে ভাবুন, কেমন! ভাবা প্র্যাকটিস করুন!

শেয়ার করুন:
  • 161
  •  
  •  
  •  
  •  
    161
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.