পাপড়ি রহমানের ‘বনতরুদের বায়োগ্রাফার’

আফসানা কিশোয়ার লোচন:

আমাদের দেশের সাহিত্যিকদের একধরনের নার্সিসিজম আছে, এটা বহু বছরের সাহিত্য চর্চার সময় দেখেছি, তারা কারও লেখা মানে নিজের দেশের কারও লেখা পড়েন না সহজে। তাদের নির্দিষ্ট সার্কেল থাকে, সেখানে তারা একে অন্যকে পানি দিয়া চলেন, তাদের দুনিয়াটাও নেটওয়ার্কিং এর। তারা কাওরে পোছেন না।
তো সেই দুনিয়ার ব্যতিক্রম ভাদাম হইলাম আমি, যে বই শুনলেই চোখে হাজার ওয়াটের বাতি জ্বাইলা মুখ হা কইরা চাইয়া থাকি পড়ার জন্য। নানা জনের নানা নেশা থাকে, বই আমার একমাত্র নেশা, আমারে কেউ রুম বন্ধ কইরা খানা খাদ্যের যোগান দিয়া ৫ মাস ও বন্দী কইরা রাখতে পারবে শুধু মনের মতো বই পড়তে দিলে, সাথে গান।

যাই হোক আজকে যে বই পড়লাম তার রিভিউ দিলাম নিচে-

বই কেন পড়ে মানুষ? নিজের মুখোমুখি হতে, নিভৃতে অনেক সময়। বিনোদন সর্বদা মুখ্য হয়ে ওঠে না,ভাবনার জগতে ঘুরবার জন্য ও অনেকে পড়ে,বই। প্রতি পাতার শব্দরাজি আপনাকে নানা ভাবনায় ডুবিয়ে দেবে এমন এক বই এবার লিখেছেন লেখক পাপড়ি রহমান, যার নাম বনতরুদের বায়োগ্রাফার। কি ভাবছেন গল্পের বই, উপন্যাস,কবিতা? উহুঁ, কোনটাই না, এই বইটি হলো মুক্ত গদ্যের। লেখক নিজের সাথে নিজে ভাব বিনিময় করেছেন,১৬ টি মুক্ত গদ্য আছে বইটিতে,অবিশ্বাস্যভাবে পাঠকের মনে হবে প্রতিটি পাতা নিয়েই বুঝি আলাদা করে লেখা যায়। সেকারণে এ বই এর রিভিউ করা একটি দুরূহ বিষয় মনে হয়েছে আমার প্রতি মুহূর্তে।

পাঠক হিসেবে আমার এ বই এর সাথে অতি একাত্ম হবার কারণ সম্ভবত জীবনানন্দের কবিতার উদ্ধৃতি ও ব্যাখ্যা লেখকের নিজের মতো করে। আমাদের মতো বিষণ্ণ ও স্মৃতিকাতর মানুষদের,যারা প্রকৃতির কাছে সব বেদনার মুক্তি আছে ভেবেছেন বরাবর তাদের জীবনানন্দ ছাড়া আর কে-ই-বা আছে!

প্রথম লেখা শীতঃনক্ষত্রের নিচে ঘাসের বিছানায় বসে অনেক পুরনো শিশির ভেজা কোন গল্প নয়! শুরু হচ্ছে জীবনানন্দের মৃত্যু কবিতা উদ্ধৃত করে

হাড়ের ভিতর দিয়ে যারা শীত বোধ করে
মাঘ রাতে;-তাহারা দুপুরে বসে শহরের গ্রিলে
মৃত্যু অনুভব করে আর ও গাঢ় -পীন।

এর নিচেই পাপড়ি রহমান লিখেছেন মৃত্যু আমার কাছে শীতের মতো। হঠাৎ করে উষ্ণতা হারিয়ে হিমের ভেতর নিজেকে দেখার নামই মৃত্যু। এরপর জীবনের জন্য শত হাহাকার করলেও ফিরতে না পারা!

‘নাইওর’ নিয়ে নারী মাত্রের বুক চোখ পুড়ে যাবে মানবীর অশ্বত্থ-বটের আবছায়া অংশে এলে। নাইওর ছিল অন্তঃপুরনাসিনীদের জন্য খোলা ময়দান,অবারিত আসমান। নাইওর যাওয়ার মর্সিয়া লিখলেন মীরা দেব বর্মণ, গাইলেন শচীন দেব কে যাস রে/ভাটির গাঙ বাইয়া/আমার ভাইয়েরে কইয়ো নাইওর নিত বইলা/তোরা কে যাস…
নাইওরে যে নারীটির শরীর-স্বাস্থ্য জুড়োবার বিষয় ছিল তেমন নয়, মনটাকেও একেবারে পাখি করে উড়িয়ে দেওয়া যেত।

নাইওর জড়িত বাপের বাড়ি শব্দবন্ধটির সাথে। মায়ের বাড়ি নয় কেন?এ নিয়েও লেখক ভেবেছেন কম নয়। এভাবে কিন্তু ফাঁকে ফাঁকে লেখক তার জেন্ডার সত্তার প্রতি যে দায়বোধ মানবিকতার তা পাঠকের উঠোনে প্রশ্ন আকারে ছুঁড়ে দিয়েছেন,নিজের ভাবনা বলে আবার পাঠক কেও ভাবতে আগ্রহী করছেন। বই এর কাজ এটাই ভাবনা প্রশ্ন উসকে দেয়া।

মানব জীবন যেন এক লাভ-ক্ষতির একাউন্টিং ব্যালেন্স শিটে পরিণত হয়েছে। জগৎ জুড়িয়া কোন জাতিই বা রয়েছে যে নিজের লাভালাভের ধান্দার বাইরে থাকে?লাভ-ক্ষতির বেহিসেবী ক্ষতিয়ান অংশে এমন ছোট ছোট পাঞ্চ আর ও আছে। কিছুটা নিজের স্মৃতিচারণ,কিছু অংশে নিজস্ব ভাবনা,ও পাঠকের প্রতি ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্ন এমন মেলবন্ধনের কারণে মনোযোগ হারিয়ে বইটি পড়ার কোন উপায় নেই। আপনাকে শতভাগ মনোযোগী হয়ে ৬৮ টি পাতা পড়তে হবে।

Love is from the infinite, and will remain until eternity.
The seeker of love escapes the chains of birth and death.
Tomorrow, when resurrection comes,
The heart that is not in love will fail the test. ( জালালউদ্দিন রুমি)

ছেলেটি অনুভব করে সে ধীরে ধীরে পাথরে রূপান্তরিত হচ্ছে। বড় এক পাথরে পরিণত হয়ে যাওয়ার পর সে ঘুমিয়ে পড়ে। নিশ্চিত এক ঘুম। এরপর কোন চুম্বনের জন্য তার আর হাহাকার নাই। অতৃপ্তি নাই!
পাথরকে কোন বেদনা কখনো স্পর্শ করতে পারে না।
কী করুণ কী প্রগাঢ় এই বিরহ ও বেদনা, আহা এ যেন কলিজা দীর্ণ করার মতো, প্রেমিক প্রেম না পেয়ে প্রস্তরীভূত হয়ে যাচ্ছে বিচ্ছেদের আঁচে!

উদয়তারার আলো দিয়ে বোনা শাড়ি- কী যে চমকপ্রদ উপায়ে কবির বিষণ্ণ হৃদয় এর কাহন গাইতে গাইতে লেখক নারীর পোশাক শাডি নিয়ে ভ্রমণ করান পাঠক কে তা মনে রাখার মতো। শাড়ির উৎস, এ পোশাক কে তার ভালো লাগা না লাগার বর্ণ, শাড়ি পরার হালের ঢং সব বলে শেষ করেন কি সুন্দর করে-সে কী জানে না এই শাড়ির আধার বহু আগেই ফেলে এসেছে তার অবিশ্রাম উড়ালের বসন্তদিন! সবকিছু জেনেবুঝেও বড় মমতায়,বড় ভালোবেসে উদয়তারার আলো দিয়ে সে বুনে পাঠিয়েছে এক অলৌকিক শাড়ি!

পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
প্রেম ধীরে মুছে যায়,নক্ষত্রের ও একদিন মরে যেতে হয়,
হয় নাকি?বলে সে তাকালো তার সঙ্গিনীর দিকে;
আজ এই মাঠ সূর্য সহধর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে
প্রাণ তার ভরে গেছে। (জীবনানন্দ দাশ)

বন্ধুত্ব মানে, আমি তার কাছে কতটা কমফোর্ট ফিল করি-আর সে আমার কাছে কতটা-
ভাবছেন কি?এই যে বন্ধুত্বের নানাদিক- বন্ধুতার মধু আজ ঈর্ষা,দ্বেষ,অসূয়া,প্রতারণায় বিষজর্জর হয়ে উঠেছে…এই অধ্যায়ে পেয়ে যাবেন।

দৌড়হীন এক পৃথিবীর তালাশরত লেখক, যেখানে শিমুলফোটানো ভোর থেমে থাকবে বন্ধুত্বের দরোজায়…

Calm down, Sorrow dear, and be at peace; you said you wanted Evening; it’s coming; here it is; a shadowy atmosphere is enfolding the city, bringing peace to some and to others cares.
(Charles Baudelaire)

পাপড়ি রহমানের মুক্ত গদ্যের সাথে কয়েকদিনের যাত্রায় আমি সমৃদ্ধ হয়েছি। পুরো বই নিয়ে শুরুতেই বলেছি আদতে রিভিউ করা সম্ভব নয়।

লেখকের জেন্ডার হয় না, তথাপি ক্ষমা চেয়ে নিয়েই বলছি নারী না হলে উনি এমন করে নারীর জীবন অনুভব হয়তো করতে পারতেন না। এখানে তার জেন্ডার পরিচয় তাকে সামান্য হলেও সুবিধা দিয়েছে।

চৈতন্য থেকে প্রকাশিত বইটির মূল্য ২৫০ টাকা, প্রচ্ছদ করেছেন নির্ঝর নৈঃশব্দ্য। অন্য স্বাদের কিছু পড়তে চাইলে বইটিকে আমি তালিকার একদম উপরে রাখার পরামর্শ দেবো পাঠককে।

শেয়ার করুন:
  • 62
  •  
  •  
  •  
  •  
    62
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.