রাষ্ট্রপতির রসালাপে যখন সেক্সিস্ট জোকস আর রেসিস্ট কথাবার্তা!

ফাহমি ইলা:

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ সমাবর্তনে ভাষণরত রাষ্ট্রপ্রধানের ভিডিও ক্লিপটি দেখলাম। ইদানিং যদিও জেন্ডার সেনসিটিভ শব্দ চয়নের জন্য রাষ্ট্রপ্রধান বলা হচ্ছে, তবে তিনি রাষ্ট্রপতি, মানে রাষ্ট্রের পতি। পাবলিক ফোরামে ইনসেনসিটিভ জোক্স আর কথা বলে লোক হাসাতে চাওয়া, বডি শেমিং করা কি রাষ্ট্রপ্রধানের কাজ হতে পারে? উত্তরটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অজানা।

তাঁর কাছে ভালো মেয়ের সংজ্ঞা হচ্ছে ‘সংসার পরিচালনায় দক্ষ’ এবং ‘দেখতে শুনতেও মন্দ না’, তিনি আবার একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান! তিনি তার স্ত্রীকে ‘জিনিষ’ বলে আখ্যায়িত করছেন একটি পাবলিক ফোরামে এবং সেই ‘জিনিষ’ দেখতে শুনতেও নাকি অত ভালো না। তাঁর ভাষ্যমতে তার স্ত্রীর ‘গায়ের রঙ চং বেশি সুবিধার না’, তিনি একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি নাকি এভাবেই কথা বলে লোক হাসান। তা বাঙালী হাসাতে রগরগে সেক্সিষ্ট জোকস আর রেসিস্ট কথাবার্তা প্রয়োজন হয়!

ফাহমি ইলা

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান এমনই একজন হাস্যরসে পূর্ণ ব্যক্তি যে তিনি যখন বলছেন যে বারাক ওবামার কাছে যাবার জন্য (মূলত হাত মেলাবার জন্য) তার স্ত্রী ‘ইন্টারেস্টেড’ ছিলো, তখন অডিয়েন্স থেকে হুল্লোড় ওঠে। কারণ অডিয়েন্স বোঝে যে তিনি এই ‘ইন্টারেস্ট’ শব্দটি দিয়ে কী বোঝাতে চাইছেন। তার ‘বেটে স্ত্রী’র বারাক ওবামার পেটের কাছে পড়ে থাকা শুনেও এ অডিয়েন্স হাসিতে ফেটে পড়ে। ‘বডি শেমিং’ শব্দটির সাথে যদি রাষ্ট্রপ্রধানের না হোক, নিদেনপক্ষে আপনাদের কারোও পরিচয় থাকে তাহলে বুঝবেন মানুষের শরীর নিয়ে এ ধরনের হাস্যরসে পূর্ণ কটাক্ষ, কথা আসলে ‘বডি শেমিং’। অন্যদিকে নয়টি নাতি-নাতনি আর চারটি সন্তান নিয়ে তার স্ত্রীর এখন আর অন্যকোন চিন্তা করার আর কোন সুযোগই নাই দেখে তিনি যে চিন্তামুক্ত সেটিও তিনি মুখ টিপে হাসিতে বুঝিয়ে দেন। আহা জোকস! আবার হেসে ওঠো নবীন সমাজ!

গোল্ডমেডেল পাওয়া মেয়েরা যে সুন্দর তা রাষ্ট্রপ্রধান ভালোভাবেই পরখ করেছেন এবং তা জানাতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য বোধ করেননি। অবশ্য তিনি প্রথমেই ভালো মেয়ের সংজ্ঞা দিয়েছেন, গোল্ডমেডেল পেলেও মেয়েদের সুন্দর তো হতেই হবে। এদিকে তিনি গোল্ড মেডেলপ্রাপ্ত মেয়েদের অনুরোধ করেছেন মেডেল দিয়ে যেনো অলংকার না বানায়, তিনি নাকি এরকম অভিযোগ প্রায়ই পান! এরকম কোন খবর, ঘটনা কারো জানা আছে কিনা জানি না। যদিও তাঁর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে বহু খবর থাকতেই পারে!

সবশেষে তিনি ইউরোপ, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, কলকাতার উদাহরণ টেনে বললেন, সেসব দেশে নাকি যেখানে সেখানে থুতু ফেলা যায় না। বাংলাদেশে যেখানে সেখানে বোতল, বাদামের খোসা ফেলে পুরো ‘গার্মেন্টস’, ‘ডাস্টবিন’ বানিয়ে ফেলছি আমরা। গার্মেন্টস? রিয়েলি স্যার? নোংরা অপরিষ্কার অর্থে আপনি গার্মেন্টস বোঝেন?

তাঁর ভাষ্যমতে, এই বাঙালী বিদেশে গেলে নাকি ‘মানুষ’ হয়ে যায়, আর দেশে আসলে ‘কী হয়ে যাই’। এক্সাক্টলি সত্য কথা বলেছেন! কারণ আপনাকে বিদেশে কোথাও বক্তব্য দিতে দিলে আপনি এইসব সেক্সিস্ট, রেসিস্ট, ফালতু জোকস বলে কোনদিন লোক হাসানোর চেষ্টা করতেন না, মানুষের মতো আচরণ করতেন। আর এইদেশে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চে যখন বক্তব্য দেন তখন আপনি আসলেই ‘কী যেনো হয়ে যান’! আপনি নবীন শিক্ষার্থীদের এই দেশকে পরিষ্কার রাখতে এগিয়ে আসতে বলেছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের মাথায় যদি হাগু থাকে, তাহলে মাথার হাগু আগে পরিষ্কার করা উচিত ,নাকি রাস্তারটা?

এই দেশটাকে আবর্জনামুক্ত করতে হলে সবার আগে ভাবা উচিত মগজে দুর্গন্ধময় আবর্জনা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো শিক্ষিত মানুষেরা কীভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন আসনে বসে থাকে সেটা নিয়ে। মগজের আবর্জনা পরিষ্কার করলে যে রাস্তার আবর্জনাও পরিষ্কার হবে সেটা ওনাকে কেউ বোঝান। ওনাকে বোঝান গোল্ডমেডেল পাওয়া শিক্ষার্থী মগজ খাটিয়ে গোল্ডমেডেল পায় এবং সেখানে সে সুন্দর না অসুন্দর সেটা নিয়ে নোংরা তামশা করা সাময়িক হাসির বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও এটাই সমাজের রোগ এবং তিনি এই রোগে আক্রান্ত। ওনারে কেউ বোঝান নিজের স্ত্রী কেনো, কোন মানুষকেই জোকসের মাধ্যমে অপমান/হেয় করার কোন অধিকার তাঁর নাই। তাকে বোঝান যে তার মতো গুরুত্বপূর্ণ মানুষের কাছ থেকে এরকম গুরুত্বহীন নোংরা সেক্সিষ্ট জোকস শোনার চেয়ে আরো বহু বহু গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনবার কথা! ওনাকে প্লিজ কেউ বোঝান মানুষকে হাসাতে অন্যকে ছোট করতে গিয়ে তিনি নিজেই ছোট হয়ে গেছেন।

শেয়ার করুন:
  • 742
  •  
  •  
  •  
  •  
    742
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.