আপনি নারীকে পরোক্ষ হ্যারাজমেন্ট করছেন না তো?

উপমা মাহবুব:

এগুলো নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না। তারপরও কথাগুলো মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে। আচ্ছা, বাংলাদেশে এরকম ছেলের সংখ্যা কত যারা জীবনে ক্লাসমেট বা বান্ধবীদের বুকের মাপ নিয়ে গবেষণা করেনি? ব্লু ফ্লিম দেখেনি? বন্ধুদের আড্ডায় কোনো মেয়েকে চিজ বা মাল বলেনি? কর্মক্ষেত্রে হুটহাট একনজরে সহকর্মীর বুকের দিকে তাকানো পুরুষের সংখ্যা যে কত তা নিয়ে গবেষণা করলে আমার মনে হয় বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ বিপদে পড়ে যাবেন।

আচ্ছা, এ রকম নারী-পুরুষের সংখ্যা কত যারা পোশাককে রেপ হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করে? সেলিব্রেটি নারীকে প্রস্টিটিউট মনে করে? সেলিব্রেটিরা যখন তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো এ্যাবিউজের খবর প্রকাশ করে তখন সেটা নিয়ে ফেসবুকে যে কমেন্টের বন্যা বয়ে যায় তা পড়লেই বোঝা যায় বাংলাদেশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সংক্ষিপ্ত পোশাকের মেয়েদের আর সেলিব্রেটিদের রেপ বা হ্যারাজ হওয়াকে জায়েজ মনে করা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কতটা বেশি।

উপমা মাহবুব

আমার আশেপাশে যেসব পুরুষেরা আছে, মানে যাদের সঙ্গে আমি মিশি, আমি জানি তাদের বড় অংশই অযাচিতভাবে কোনো মেয়ের গায়ে হাত দেয় না৷ এ বিষয়ে তারা খুব সচেতন। তারা স্ত্রীকে ভালোবাসে, তাদের স্বাধীনতা দেয়। কিন্তু ভীড়ের মাঝে কারো গায়ে হাত না দেওয়া বা স্ত্রীর প্রতি নিষ্ঠাবান থাকাই কি সব? তারা কী ধরেই নিতে পারেন যে, আমি তো সরাসরি কাউকে হ্যারাজ করছি না, তাই একটু-আধটু অশালীন জোকস আমি বলতেই পারি, বা কারও শরীর নিয়ে বন্ধুদের আড্ডায় মজাও করতে পারি – এতে দোষের কিছু নাই।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি অনেক ছেলেকে আদিবাসী মেয়েদের সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করতে শুনেছি। তাদের ধারণা আদিবাসী মেয়েরা নাকি বিছানায় দারুণ। অথচ এই ছেলেগুলোই তাদের বাঙালী বান্ধবীকে প্রোটেক্ট করতে নিজের জান দিয়ে দেবে সেই প্রমাণও পেয়েছি।

ঐদিন এক খবরে দেখলাম, এক ধর্ষককে উত্তেজিত জনতা পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে। খবরটা পড়ে দু:খ লাগলেও হাসিও পেয়েছে। ঐ উত্তেজিত জনতার মধ্যে কতজন আছে পরিচিত একটা মেয়ের বুকের মাপ নিয়ে বন্ধুদের চটুল আলোচনায় অংশ নেন না? কয়জন আছে যারা ভীড়ের সুযোগে কোনো পথচারী মেয়ের শরীরে হাত দেননি? আর কোনো সেলিব্রেটির অন্তরঙ্গ ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশ পেয়ে গেলে সেই ছবি নিয়ে বাঙালী পুরুষরা যে কী করতে পারে আর কী করতে পারে না, সেই আলোচনায় আর না গেলাম। অথচ সেই পুরুষরাই ধর্ষণের ঘটনায় একদম ক্ষেপে গিয়ে পুড়িয়ে ধর্ষককে মেরে ফেলতেও পারে। যেন তারা নারীর প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল, তাদের সুরক্ষা বিষয়ে কতটা সেনসেটিভ!

ভাইরে, ধর্ষণ বা সরাসরি শারীরিক লাঞ্ছনাই শুধু অপরাধ না। আপনি, আপনারা প্রতিনিয়ত নারীকে চোখ আর কথা দিয়ে লাঞ্ছনা করে চলেছেন৷ আর আমাদের পুরো সমাজই তাতে মদদ দিচ্ছে। এই সমাজ সারাক্ষণ ব্যস্ত নারী ও পুরুষকে আলাদা করায়। তারা একসঙ্গে খেলতে খেলতে বড় হতে পারবে না। একই ক্লাসে পড়তে পারবে না। পরিবারে ছেলেদের মেয়েদের সম্মান করতে শেখানো হয় না এদেশে। তার আসলে তেমন কোনো প্রয়োজনই নাই। কারণ এই রাষ্ট্রে নারীর জন্য বাসে আলাদা সিট, ব্যাংকে মেয়েদের জন্য আলাদা কিউ, আলাদা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুর ব্যবস্থা আছে। অতএব দুই পক্ষ একজন আরেকজন থেকে দূরে থাকলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। পরিবার থেকে এই দূরে থাকার পদ্ধতিই শেখানো হয়। ফলাফলস্বরূপ কিশোর বয়সে নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। পরস্পরের মধ্যে স্বাভাবিক মেলামেশার মাধ্যমে শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠার বদলে, অশালীন জোকস, পর্নোগ্রাফি, ইভ টিজিং- এগুলো হয় অপর লিঙ্গকে জানার মাধ্যম।

আমাদের পিতামাতা এবং পরিবার জেনে বা না জেনে বছরের পর বছর ধরে নারীকে নিয়ে বন্ধুদের আড্ডায় অশালীন জোকস বলা, ইভ টিজিং করা, তার শরীরের বিশেষ অঙ্গের দিকে তাকিয়ে কথা বলা, ইত্যাদি প্র্যাকটিসকে ধারণ করে আসছে। এর জন্য আমি শুধু পুরুষদের নয়, বরং পুরো সমাজ ব্যবস্থাকেই দায়ী করি। সমাজে আস্তে আস্তে সচেতনতা বাড়ছে, পরিবর্তন হচ্ছে এটাও ঠিক। তবে এর গতি খুব ধীর।
আমার মনে হয় এক্ষেত্রে পুরুষদের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। তারাই ভালো জানেন কৈশোর বা তরুণ বয়সে তাদের আড্ডায় কী নিয়ে আলোচনা হতো। স্কুল-কলেজের মেয়েদের দেখলে তারা কীভাবে ইভটিজিং করেছেন। তারা এটাও ভালো জানে এখনও কর্মক্ষেত্রে কিভাবে নারীদের হ্যারাজ করা হয়। পুরুষ সহকর্মীরা নারী সহকর্মীদের কোন কোন বিষয় নিয়ে জোকস করেন। নারীরা বড়জোর এগুলোর প্রতিবাদ করতে পারে, কিন্তু বদলানোর চাবিকাঠি আছে পুরুষদেরই হাতে। তাই এই বিষয়গুলো যেন পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেদের মাঝে ছড়িয়ে না যায় সেক্ষেত্রে বাবাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে শুধু ধর্ষণ বা শারীরিকভাবে হ্যারাজ করাই অপরাধ নয়। মৃত্যুদণ্ড, লিঙ্গ কর্তন ইত্যাদি কোনো শাস্তিই পুরোপুরি কাজ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত পরোক্ষ হ্যারাজমেন্টকে যথাযথভাবে এ্যাড্রেস করা না হচ্ছে। তাই একটা ধর্ষণ ঘটে গেলে শুধু প্রতিবাদের জন্য প্রতিবাদ নয়। আসুন সমস্যার মূলে গিয়ে আগে নিজেদের সংশোধন করি। দেখবেন পরির্বতন আসবেই৷

শেয়ার করুন:
  • 269
  •  
  •  
  •  
  •  
    269
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.