কী মরণফাঁদ আমাদের এই এডুকেশন সিস্টেম!

জিন্নাতুন নেছা:

প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় আশান্বিত ফলাফল না করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু শিশু আত্মহত্যা করেছে, মোটামুটি এই হলো আমাদের বছরশেষের খবর! এতোটুকুন একটা বাচ্চা, যার পুরো জীবন সামনে পড়ে আছে, কত ফেল, কত পাশ হবে জীবনে, কত উত্থান, কত পতন ঘটবে, তার কিছুই দেখা হলো না এই শিশুগুলোর! কেন? কারণ তাকে বলা হয়েছিল, বা বোঝানো হয়েছিল যে এই পরীক্ষাই তার জীবনের সব, তার জীবন নির্ণায়ক। আসলেই কি তাই? সত্যি সত্যি এসব গাঁজাখুরে পরীক্ষা সিস্টেম কোনো অর্থ বহন করে আমাদের জীবনে?

ছোটবেলায় আমাকে পড়ালেখার কথা কখনও বলতে হতো না। আমি একদম পড়ুয়া ছাত্র ছিলাম। তাই বন্ধুমহলে একটা কথা প্রচলিত আছে আমি খুব পড়ুয়া ছাত্র। মাথায় তেমন কিছু (বুদ্ধিসুদ্ধি)নাই। কেবল মুখস্থ করতাম আর পরীক্ষার খাতায় ঝারতাম। তাই আমার পিতামাতাকে ও আমাকে নিয়ে হ্যাপা পোহাতে হয়নি। পড়তাম বলে রেজাল্ট খুব খারাপ ছিলো না। কিন্তু আজ যে আমি বিলেত ফেরত জ্ঞানী তা কিন্তু নয়। কিংবা বড় হয়ে বাবা-মার ইচ্ছে অনুযায়ী ডাক্তার হতে পেরেছি তাও নয়। বরং সামান্য এনজিও কর্মী।তাহলে বলুন আমার রেজাল্ট কী কাজে এসেছে!

জিন্নাতুন নেছা

এই কথাগুলো বলার কারণ হলো আমার পিতামাতা মধ্যবিত্ত, খুব বেশি লেখাপড়া না জানা এবং ভালো ছাত্র বলতে পরীক্ষার রেজাল্টই বোঝেন। তাই এবার বাড়িতে যাবার সাথে সাথে অরিনের বার্ষিক পরীক্ষার রোল ১৫ হয়েছে বলে খুব মন খারাপ হয়েছে আমার আম্মার। অনেক কিছু বলেও ফেললেন, তোর বেটার পড়ালেখা হবে না। কিছুই মনে রাখতে পারে না ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি কিছু না বলে রেজাল্ট শিট নিয়ে দেখলাম সব সাবজেক্ট এই ৯৫ এর উপর নাম্বার আছে একটা সাবজেক্ট এ পেয়েছে ৮৭। আমি বললাম, যা করেছে খুব ভালো করেছে। ভবিষ্যতে আরো ভালো করবে।
তাছাড়া আমি মাকে বলেই দিয়েছিলাম, অরিনকে পড়ার জন্য চাপ দেবার দরকার নাই। ও ওর ইচ্ছেমতো পড়ালেখা করবে, আঁকতে ইচ্ছে করলে আঁকবে, গাইতে ইচ্ছে করলে গাইবে, যা ভালো লাগে করবে।

এতো কিছু বললাম নিজের ছেলের সম্পর্কে, কিন্তু আমি জানি সব বাবা-মা এমন হোন না। প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা এক থেকে দশ এর মধ্যে রোল না থাকলে ছোট ছোট বাচ্চাদের উপর কী নির্মম শারীরিক, মানসিক নির্যাতন চালায় বাবা- মা যেনো এই রেজাল্ট দিয়ে তার সন্তান বিলেতফেরত জ্ঞানী হয়ে যাবেন।

জীবনে বড় কিছু হবার জন্য পরীক্ষার রেজাল্ট এর চাইতে জানাশোনা খুব জরুরি।

আজ পিইসি এবং জেএসসি এর রেজাল্ট হয়েছে। অনেক নিউজও দেখলাম জেএসসি এর রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, তাই আত্মহত্যাও করেছে। একজন ছোট শিশু যে কিনা হেসে খেলে বড় হবে, তার কাছে পরীক্ষার রেজাল্ট এমন একটা বিশাল ব্যাপার হিসেবে হাইলাইট করা হয়েছে যে আমাদের এই পুঁজিবাদী পড়ালেখা সিস্টেমে যে তাকে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিতে বাধ্য করে। আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না! কী মরণফাঁদ আমাদের এই এডুকেশন সিস্টেম!

আর আমাদের পিতামাতারাও সেই পুঁজিবাদী পড়ালেখা সিস্টেমের ফাঁদে পড়ে সন্তানদের জীবন বলি দিয়ে দিচ্ছেন কত নির্দ্ধিধায়??

আবার অনেকেই পিইসি পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ, গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে লিখে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। আরে এই ছোট শিশু গোল্ডেন ফাইভের কী বোঝে! যারা এসব পায়নি তারা কি খারাপ ছাত্র? কখনোই না! আমি অন্তত তা মনে করি না! এই পিইসি আর জেএসসি এর রেজাল্ট দিয়ে কী হবে? যেখানে এসএসসি, এইচএসসি এর রেজাল্টই তেমন কোন কাজে আসে না চাকরির বাজারে! অনার্স, মাস্টার্স একটু কাজে আসে, তাও সবক্ষেত্রে নয়। কারণ বিষয়ভিত্তিক জব আমাদের দেশে খুব কম। আমাদের এডুকেশন সিস্টেমটাই এরকম।

কিন্তু আমাদের অভিভাবকরা বুঝতে পারছে না নাকি চেষ্টা করে না বোঝার জানি না! সন্তানদের উপর অযথায় পরীক্ষার ফল নামক এক ধরনের ভীতি চাপিয়ে দিচ্ছে। তাদেরকে তাদের মতো করে বেড়ে উঠতে দিচ্ছে না। তাদের মধ্যকার সৃজনশীলতাকে বেড়ে উঠতে দিচ্ছে না। গঁৎবাঁধা এক সিস্টেম নামক পড়ালেখায় বড় করছে। যাতে করে শিশুটি তার নিজস্বতাকে হারিয়ে ফেলছে।

প্লিজ এইসকল কোমলমতি শিশুদের আর এই চাপ দিবেন না। তাদেরকে তাদের মত করে বেড়ে উঠতে দিন। দেখবেন আপনার শিশুই সেরা। কারও সাথে তুলনায় নয় বরং জ্ঞানের সর্বোচ্চটুকু অর্জন করতে সাহায্য করুন। অবশ্যই পরীক্ষায় পাশ দেবার জন্য নয়!

শেয়ার করুন:
  • 328
  •  
  •  
  •  
  •  
    328
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.