এসিডের মতোন ধর্ষণকে কেন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না?

সুপ্রীতি ধর:

চারদিকে কেবলই ধর্ষণ, ধর্ষণ আর ধর্ষণের খবর। পত্রিকার খবরেই জানলাম,নতুন বছরের শুরুর দিন থেকে শুক্রবার রাত পর্যন্ত এক রাজধানীতেই ছয়জন ধর্ষণের শিকার হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি হয়েছেন।

সারাদেশে এই সংখ্যা অগণিত। কিছু খবর পত্রিকায় আসে, বেশিরভাগই আসে না। গতবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আগের বছরগুলোর তুলনায় ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে মাত্রাতিরিক্তভাবে। ধর্ষণের শিকারদের  মাঝে শিশু, প্রতিবন্ধী থেকে শুরু করে সব বয়সের নারীই আছে। তাছাড়া শুধু ধর্ষণই নয়, ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে নির্যাতন, নির্যাতনের পর হত্যা সবই চলছে। আজই অন্য একটি খবরে পড়ছিলাম যে, একটি মেয়েকে গণধর্ষণের পর তার গলার নালি কেটে ফেলা হয়, এরপর তার একটি হাত। যখন সে নেতিয়ে পড়ে তখন তাকে কেরোসিনের ড্রামে চুবিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। গ্রামবাসীরা হয়তো খবরটি পেতোই না যদি না কয়েকটি কুকুর একটি মাংসপিণ্ড নিয়ে হুলস্থুল না ঘটাতো। তখনই সন্ধান হয় লাশের। খবর ছড়িয়ে পড়লে পাওয়া যায় মেয়েটির পরিচয়। এ পর্যন্তই। এ ঘটনায় এখনও কাউকে কেউ সনাক্ত করতে পারেনি।

ভাবছি ভয়াবহ মনোবিকারগ্রস্ততার বিষয়টি। ধর্ষণ বিষয়টি মোটেও শারীরবৃত্তীয় নয়, এটি মানসিক। এর আগেও অনেক লেখাতে এ নিয়ে বিস্তারিত আছে। তাই এর পুনরাবৃত্তি করছি না এখানে। কিন্তু একটা বিষয় ভেবে আতংকিত হচ্ছি মানুষের আচরণ দেখে। যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে আর যারা সমাজে এটা হতে দিচ্ছে, প্রতিবাদেও শামিল হচ্ছে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তো নয়ই। বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যারা আছে তারাও একে ক্রমেই হাস্যরসে রূপান্তরিত করে ফেলেছে। ‘মজনু’র ঘটনাটাই এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

আজই একজন সুইডিশ সাংবাদিকের সাথে কথা প্রসঙ্গে বলছিলাম, একটা সময় ছিল যখন প্রতিদিন দেশে এসিড আক্রান্তের ঘটনা ঘটতো। ভয়াবহ সেইসব ঘটনা। আমরা সাংবাদিকরা প্রতিদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যেতাম, প্রতিদিন নিত্যনতুন খবর নিয়ে আসতাম, আক্রান্তের ছবিসহ সেইসব খবর দেওয়া হতো। কেন দেওয়া হতো ছবি? কারণ ছিল জনসচেতনতা তৈরি। ছবি দেখলে মানুষ এর ভয়াবহতা বুঝতে পারবে। হয়েও ছিল তাই। তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। তো, গণমাধ্যম এবং সরকার একইসাথে এসিডরোধে কাজ করেছিল তখন। দৈনিক প্রথম আলোয় পুরো একটা ইউনিট কাজ করতো এসিড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। সেইসময় ৮ মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পুরুষদের র‌্যালিও হয়েছিল এসিড নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে। আর এসব উদ্যোগের ফল পেয়েছিলাম এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন পাশ করার মধ্য দিয়ে। এতে যেমন ছিল অপরাধীদের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য মামলা, তেমনি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, পাশাপাশি সারাদেশে এসিড ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, কড়াকড়ি।

এখন দেখুন কয়টা ঘটনা ঘটে এসিডের? সুতরাং আমরা চাইলে যে পারবো না ধর্ষণ রোধ করতে, তা আমি বিশ্বাস করি না। চাওয়াটা চাইতে হবে। গণমাধ্যমগুলোও এসিডকে যেমন গুরুত্বের সাথে নিয়েছিল ঠিক তেমনিভাবে কেন নিতে পারছে না ধর্ষণকে? ধর্ষণ একান্তই নারীর ভেবে? একে ‘সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্যা’ ভাবতে সমস্যা কোথায়? এই প্রশ্নটা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে আজ কদিন। কেন সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ছে না এই সমস্যার মূলোৎপাটনে?

সেজান মাহমুদ লিখেছেন, “ধর্ষণের জন্য দায়ি কোন নারীর পোশাক না, একা চলাফেরা না. ঘোমটা-না-দেয়া না, পর্দা-না-করা না, ছেলেদের সঙ্গে চলাফেরা না, এমনকি নরনারীর প্রেম করাও না…ধর্ষণের জন্যে দায়ি সামাজিকভাবে মেয়েদের অসম্মান, অমূল্যায়ন, ভোগ্য মনে করা, ক্ষমতাহীন হিসাবে দেখা, উৎকট পুরুষতন্ত্রের আধিপত্য, মেয়েদেরকে শুধুমাত্র সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্র মনে করা, সমাজে নরনারীর মধ্যে অসমতা, পুরুষের মানসিক ব্যাধী, আর দু:সহ বিচারহীনতা! যেখানে সামাজিক দিকগুলো ঠিক করা সহজ হচ্ছে না, সেখানে অন্তত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন।”

লেখক শেষ লাইনটাতে এসে কাউকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন যেন অপরাধীকে দোষীসাব্যস্ত হওয়ার পর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়। ঠিক এই বাক্যটিই তো আমরা অনেক বছর ধরে দাবি করে যাচ্ছি। তাই না? কিন্তু যার কানে এই কথাগুলো যাবার কথা, সেই রাষ্ট্রের কানে যাচ্ছে? ওহ, রাষ্ট্র তো বোবা, বধির। তার কান বন্ধ, কোনো শব্দই সেখানে পৌঁছে না। কিন্তু রাষ্ট্রকে পরিচালনার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, মানে যারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাষ্ট্রকে চালাচ্ছে আমাদের মতামতের তোয়াক্কা না করেই, সেই সরকারের কানে আর কতদিন তুলা দেওয়া থাকবে?

এই সরকার মোটেও নারীবান্ধব সরকার না, মোটেও না। যে যতোই পরিসংখ্যান তুলে ধরুক না কেন, সামাজিক-রাজনৈতিক চরম অবক্ষয়ের এই সময়ে কেউ যদি এমন দাবি নিয়ে আসে যে সরকার তো নারী উন্নয়নে এই করেছে, সেই করেছে, আমি তার মুখে একদলা থুথু ছুঁড়ে দেবো কেবল। কী করেছে সরকার?

গত কয়েকদিনের খবরাখবর এবং ‘মজনু’ সংক্রান্ত নাটকীয়তা দেখে চিৎকার করে প্রধানমন্ত্রীরে বলতে ইচ্ছা করছে, আপনি পান না এসব খবর?? কিচ্ছু করতে ইচ্ছা করে না?? মেয়েগুলো এমন অনিরাপদ হয়ে গেল, আপনার লাগে না মাতৃত্বে বা নেতৃত্বে? কেমন মা, কেমন নেতা আপনি?
চাটুকারদের বেষ্টনী থেকে একবার বেরিয়ে এসে চারপাশে তাকিয়ে দেখুন, মেয়েরা কাঁদছে, মেয়েরা অস্থির হয়ে ছটফট করছে। একবারটি নেমে আসুন, প্লিজ।
আর কীইবা বলতে পারি? কিছু বললেই কঠোর ভাষা হয়ে যাবে মাননীয়া! নিশ্চয়ই বাধ্য করবেন না তা বলতে!

আমার মেয়েরা যখন রাস্তাঘাটে লাঞ্ছিত হচ্ছে, যখন ঘরের ভিতরে অন্যায়-নির্যাতন আর অপমানের শিকার হচ্ছে, যখন আমার বোনের, আমার মেয়ের কোলের বাচ্চাকে ছিনিয়ে নিচ্ছে নির্যাতক পিতা শুধুমাত্র ধর্মীয় আইনের দোহাই দিয়ে, আর আমি সেই বোনের, সেই মেয়ের হাহাকার দেখছি, শুনছি, প্রয়োজনে কাঁধটা পেতে দিচ্ছি একটুখানি কান্নার জন্য, তখন আমার সেই সরকারের মসনদ কাঁপানো, উথাল-পাথাল করা একটা আন্দোলন ছাড়া আর কিছুই মনে আসে না।

আমি এটাও নিশ্চিত যে, আমার বা প্রতিবাদকারীদের এসব রাগ বা ক্ষোভ মাত্র কয়েকদিনের, ক্ষণস্থায়ী।  সবাই নেতিয়ে পড়ে একসময়, তাদের ভিতরে অনেকরকম দলাদলি হয়, অনেকরকম খেলা জমে উঠে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সেখানে তাদের নেতৃত্ব চায়, সরকার আবার ভয়ও পায়, তখন তারা বিভিন্ন নাটকের অবতারণা করে। এমনকি টাকার লেনদেনও হয় প্রয়োজনে। এসবই তো পুরনো অভিজ্ঞতা থেকেই শেখা। কীভাবে কোনো আন্দোলনকে ধামাচাপা দেয়া যায় অনেকবার তার চাক্ষুষ সাক্ষী হয়েছি তো এ জীবনে।

আবার যারা সত্যিকার অর্থেই, বিনা স্বার্থেই কোনো আন্দোলন করতে চায়, তখন সেখানে জনমানুষের উপস্থিতি থাকে না। কেন থাকে না? সেটাও সেই দলাদলি থেকেই!

কিন্তু খুব খুব চাই আশা করতে। চাই একটা বড় ধরনের ঝড় উঠুক ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন নিয়ে, প্রয়োজনে সব উড়ে যাক, তারপরও যা ধূলায় পড়ে থাকবে তা নিয়েই রচিত হবে নতুন ইতিহাস, স্বাধীনতাকামী নারীর ইতিহাস।

গণমাধ্যমগুলোর একযোগে কাজ করা উচিত ধর্ষণ বন্ধে। এছাড়া আর কোনো উপায় আমি দেখি না।

শেয়ার করুন:
  • 36
  •  
  •  
  •  
  •  
    36
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.