মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক এবং তার প্রতিক্রিয়া

বেগম জাহান আরা:

খোলা জানালে দেখলে কেউ উঁকি দেয়, কেউ ঢিল মারে, কেউ নালিশ জানায়। অন্যের বাড়ির দিকে তাক করা জানালা খোলা হবে কেনো? কারও কৌতুহল হয়, কারও রাগ হয়। ঢিল মেরে অন্যবাড়ির মানুষকে ঘায়েল করার অবাধ্য ইচ্ছে হয়। নাহক অধিকার বোধের কথা তুলে গালাগালি করতেও বাধে মুক্ত আলোময় জীবননা কারও। কিন্তু কেউ বলেনা, ওর নিজের বাড়ির জানালা খোলার অধিকার আছে। টাটকা বাতাস পাওয়ার প্রয়োজন আছে তার। দিনে নীল আকাশ এবং রাতে তারার দীপালি দেখার সখ আছে তার।

আসলে বলতে চেয়েছি, খোলা জানালা একটা প্রতীক। সমস্ত ভালোর প্রতীক। খোলা জানালা মানে ভরপুর জীবন। মুক্ত আলোময় জীবন। যেখানে মানুষের জীবিন এবং মানবতাই মূল কথা। তাই দেখা যায়, বদ্ধ জীবনে মারাত্মক শ্বাস কষ্টের সময় মানবতার কল্যান কামনায় হঠাত কেউ একটা নতুন সংগঠন করার ডাক দিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সচেতন মানুষ। নতুন লোক ছাড়াও অন্যদল থেকেও মানুষ আসতে চায়। মনে আশা, নতুন কথা শোনা যাবে। নতুন দর্শনের সন্ধান পাওয়া যাবে। যেখানে ‘চেতনা’ আর ‘মুক্তিযুদ্ধ ‘ শব্দ বিক্রি করার কথা কেউ বলবেনা। যেখানে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে সত্যিকার মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বা যাকে তাকে রাজাকার বলে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করার খেলা হবে না। যেখানে মানবতার কথা বলবে ভালো মানুষেরা। তা সে যে কোনো সংগঠন হতে পারে। ভালো কথা বলার অধিকার সবার আছে।

বেগম জাহানারা

গৌরচন্দ্রিকা এই জন্য যে, কদিন আগেই দৈনিক পত্রিকায় এবং ফেসবুকে দেখেছি ‘মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক’ করার একটা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ভাবলাম, মহৎ উদ্যোগ। সুস্থ দশার একটা জানালা খুলে যাবে এবার। পরক্ষনেই চিন্তিত হয়েছি, আমাদের দেশে ভেজালে বিশেষজ্ঞ কিছু উচ্চমানের ব্যবসায়ী এখানে না ‘চুনের পানি’ বা পুকুরের দূষিত পানি ব্যবহার করে ‘ময়দা গোলা পানি’ মেশায়। কারন, মানুষের জীবনের দাম এখানে নেই বললেই চলে। তামাশা করার জন্য বন্ধুকে পেটাতে পেটাতে মেরে ফেলাটাও এখানে খেলা হয়ে উঠছে। ধর্ষণ তো নস্যি, ধর্ষণের পর হত্যা করাটাও একটা হিম্মতের ব্যাপার হয়ে উঠছে। শিশু পাচার, ডাস্টবিনে নবজাতক পাওয়া, হাসপাতালে পরিত্যক্ত শিশু পাওয়া, এখন আর বিশেষ খবর নয়। সেখানে ভাগ্যহত নবজাতকের জন্য ‘মাতৃদুগ্ধের ব্যাংক’ করা হবে, এই খবরটা আমাকে আনন্দে উদবেলিত করেছিলো।

কতো শিশু জন্মলগ্নেই মাকে হারায়। কতো রুগ্ন মা বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারে না। কতো অকালে জন্ম নেয়া শিশু অপুষ্ট থাকার জন্য মায়ের দুধ টানতেই পারে না। কখনও নানা অসুখের কারনে মায়ের বুকে শুধা নামে না।তখন সদ্যোজাত শিশুকে বাঁচিয়ে রাখাটাই হয়ে যায় প্রাণান্ত। তাছাড়া চাকরি করেন এমন মায়েদের শিশুর সংখ্যাও কম নয়। সেই বিপদকালে যদি মায়ের দুধ পাওয়া যায় তাকে খাওয়ানোর জন্যে, তাহলে সেটা সুখবর নিশ্চয়। শিশুর জন্য মায়ের দুধের চেয়ে উতকৃষ্ট খাদ্য আর কিছু নেই।

কদিনের মধ্যে কি হলো, ‘মাতৃদুগ্ধ ব্যাংকের’ প্রতিবাদে অনেকের কণ্ঠ শোনা গেলো। তাদের বক্তব্য হলো, এটা হারাম কাজ। কারন? দুধ ভাই-বোনে বিয়ে হবে না। হাসবো না কাঁদবো? প্রশ্ন হলো, জন্মের সাথে সাথেই তার বিয়ের হিসেব করতে হবে কেনো? আগে তো বাচ্চাটা বাঁচুক। বড়ো হোক। আর যাঁরা এই দায়িত্বপুর্ণ কাজ করতে চাইছেন, তাঁরা নিশ্চয় বিজ্ঞান্সম্মত ভাবে পুরো কাজটার আয়োজন করবেন। কার কার দুধ নেয়া হচ্ছে, তাদের ঠাঁই ঠিকানা থাকবে স্বচ্ছভাবে। তাছাড়া কেউ তো কাউকে ব্যাংকের দুধ খাবার জন্যে বাধ্য করবে না। যাদের প্রয়োজন, তারাই আসবেন ছুটে। নবজাতকের জন্য অন্য মায়ের দুধ ‘হারাম, হারাম’ বলে চিৎকার চেঁচামেচি করার দরকার কী?

আমাদের দেশে ‘দুধ মা’-এর ব্যাপারটা বরাবরই ছিলো। একান্নবর্তী পরিবারের অনেক শিশুকে চাচি, ফুপু, খালা, এমন কি বড়ো বোনের দুধও খাওয়ানো হয়েছে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে। এক হাসপাতালে দেখেছি, জন্মলগ্নে মা মারা যাওয়া শিশু পাশের বেডের মায়ের দুধ খেয়েছে। জানি না তাঁরা কোনো ঠিকানা রেখেছেন কিনা? সচেতন হলে রেখে থাকবেন। না রাখলে তার দায়।

আমাদের নবীজিরও ‘দুধ মা’ ছিলো। সম্ভ্রান্ত পরিবারে ‘দুধ মা’ থাকাটা আভিজাত্যের নমুনা ছিলো। সম্ভ্রান্ত কোরাইশ বংশের সন্তান হিসেবে মা আমিনার সন্তান, পৃথিবীর শেষ্ঠ মহামানব, দুনিয়ার শেষ এবং শ্রেষ্ঠ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্যও ছিলেন ‘দুধ মা’। মা ফাতিমা ছাড়াও মা হালিমর দুধ পান করেছেন তিনি। দুধ মাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন নবীজি। তাঁকে দেখলে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন। এইসব কথা আমরা জানি। তারপরেও ঢালাওভাবে কেমন করে বলা যায়, অন্য মায়ের দুধ, বাচ্চার জন্য হারাম? বরং এটা হাদিস। কারণ নবীজি যা করেছেন, তাই তো হাদিস!

মানুষের ক্ষেত্রে, প্রথম চাহিদা হলো বেঁচে থাকা। যার পরিবারে সদ্যোজাত বাচ্চার জন্য অন্য মায়ের দুধ প্রয়োজন হয়, তারা মুসলমান হলে নিশ্চয় সেই দুধ মায়ের ঠাঁই-ঠিকানা রাখবে। নিজ দায়িত্বেই রাখবে। অন্য ধর্মের কথা আমি জানি না। তবে লোকসাহিত্যে ‘ধাই মা’ শব্দ পাওয়া যায়। এই ‘ধাই মা-ই’ তো ‘দুধ মা’। তাদের দুধ সন্তানদের নিয়ে কতো মানবিক গল্প শুনেছি এবং পড়েছি। এটা হারাম কাজ হলে যুগ যুগ ধরে ‘দুধ মা’-এর মহানুভবতার কথা শুনতাম না আমরা।

ব্লাড ব্যাংকের কথাই ধরা যাক না। ধর্মাধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সাদা কালো, নারী পুরুষ, নির্বিশেষের রক্ত সংরক্ষণ করা হয়। প্রয়োজনে সেটা দিয়ে জীবন বাঁচানো হয় মানুষের। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আজকাল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়। কেউ তো আপত্তি ওঠায় না? কার অঙ্গ, কার দেহে যায়, কোন ধর্ম বা বর্ণের মানুষের অঙ্গ কোন ধর্ম বা বর্ণের মানুষের দেহে যুক্ত করা হয়, তা নিয়ে কিন্তু হারাম হালালের প্রশ্ন তোলে না কেউ। ওঠে না জাত বেজাতের কথাও। তখন জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড়ো চিন্তা।

শুধু এই নয়, বাঁদরের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের কথাও বিজ্ঞনীরা ফেলে দিতে পারছেন না। জীবন রক্ষার জন্য আধুনিক বিজ্ঞানের এমন অলৌকিকপ্রায় স্বাস্থ্য প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাচ্ছেন সব ধর্মমতের অভিজাত এবং অনভিজাত মানুষ। এই অপুর্ব সুন্দর পৃথিবীতে সবাই বেঁচে থাকতে চায়। শুধু একবারের জন্যে পাওয়া এই অমূল্য জীবনই মানুষের সবচেয়ে প্রিয়।

বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সৌজন্যে আজকাল ঋষিমাতার (সারোগেট ম্যাদার) মাধ্যমেও মানুষ সন্তানের আকাঙ্খা পূরণ করছে। টেস্টটিউব বেবি নিচ্ছে বন্ধ্যা দম্পতিরা। কোথাকার এবং কার প্রাণ পরমাণু কতোদিন সংরক্ষিত রাখার পর কোন মাতৃগর্ভে নোঙর ফেলছে, তার হিসেব নিয়ে হালাল হারামের প্রশ্ন তুলছে কি কেউ? অনেক সময় শেকড়ের সন্ধানও পাওয়া যায় না। তবু সন্তান পেয়েই খুশি শত শত মা বাবা। এই সব তথ্য তো সত্য। তাছাড়া সারাদিনে আমরা কতোই তো হারাম কাজ করি। অভুক্তকে রেখে পেট পুরে খাই। প্রতিবেশি দুঃস্থকে রেখে ব্যয়বহুল হজে যাই। ব্যবসায়ী হয়ে ভেজাল দিই, মাপে কম দিই (ব্যতিক্রম ছাড়া)। সুদ খাই, পরের টাকা মেরে দিই। দুর্নীতি করি। বিষ দিয়ে অন্যের পুকুর ভরা মাছ মেরে ফেলি। বাগানের কলাগাছের কলাগুলোকে অর্ধেক করে কেটে রাখি। কোনটা হালাল কাজ?

কাজেই প্রথম অনুরোধ হলো, ‘মাতৃদুগ্ধ ব্যাংকের’ ব্যাপারে ইতিবাচক এবং পরম কল্যাণকর চিন্তা করেন। একই সাথে প্রকল্প পরিচালনার ব্যাপারে সাত্বিকতার সাথে তথ্যাদি সংরক্ষণের ব্যাপারে পরামর্শ দেন। যে কোনো নতুন প্রকল্প, যার সাথে ধর্মের বিধি বিধান আদেশ নির্দেশের সম্পর্ক আছে, যার সাথে দেশাচারের ইতিহাস মিশে আছে, সেগুলো নিয়ে যুক্তিভিত্তিক আলোচনা করতে হবে।

একুশ শতকের উচ্চ বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির কালে মানুষের জীবনের মূল্যবোধ বদলে গেছে। যদিও মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মপর হয়েছে, অনেক বেশি সাংঘর্ষিক হয়েছে, তবু জীবনকেই ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি। কথা আছে, জীবন বাঁচানো ফরজ। তাই মনে করি, অগনিত শিশুর অসহায় জীবনের কথা চিন্তা করে ‘মাতৃদুগ্ধ প্রকল্পের’ যে আয়োজন করা হচ্ছে, তার মধ্যে আছে প্রভূত মানবিক কল্যাণচিন্তা। মানবতা দিয়েই তাকে বিচার করতে হবে।

(লেখাটা ‘সময়ের আলো’তে প্রকাশিত হয়েছে আগে)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.