মাসিক যন্ত্রণা, মেন্সট্রুয়াল কাপ এবং নারীবাদ

ফাহমি ইলা:

পিরিয়ড/মেন্সট্রুয়েশন/ঋতুস্রাব নিয়ে সারা পৃথিবী জুড়েই নানা রকমের মিথ, কুসংস্কার, ভুল ধারণা চালু আছে। পিরিয়ড একটি ট্যাবু, পিরিয়ডের রক্ত অপবিত্র/অস্বাস্থ্যকর/জীবাণুযুক্ত, পিরিয়ডে নারী অশুচি এ ধারণা এখনো বিদ্যমান। শুধুই বিদ্যমান নয়, শিক্ষিত সমাজের কাছেও এক্সেপ্টেড! বায়োলজির ছাত্রটি থেকে ডাক্তার, ডাক্তার থেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি অনেকেই জিনগতভাবে এ ধারণা বহন করছে, চোখের সামনে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা থাকা সত্ত্বেও। পৃথিবীর এমন অনেক অঞ্চল আছে যেখানে আজও পিরিয়ড হলে নারীকে সাতদিন সূর্যের আলো পর্যন্ত দেখতে দেয়া হয় না! অথচ নিষিক্ত হতে না পারা ডিম্বাণু মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বেরিয়ে আসা ছাড়া এ কিছুই না।

ফাহমি ইলা

প্রথম পিরিয়ডের কথা মনে আছে। স্কুলে ক্লাস চলাকালীন হঠাৎ পেট ব্যথা শুরু হলো এবং মুহুর্তে বেঞ্চ ভরে গেলো রক্তে। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীটি সেদিন বটলগ্রিন কার্ডিগান কোমরে পেঁচিয়ে বাসায় ফেরে। এরপর বেশ ক’বছর কাপড় ব্যবহার করতে হয়৷ বাংলাদেশে বহু মেয়ে এখনো কাপড় ব্যবহার করে। যেই কাপড় গোপনে ধুয়ে ছায়ায় স্যাঁতসেঁতে জায়গায় লুকিয়ে শুকায়। এ যে লজ্জার বিষয়, অন্য কেউ দেখে ফেলাও পাপ! ফলশ্রুতিতে ফাঙ্গাল ইনফেকশন থেকে নানা ধরনের রোগের সম্মুখীন হয়। কাপড় ছেড়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার শুরু করার পর মনে হয়েছিলো ‘জীবন সহজ হলো’, হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। সেই ন্যাপকিন কিনতে ফার্মেসি গেলে কাগজে মুড়ে প্যাকেটটি খুব গোপনে হাতে মুড়ে দিতেন দোকানী, যেনো এ নিষিদ্ধ জিনিষ কাউকে দেখাবার নয়। যেদিন থেকে বায়োলজির ব্যাখ্যা জেনেছি সেদিন থেকে স্রেফ নিজের সাথে যুদ্ধ করতাম। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হতো-‘এ লজ্জা না! এ অশুচি হতে পারে না। যদি এ অশুচি হয়, অস্বাস্থ্যকর হয় তাহলে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ অশুচির জন্ম!’

স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিভিন্ন ব্র্যান্ড ঘুরে মেন্সট্রুয়াল কাপের সাথে পরিচয় হলো গত মাসে। ইচ্ছে ছিলো ট্যাম্পুন ইউজের, কেনা হয়ে ওঠেনি। অর্গানিক কাপ নিয়ে নিজেরও ভয় আর ভুল ধারণা কিছুটা ছিলো। গত মাসে একজন বন্ধুর পোস্ট দেখে, তার অভিজ্ঞতা জেনে অনলাইনে অর্ডার করবার পর হাতে আসবার আগেই পিরিয়ড শুরু হয়, ফলে কাপটি অপেক্ষা করতে থাকে পরের মাসের জন্য। এ মাসে ব্যবহারের প্রথমদিন একটু অস্বস্তি লাগছিলো, ঘন্টাখানেকের মধ্যে সকল অস্বস্তি কেটে গেলো। অথচ যে আমি এ সময়টায় বসতাম আঁটোসাটো হয়ে, ঘুমাতাম এক পাশ হয়ে এবং নড়াচড়া কম করতাম সেই আমার এ মাসে বর্ণনাতীত সুখকর অভিজ্ঞতা হয়েছে। কোন ভেজা স্যাঁতসেঁতে ভাব ছাড়া লিক হবার ভয়হীন গন্ধহীন একটা পিরিয়ড পার করছি। এ অভিজ্ঞতা না হলে কখনোই বিশ্বাস হতো না জীবন এ সময়টাও চিন্তামুক্ত, একটু আরামে ঘুমানো, ইচিংলেস হতে পারে।

মেন্সট্রুয়াল কাপ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ ধোঁয়া তুলেছে ‘এটা ইউজ করে নারীর ভার্জিনিটি নষ্ট হবে’, ‘নারীবাদীরা মেয়েদের নষ্ট করতে এটার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে’, ‘এটা হারিয়ে যাবে ভ্যাজাইনার ভেতরে’, ‘আটকে গেলে অপারেশন ছাড়া বের করা যাবে না’, ‘ইনফেকশন হয়ে যাবে’, ‘ভার্জিন মেয়েদের তো পর্দা থাকে, কাপ ঢুকবে কী করে!’ ‘সতীপর্দা ছিঁড়ে যাবে, বিয়ের সময় মেয়েটি ভার্জিন কিনা আর প্রমাণ করা যাবে না এবং এটা নারীবাদীদের চক্রান্ত’।

এসকল কথা এই বাংলার ফেসবুক পেইজে নিজের চোখে দেখা। পিরিয়ড নিয়ে যতটা কুসংস্কার এ শ্রেণির আছে, ঠিক ততটা দুশ্চিন্তা এরা নারীর ভার্জিনিটি রক্ষা নিয়ে করে৷ যাদের মনে হয় ভার্জিন(!) মেয়েদের ভ্যাজাইনা পর্দা দিয়ে বন্ধ থাকে তারা কী চিন্তা করে প্রতিমাসে পিরিয়ডের রক্ত কোনদিক দিয়ে বের হয়? ভ্যাজাইনার মুখ থেকে জরায়ুর দূরত্ব খুব বেশি না, কাপটি সেখানেই সেট হয় এবং নির্দ্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর খুলে জমে থাকা তরল ফেলে দিয়ে পরিষ্কার করে আবার সেট করে দেয়া যায়। ইউটিউব ঘাটলে প্রচুর টিউটোরিয়াল পাওয়া যাবে।

একশ্রেণি আছে যাদের কমন ডায়ালগ ‘আমাদের মা-খালারা এসব ইউজ করেনি, তারা কী মরে গেছিলো? তখনই তারা বেশি ভালো ছিলো।’

শোনেন, মা-খালারা ফাঙ্গাল ইনফেকশনে ভুগলেও স্বাভাবিক এবং একিসাথে লজ্জার বিষয় মনে করে কাউকে বলতেন না, তলপেটে ব্যথা হলে ‘এটাই স্বাভাবিক’ ধরে নিয়ে দিনের পর দিন সহ্য করতেন। তারা করতেন বলে এ যুগে এসে নারীদের করতে হবে এমন যারা মনে করে তারা প্লিজ দাদা-পরদাদার যুগে ফেরত যাক, তাদের দাদা-পরদাদারা যা করতো যা পরতো তারা তাই করুক। আমার কাছে, একবিংশ শতকের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য হচ্ছে এই মানুষগুলো। এদেরকে গবেষণাগারে পাঠিয়ে পরীক্ষা করা দরকার ঠিক কতটা পিতৃতন্ত্র, কী পরিমাণ কুসংস্কার, কতটুকু অশিক্ষা আর অজ্ঞানতা থাকলে এমনটা চিন্তা করা যায়!

পিরিয়ড নিয়ে আশপাশ থেকে রব উঠলে নিদেনপক্ষে পড়াশোনা করুন এবং প্রতিবাদ করুন। নারী কী ব্যবহার করবে, কতটুকু কষ্ট সহ্য করবে, কী কী রোগ বাঁধাবে, শরীরকে কিভাবে শান্তিতে রাখবে এগুলো মাপজোক করার দায়িত্ব পুরুষের না। শরীরটা আপনার, সিদ্ধান্তও আপনার।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.