শাহবাগ এবং আমাদের আবেগ

tania morrshedতানিয়া মোর্শেদ: আমার বাবা-মা-ভাই-বোন-রক্ত সম্পর্কের কাউকে হত্যা করলে আমি খুনিদের ফাঁসি চাই, চাই-ই চাই!! অথচ ত্রিশ লক্ষ মা-বাবা-ভাই-বোনদের হত্যা করলে, ২-৪ লক্ষ মা-বোনদের ধর্ষণ করলে রাজাকার খুনীদের/ধর্ষকদের যাবজ্জীবনেই সন্তষ্ট থাকি! আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক হয়েও রাজাকারদের সাথে আত্মীয়তা/বন্ধুত্ব/ রাজনীতির জন্য (ভোটের জন্য/ক্ষমতার জন্য) হাত মেলাই/ভবিষ্যৎ ক্ষমতার লোভে রাজাকার খুনি/ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড না হয়ে “যাবজ্জীবন কারাদণ্ড” (আমার বিপক্ষের মানুষেরা ক্ষমতায় এলে সাজা মাফ করে বিদেশে পাঠিয়ে দেবে তাদের) দেবার ব্যবস্থা করি!

 এই কথাগুলো একজনের বিবেকের হওয়ার কথা (অবশ্যই সে ব্যক্তি আমি নই, আমি তো অতি সাধারণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন, যে কোনো রাজাকারকে/পাকিস্তানিকে ধারে-কাছেও আসতে দেয় না)। কথাগুলো যাঁর বিবেকের হওয়ার কথা তাঁর বিবেক অনেক আগেই মরে গেছে, শুধু আমাদের মত অতি সাধারণ মানুষদের বিবেক মরা তো দূরে থাক, এক সেকেন্ডের জন্যও ঘুমায়ও না। কেউ কি শুনতে পাচ্ছেন, ত্রিশ লক্ষ মানুষের আর্তনাদ, ২-৪ লক্ষ ধর্ষিতা নারীর চিৎকার? আর আমার মত অতি সাধারণ মানুষদের হাহাকার?

 আবেগ আর যুক্তি কি সহাবস্থান করতে পারে না? পারে। সহাবস্থান করলেই কিছু করা সম্ভব। শুধু আবেগ গঠনমূলক কিছু দেয় না। আবার শুধুই যুক্তি, আবেগের অনুপস্থিতিও বিশেষ কিছু দেয় না। কোনো কিছু নিরপেক্ষভাবে দেখবার জন্য আবেগের পরিমিতি বোধ ভীষণ জরুরি।

 আজকের তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে যে আন্দোলন করছেন সেখানে আবেগ ও যুক্তি সহাবস্থান করছে। যুক্তি আছে বলেই তারা নিরপেক্ষ, আবেগ আছে বলেই তারা আন্দোলন করছেন। জাতিগতভাবে আমরা আবেগ প্রবণ, তাই অনেক গর্বের অর্জন আমাদের, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ। আবার অতি আবেগ/যুক্তির ঘাটতি থাকবার জন্য ৪২ বৎসর লাগছে যুদ্ধাপরাধীদের সাজা দিতে। যে ২০/৪০ হাজার রাজাকার ছিল ১৯৭১-এ, আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী, সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার তাদের জঘণ্য কর্মকাণ্ড ভুলে গিয়ে ঠাঁই না দিলে কি আজকে রাজাকার/জামাত/শিবিরের তাণ্ডব দেখতে হতো??

 যুক্তিবাদী মন জানে, যে খুনি/ধর্ষক সে যেই হোক না কেন তাকে সাজা পেতেই হবে। আরো কঠিনভাবে বলি, যুক্তিবাদী মন কখনো পার্থক্য করে না খুনী/ধর্ষক তার কেউ হয় কিনা, এমনকি সে নিজেকেও নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারে।

 আমাদের পূর্বসুরিরা আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, বাংলাদেশ এনে দিলেও তারা ব্যর্থ হয়েছেন রাজাকারদের সাজা দিতে। আমরাও প্রায় সবাই তাদের অনুসারী হয়েছি। তাই বন্ধুত্ব/আত্মীয়তা সবই করেছি রাজাকারদের সাথে। (ব্যক্তিগতভাবে আমি রাজাকার/পাকিস্তানী পরিহার করলে কী এমন আসে যায়! যদি আমার প্রজন্ম সমষ্টিগতভাবে তা করতেন!)। প্রজন্ম চত্বরের তরুণরা আমাদের যে শিক্ষা দিচ্ছেন তা আমাদের সমষ্টিগতভাবে শেখা ভীষণ জরুরি।

 কেউ কেউ প্রজন্ম চত্বর থেকে (আমার প্রজন্মের) মন্তব্য করছেন, নিজেকে তরুণ মনে হচ্ছে। তাদের প্রতি অনুরোধ, সারা জীবন তরুণ থাকবেন (মনে, প্রাণে)। বয়স বাড়ে শরীরে, মনে নয় কিন্তু। আর সবার প্রতি অনুরোধ (সব প্রজন্মকে) আবেগ ও যুক্তিকে সব সময়ের জন্য সাথী করবেন, তাহলেই কিছু করার চেষ্টা অন্তত করা যায়।

 (লেখাটা শাহবাগ আন্দোলনের সময়কার: লেখক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.