আমার নতুন বছরের রেজল্যুশন

সুমু হক:

জ্ঞান হবার পর থেকে প্রায় ৩৭ বছর অবধি ক্রমাগত শুনে এসেছি আমি অনাকাঙ্খিত।
তাই নিজের অজান্তেই সেই ছেলেবেলা থেকেই সবসময় চেষ্টা করে এসেছি অন্য সবাইকে খুশি করতে।
আমার কোন বলার মতো গুণ ছিল না, দেখতেও আমি খুব সাধারণ ছিলাম।
বাসায় সারাক্ষণ হাতুড়ি দিয়ে মগজের ভেতর ঢোকানো হতো আমি কত সাধারণ।
স্কুলে যদিও বা কোন এক্সট্রা-কারিক্যুলার এক্টিভিটিজ করতাম, বাসায় ঢোকার সময় সেসব এচিভমেন্ট দরজার বাইরে রেখে ঢুকতাম।

প্রথম প্রথম কষ্ট হতো। তারপর কখন যেন একসময় অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো।
মনে আছে, ক্লাস টেনে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় মেডেল নিয়ে স্টেজ থেকে নামার পর মিস সালেহা আনোয়ার এতো বছর চেপে রাখা প্রশ্নটা না করে আর থাকতে পারেননি।
“তুমি যে এতোকিছু করো, বাসায় কি কেউ কিছুই জানে না?”
যে হাসিটা কেবল মিস সালেহার সামনেই হাসা সম্ভব হতো, সেরকম একটা হাসি দিয়ে সামনে থেকে সরে গিয়েছিলাম সেদিন।

আমার মা অবশ্য এরপর আমাকে মঞ্চে উপস্থাপনা করতে দেখেছিলেন।
সেটা এই টরোন্টোতেই, ২০১২/১৩ সালে, আমার বয়স তখন মাত্র ৩২ কী ৩৩।
মাইক্রোফোন হাতে আমাকে তাঁর সেই প্রথম দেখা।
আমার দাদা-বাড়িতে সবাই কোন না গুণের চর্চা করতেন।
সবচেয়ে কম গুণি আমার বাবাও খুব ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন।
এতো গুণীজনের মাঝখানে একমাত্র আমারই বলবার মতো কোন গুণ ছিল না।
ভাইয়া ওর বন্ধুদের নিয়ে কখনও সুন্দরবন, কখনও দার্জিলিং অভিযানে যেত বাসায় না জানিয়ে।
আমার ভাগ্যে অভিযান নয়, জুটতো ভাইয়ার ভাগ্যের মার আর বকাগুলো।
ও যে আমাকেও না বলেই চলে গেছে, কোনদিন কেউ বিশ্বাসই করতো না।
ও একেকটা জায়গা থেকে ফিরে এসে গল্প শোনাতো, আমি রান্নাঘরে কাঁচা আমের শরবৎ বানাতে বানাতে কিংবা নানুর পাশে বসে সেলাই করতে করতে কান খাঁড়া করে গল্পগুলো শুনতাম।
ছোট চাচুমণি আর ভাইয়ার লেখা আর আঁকার পাশে কোনদিন নিজের লেখা দাঁড়াবে বলে মনে হয়নি আমার।
আমি তেমনটা জেনেই বড় হয়েছি।

যখন ক্লাস নাইনে পড়ি, তখন জীবনে প্রথম কবিতাগুলো প্রকাশিত হবার পর বাসায় সম্পাদকের ফোন এলে তবেই সবাই জেনেছিলো আমি কবিতা লিখি।
জীবনে প্রথম মতামত কলামে লেখা পাঠিয়েছিলাম বাসার সবাইকে লুকিয়ে, ১৭ বছর বয়সে।
ভোরের কাগজ কী মনে করে সেটা ছেপেও দিয়েছিল।
একটা সময়ে খুব অভিমান করে সেইটুকু লেখাও ছেড়ে দিয়েছিলাম।
ভাইয়া তো বললো, “তুই তো ভালো করে লেখা শুরুই করলি না, তোর আবার লেখা ছাড়ার প্রশ্ন আসে কোত্থেকে!”
আমার মা-বাবা কোনদিন পহেলা বৈশাখ কিংবা পহেলা বসন্তে আলাদা করে উদযাপনের কথা ভাবেননি।
খাওয়া-দাওয়া আলো-হাওয়ার সাথে সাথে যে এসবও মানুষের প্রয়োজন ঘটতে পারে, সেকথা কোনদিন তাঁদের মনেই হয়নি।
আমি তাই কোনদিন বর্ষবরণ দেখতে যাইনি, না একেবারে যাইনি বলা ভুল হলো, এসএসসি পরীক্ষার পর বন্ধুদের সাথে লুকিয়ে একবার গিয়েছিলাম।
সেই প্রথম, সেই শেষ।
সেই ধরা পড়ার শাস্তি হয়েছিল এসএসসি পরীক্ষার ছুটিতে তিনমাস গৃহবন্দী হয়ে থাকা।

বই মেলায় জীবনে কবার গেছি, তা এক হাতের আঙুলে গুণে বলে দেয়া সম্ভব।
আমাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করেন, আমার লেখার আগ্রহ আর উৎসাহ কোত্থেকে এলো, কিংবা আমার বাসায় নিশ্চয়ই সবাই খুব সংস্কৃতিমনা, তখন আমি আরেকটা বিশেষ রকম হাসি দেই।
সেই হাসিটার পেছনে এতোকাল লুকিয়ে ছিল এই ওপরের কথাগুলো।

স্কুলের টিচারদের থেকে শুরু করে বন্ধুদের এবং আমার জীবনে থাকা যে কোন মানুষকেই খুশি করাটাই আমার নিজের অনাকাঙ্খিত অস্তিত্বকে জাস্টিফাই করবার একমাত্র উপায় বলে মনে হতো।
প্রেমের ক্ষেত্রেও নিজের জন্যে একটুও কিছু না রেখে আমার যা কিছু আছে সব দিয়ে দেয়াটাই নিয়ম বলে জেনেছি।
মনে হতো, কোনভাবে কেউ যদি আমাকে একটু ভালোবাসে!

নিজের মা বাবা এই তালিকায় ছিল না, কারণ সেই ছেলেবেলা থেকেই বুঝে নিয়েছিলাম কোন কিছু দিয়েই তাদেরকে খুশি করা সম্ভব নয়।
এখন এত বছর বাদে অনেক দেরি হয়ে যাবার পর আমার সাথে আমার মায়ের সম্পর্কটা খানিকটা স্বাভাবিক হয়েছে মাত্র।

একে তো মায়ের নিজের জীবনের অতৃপ্তির বোঝা ছিল, তার ওপর নিজের সম্পর্কে তার নিজের হীনমন্যতার বোঝাটুকুও আমার ওপর খুব ভালোমতই আমার ভেতর চাপিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
ছেলেবেলা থেকে আমাকে তাই শেখানো হয়েছিল, আমি সবার শেষে আসি।
খাবার টেবিলে বড় মাংসের টুকরো থেকে শুরু করে সব ভালো জিনিসগুলো অন্যদের দিয়ে তবেই আমি আমারটা নিতে পারি।
পরিবারের কোন বিয়ে কিংবা অন্য কোন উৎসবের সময় অন্য বোনদের সবচেয়ে ভালো শাড়িগুলো বেছে নিতে দিয়ে সবচেয়ে সাধারণটাই আমাকে নিতে হবে।

আমাকে শেখানো হয়েছিল, এমনকি কেউ আমাকে কোন কিছু উপহার দিতে চাইলেও আমার তা নেবার অধিকার নেই। তাই সেই কোন ছেলেবেলা থেকে সবকিছু অন্যদের দিতে দিতে, সবগুলো সম্পর্কে এমন কী নিজের ১৫০% দিয়ে নিজেকে নিঃস্ব করে রাখতেই শিখেছি।
আমি সারাক্ষণ এই জেনে বড় হয়েছি, যে আমার জীবনে ভালো কোন কিছু ঘটলে, সেটা হয় আকস্মিকভাবে অন্য কারো দয়ায় ঘটেছে কিংবা ভুলে ঘটেছে।
আমি কোন ভালো কিছুর যোগ্য বলে নয়।
বাবার অনাকাঙ্খিত এই কন্যার জীবনে কোন ভালো জিনিসে কোন অধিকার থাকতে নেই।

ছেলেবেলায় জেনে বড় হয়েছি, আমার বাবা-মার যাবতীয় বাস্তব কিংবা কল্পিত যন্ত্রণার কারণ আমি।
এমনকি আমার ১১ বছরের ছোট ভাইটির জন্ম হলে পরে ওর দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হলেও মা বলতেন, “শুধুমাত্র তোমার কথা ভেবেই তো ওকে আনলাম, আমার শারীরিক ঝুঁকির কথা না ভেবে ওকে আনলাম!
আর তুমি কিনা ওকেও সহ্য করতে পারো না! একটু দেখে রাখতে পারো না!”

আজন্ম কেবল বাবা-মার জীবনের সব সমস্যার ম্যাজিক্যাল সমাধান দেবার অক্ষমতার গ্লানি মাথায় নিয়ে বড় হয়েছি।
তবুও ভালো যে আমার ছোট্ট ভাইটা সেই ছোটবেলা থেকেই তার এই সবদিক দিয়ে অতি সাধারণ বোনটাকেই ভীষণ ভালোবেসে এসেছে।
গত দুটো বছর আমার জীবনে খুব ঘটনাবহুল।
কোনদিন যা পারবো ভাবিনি, তাই আমাকে পারতে হয়েছে।
যে মানুষগুলোকে ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব জেনেছি, সেই মানুষগুলোকে জীবনের হিসেবে থেকে বাদ দিয়ে চলতে শিখতে হয়েছে।
আর এতো সবকিছু দেখে আমার মাও আমাকে হয়তো একটু একটু করে বুঝতে শুরু করেছেন।
যা এতকাল আগে ঘটে গেছে, তা পাল্টানোও সম্ভব না হলেও, একেবারে কিছু না বোঝার চাইতে এরকম কিছু কিছু বোঝা হয়তো বা একটু ভালো।
অনেক দেরি করে এখন যখন জানলাম যে এবার আমাকে একেবারে একা সম্পূর্ণ নিজের জন্য, নিজের মত করে বাঁচতে হবে, তখন মনে হচ্ছে, শুধুমাত্র নিজের জন্যে বাঁচা কি করে সম্ভব?! আমি তো কোনদিন সেটা শিখিইনি!
খুব অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।

এখন এখানে হলিডে সিজন চলছে, সবাই প্রিয় মানুষগুলোর সাথে কোন না কোন পরিকল্পনা করছে। আর সেজন্যেই বোধহয় এতদিন পর হঠাৎ শুধু নিজের জন্যে নিজের সাথে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করতে গিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।

একগাদা রিসার্চ ম্যাটেরিয়াল জোগাড় করে রেখেছি সামনের কদিন শুধু পড়বো আর লিখবো বলেই। এক মুহূর্তও যাতে চুপ করে বসে থাকবার কিংবা কোন বিষণ্ণতার অবকাশ না থাকে। তবুও হঠাৎ হঠাৎ কেমন যেন অবসন্ন লাগছে।

চোরের ওপর রাগ করে মাটিতে ভাত খেতে খেতে খাবারের সাথে মাটির ফ্লেভারটাই অভ্যেস হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি, ডিনার সেটে ডিনার করার অভ্যেস আয়ত্ব করতে কিছুটা সময় লাগবে।
সমস্যা নেই! নতুন বছরের অনেকগুলো রেসল্যুশনের সাথে সাথে এটাকেও যোগ করে নিলাম!

শেয়ার করুন:
  • 188
  •  
  •  
  •  
  •  
    188
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.