যে গল্পের শেষ নেই

শাহেদ ইকবাল:

দুটো বাস পাশাপাশি দাঁড়ানো। দুটোই পিকনিকের বাস। সামনে-পেছনে রঙচঙে ব্যানার ঝুলছে। একটি বাস থেকে উচ্চ ভল্যুমে গান শোনা যাচ্ছে:
‘মায়ের একধার দুধের দাম
কাটিয়া গায়ের চাম………’

গানটি শেষ হতে না হতেই অন্য বাস থেকে গান বাজতে শুরু করলো: ‘আম্মাজান আম্মাজান….।
বাংলাদেশে শীতের মৌসুম মানে পিকনিকের মৌসুম। শহরের রাস্তাগুলো সরগরম হয়ে ওঠে মাইকের প্রচারণায়।
পিকনিকের মাইকে সারাদিন যত গান বাজানো হয়, তার মধ্যে অংকের হিসাবে মাকে নিয়ে কিছু গান থাকবেই। সমবেত জনতা সে গান শুনে ‘আহা-উহু’ করবে। কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাসও ফেলবে, ‘আহা, মা আমার।’

নির্মম সত্য হলো, পিকনিকে যখন এই মাতৃবন্দনা করা হয়, ঠিক তখনই নোয়াখালীর সুবর্ণচরে কিংবা বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও একাধিক জননী গণধর্ষণের শিকার হোন। একই সময়ে ঢাকার সদরঘাটে কিংবা দৈনিক বাংলার মোড়ে কিংবা বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও দুই পক্ষের ঝগড়ায় মাকে নিয়ে কুৎসিত গালাগালিও করা হয়।
দুজন বাঙালি ঝগড়া করবে, অথচ মাকে নিয়ে গালি দেবে না, এটা হলো সপ্তম আশ্চর্যের পরে অষ্টম আশ্চর্যের মত ঘটনা।

নারীকে নিয়ে বাঙালির এমন স্ববিরোধিতা আরও আছে। যেমন-
বিয়ে করার জন্য ঘরে ঘরে মেয়ের সন্ধান করবে, কিন্তু নিজের ঘরে কন্যা সন্তান চাইবে না।
সন্তান জন্মদানের সময় মেয়ে ডাক্তার খুঁজবে, কিন্তু নিজের মেয়েকে ডাক্তারী পড়াবে না।
মহানবীর (সাঃ) বংশ কন্যার দিকে হিসাব করবে, কিন্তু নিজেদের বংশ কন্যার দিকে হিসাব করবে না।
এরকম হওয়ার কারণ কী?
যে বাঙালির গান, কবিতা, নাটক ও চলচ্চিত্রের সিংহভাগ জুড়ে আছে মাতৃবন্দনা, সে বাঙালি কেমন করে মাকে গণধর্ষণ করতে যায়? সে বাঙালি কেমন করে মাকে নিয়ে কুৎসিত গালি দেয়?
তবে কি বাঙালির সামাজিক মূল্যবোধের মধ্যেই কোন গলদ আছে?

ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাঙালির সামাজিক মূল্যবোধ বলতেই আসলে কিছু নেই। যা আছে, তা হলো এক প্রকার সামাজিক বিকৃতি। এই বিকৃতি লালন করা হয় পরিবারে। বড়রা সিগারেট খায়, ছোটদের খেতে দেয় না। বড়রা গালাগালি করে, ছোটদের করতে দেয় না। বড়রা সিনেমা দেখে, ছোটদের দেখতে দেয় না। এই বিকৃতি দেখে দেখে শিশুরা বড় হয়। বড় হয়ে তারাও এই বিকৃতির চর্চা করে। তারাও ভাবে, এর পেছনে ধর্মের সমর্থন আছে। যদিও এর পেছনে ধর্মের কোন সমর্থন নেই। অথচ এই বিকৃতির জোরেই নারীর প্রতি সকল প্রকার নিগ্রহ, সকল প্রকার বৈষম্য, সকল প্রকার নির্যাতন ও সহিংসতাকে জায়েজ করা হয়।
যেমন-
ছেলের দাম বেশি, মেয়ের দাম কম-কে শেখায়? পরিবার শেখায়।
ছেলে জোরে কথা বলবে, মেয়ে আস্তে কথা বলবে-কে শেখায়? পরিবার শেখায়।
ছেলে বেশি খাবে, মেয়ে কম খাবে-কে শেখায়? পরিবার শেখায়।
ছেলে স্কুলে পড়বে, মেয়ে রান্না করবে-কে শেখায়? পরিবার শেখায়।
মেয়েকে উত্যক্ত (ইভটিজিং) করলে মেয়ের শ্লীলতাহানি হয়, ছেলের হয় না-কে শেখায়? পরিবার শেখায়।
ধর্ষণের শিকার হলে মেয়ে ‘নষ্ট’ হয়, ছেলে (ধর্ষক) ‘নষ্ট’ হয় না। কে শেখায়? পরিবার শেখায়।

লক্ষ্য করুন, বহির্বিশ্বে এই চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে যে ধর্ষণের শিকার হয় তার সম্মানহানি হয় না, ধর্ষকের হয়। ধর্ষক আত্মগোপন করে, পালিয়ে বেড়ায়। ধর্ষক রাষ্ট্রপ্রধান হলেও রেহাই পায় না। জাপানে ধর্ষক আত্মহত্যাও করে। অথচ বাংলাদেশে আত্মহত্যা করে ধর্ষণের শিকার নারী।

আগেই বলেছি, এই বিকৃত শিক্ষা দেয়া হয় ধর্মের নামে। কিন্তু ধর্মের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। পবিত্র কোরআনে সর্বপ্রথম পর্দা ফরয করা হয়েছে পুরুষের উপর (সুরা নুর, আয়াত-৩০), তারপরে পর্দা এসেছে নারীর উপর (সুরা নুর, আয়াত-৩১)। কিন্তু পরিবারে কেবল নারীকেই অন্তরীণ করা হয়; কেবল নারীকেই সংযত হতে বলা হয়। ছেলের প্রতি পরিবার থাকে নিশ্চুপ, ধর্মের শিক্ষকেরা থাকেন নিশ্চুপ, শিক্ষা ব্যবস্থাও থাকে নিশ্চুপ। পাঠ্যপুস্তকে শুধু নারীর সুরক্ষা, নারীর পোশাক ও সংযম নিয়ে আলোচনা থাকে (দ্রষ্টব্যঃ ৬ষ্ঠ ও নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক), পুরুষ শিক্ষার্থী নারীর প্রতি কেমন আচরণ করবে, তার কোন বিধিনিষেধ থাকে না।

ধর্মীয় মাহফিলে সকল নবীর জন্মের উদাহরণ দেয়া হলেও হযরত ইশা (আঃ)-এর জন্মের উদাহরণ দেয়া হয় না। কারণ তাঁর জন্ম হয়েছিল পুরুষের সংস্পর্শ ছাড়া, অলৌকিকভাবে।
এ ঘটনা স্বীকার করলে এটাও স্বীকার করে নিতে হয় যে,
নারীরা পুরুষের সাহায্য ছাড়াও সন্তান জন্মদানে সক্ষম, যা পুরুষেরা পারে না। এভাবেই সমাজের অধিপতিশ্রেণী সকল যুগে পুরুষ হওয়ার সুবাদে নিজেদের স্বার্থে আইন, বিধিবিধান ও ধর্মশাস্ত্রের মধ্যে বিকৃতি ঘটায়।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ধর্ম আর ধর্মতন্ত্র এক জিনিস নয়। ধর্মতন্ত্রের কাছে ধর্ম যখন খাটো হয়, তখন নদীর বালি নদীর জলের উপর মোড়লী করিতে থাকে। তখন স্রোত চলে না, মরুভূমি ধু ধু করে। তার উপরে, সেই অচলতাটাকে লইয়াই মানুষ যখন বুক ফোলায়, তখন মুক্তির মন্ত্র পড়ে ধর্ম, আর দাসত্বের মন্ত্র পড়ে ধর্মতন্ত্র।’ (কর্তার ইচ্ছায় কর্ম)।

ধর্ম আর ধর্মতন্ত্র যেমন এক নয়, তেমনি পুরুষ আর পুরুষতন্ত্রও এক নয়। মানুষ যেমন ভালো আর মন্দ, পুরুষও তেমনি সুপুরুষ আর কাপুরুষ। যিনি সংসারে আদর্শ পিতা, আদর্শ স্বামী ও আদর্শ পুত্র, যিনি সত্যের নিশান হাতে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত সংগ্রামরত, তিনি হলেন সুপুরুষ। পক্ষান্তরে যারা মন্দশক্তির প্রভাবে দুর্বলের উপর নির্যাতনকারী, তারাই কাপুরুষ। সুপুরুষের বিচরণ থাকে আলোয়, কাপুরুষের বিচরণ থাকে অন্ধকারে। যে মন্দশক্তি নারীনিগ্রহের কুঅভিপ্রায়ে বিকৃত সামাজিক মূল্যবোধের প্রচলন ঘটায়, সে মন্দশক্তিই হলো পুরুষতন্ত্র।

এই বিকৃত ‘সামাজিক মূল্যবোধ’ থেকেই অযুতনিযুত দানব তৈরি হয়েছে। সেই দানব ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের সর্বত্র। ঘরেবাইরে, শহরেবন্দরে, হাটেবাজারে, রাস্তাঘাটে, অলিতেগলিতে।
তারা আছে সামনে-পেছনে, ডানে-বামে, উপরে-নিচে। তারা আছে সর্বত্র।
দেখতে মানুষ, কিন্তু মানুষ নয়। দেখতে সুস্থ, কিন্তু সুস্থ নয়। দেখতে ভদ্র, কিন্তু ভদ্র নয়।
ওদের কাছে যুক্তি, বুদ্ধি, নীতি-নৈতিকতার কোন বালাই নেই। সততার কোন মূল্য নেই। মূল্য আছে শুধু শক্তির। সে শক্তি অস্ত্রের হোক, পেশীর হোক, মামার হোক, খালুর হোক কিংবা হোক অন্য কোন গডফাদারের।
ওদের কাছে পঞ্চাশ বছরের বৃদ্ধাও নিরাপদ নয়। আড়াই মাসের শিশুও নিরাপদ নয়।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট ছোঁয়া পরিবহনের বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় সিরাজগঞ্জের রূপাকে। লাশ ফেলে দেয়া হয় মধুপুরের জঙ্গলে। বাস চালক ও হেলপার মিলে এ ঘটনা ঘটায়। হত্যাকারীদের মধ্যে আকরাম ও সফর আলী ছিল সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে। তা সত্ত্বেও কেউ কাউকে বাধা দেয়নি।

২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি ঢাকার গেন্ডারিয়ায় শিশু আয়শাকে (২) ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ৭ জানুয়ারি ঢাকার ডেমরায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় শিশু নুশরাত জাহান ও ফারিয়া আক্তারকে। হত্যাকারী গোলাম মোস্তফা ও আজিজুল বাওয়ানী সম্পর্কে খালাতো ভাই। তা সত্ত্বেও কেউ কাউকে বাধা দেয়নি।

২০১৮ সালের ২১ এপ্রিল সাতক্ষীরার কলারোয়ায় তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া এক কন্যাশিশুকে (৯) ধর্ষণ করা হয়। শিশুটিকে গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ধর্ষক সোহাগ সরদারকে (২৬) তার বাবা টাকা দিয়ে বাড়ি থেকে পালাতে সাহায্য করেন।

নুশরাত ও ফারিয়ার হত্যাকারী দুই সহোদর, হবিগঞ্জের বিউটির বাবা, রূপাকে ধর্ষণ ও হত্যাকারী মামা-ভাগ্নে এবং ধর্ষক সোহাগের বাবা। এরা কি একই সূত্রে গাঁথা নয়? এরা কি নষ্ট পরিবারের উদাহরণ নয়? বিকৃত পারিবারিক মূল্যবোধের আর কোন উদাহরণ কি দরকার আছে?
এদেরকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সংখ্যায় কমবে। কিন্তু সেই সংখ্যা আবার বাড়বে। কারণ কারখানা চালু আছে। কারখানা চালু থাকলে দানব উৎপাদন বন্ধ হবে না। দানব উৎপাদন বন্ধ না হলে নারী ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন কিছুই বন্ধ হবে না।
তাহলে উপায়?

লেখক: শাহেদ ইকবাল

লক্ষ্য করে দেখুন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে এ পর্যন্ত যতগুলো সুপারিশ এসেছে, সবগুলোর মধ্যে একটা আশ্চর্য মিল আছে! কী সেই মিল?
সবগুলো সুপারিশ হলো, ঘটনার পরে কী করতে হবে, সেই সুপারিশ। ঘটনার আগে কী করতে হবে তার কোন সুপারিশ নেই!
ঘটনার পরের সুপারিশ দিয়ে হয়তো অপরাধী শাস্তি পাবে, হয়তো পাবে না। কিন্তু সময়ের পেছনে গিয়ে ওই ধর্ষণটা আর ঠেকানো যাবে না। ওই হত্যাকাণ্ডটা আর ঠেকানো যাবে না।
তাহলে সমাধান কী? সহিংসতা ঠেকানোর উপায় কী? ধর্ষণ ঠেকানোর উপায় কী?

উপায় একটাই। কারখানা বন্ধ করতে হবে।
কারখানা মানে পরিবার। যে কারখানা থেকে ধর্ষক তৈরি হয়, ঘাতক তৈরি হয়, দানব তৈরি হয়।
এই কারখানা বন্ধ করতে হবে।

যে পরিবার দানব তৈরি করে, সে পরিবারকে নজরদারিতে আনতে হবে। পরিবারের মূল্যবোধ বদলাতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করতে হবে। নারীকে মানুষের মর্যাদায় ভাবতে শেখাতে হবে।
নারী শৃঙ্খল ভাঙুক। নারী মুক্ত হোক। নারী আলোর অভিযাত্রী হোক।

[গত ৫ ডিসেম্বর ২০১৮সিরডাপ মিলনায়তনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের অধীন আস্থা (স্ট্রেংদেনিং এক্সেস ট মালটি-সেক্টোরাল পাবলিক সার্ভিসেস ফর জিবিভি সার্ভাইভার্স ইন বাংলাদেশ) প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তব্যের অংশবিশেষ।]

শেয়ার করুন:
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.