নিজেদের ব্যর্থতার দায় সন্তানের ওপর চাপানো কেন?

সুমু হক:

আমাদের দক্ষিণ এশীয় বাবা-মায়েদের বোধ হয় মনে হয়, কথায় কথায় সন্তানদেরকে ইনসাল্ট করা, তাদের আত্মবিশ্বাসকে আহত করা, অন্যের কাছে তাদেরকে হেয় করাটাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ প্যারেন্টিং! যে সন্তান নিজের ইচ্ছায় এই পৃথিবীতে আসেনি, যাদের জন্ম তাদের বাবা-মায়ের জৈবিক কিংবা সামাজিক তাড়নার ফল, তাদেরকে কথায় কথায় আহত করা, নিজেদের ব্যর্থ জীবন, ব্যর্থ সম্পর্ক কিংবা অসফল ক্যারিয়ারের দায় তাদের সন্তানদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার বিন্দুমাত্র অধিকার কোনো বাবা-মায়ের নেই।

সুমু হক

যেসব বাবা-মা শৈশবে তাদের বাবা-মার হাতে নিগৃহীত হওয়াটাকে আদর্শ বলে মনে করেন, যারা মনে করেন বাবা-মার হাতে স্যান্ডেলের বাড়ি খাওয়াটা অত্যন্ত গর্বের বিষয়, এবং তারা তাদের সন্তানকে সেই তুলনায় কোন শাসন করছেন না (অর্থাৎ স্যান্ডেল দিয়ে মারছেন না) এটাই অনেক, তাদেরকে বলছি, আপনাদের মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
আপনাদের সন্তানেরা স্বেচ্ছায় এ পৃথিবীতে আসেনি। তাদের জন্মের দায়ভার এবং তাদেরকে বড় করে তোলার দায়িত্ব আপনাদের।
তাদের বড় করে তুলে আপনারা কোন দয়া দেখাচ্ছেন না। বরং নিজেদের জৈবিক এবং সামাজিক সিদ্ধান্তের দায় মেটাচ্ছেন।
আপনাদের সন্তান আপনাদের জন্ম দেয়া বলেই আপনাদের সম্পত্তি নয়, তারাও প্রত্যেকে এক একজন মানুষ।
একজন মানুষ হিসেবে আপনাদের সন্তানের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সম্মান করতে শিখুন।

কথায় কথায় সবার সামনে তাদেরকে হেয় করলে আপনার সন্তান আহত হোক বা না হোক, সেই আক্রমণ কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আপনার ব্যর্থতাকেই সবার সামনে তুলে ধরবে। আর যেইসব তৃতীয় শ্রেণীর তৃতীয় পক্ষের শকুনি মামা-মাসির দল, সন্তানের প্রতি আপনার অসম্মানজনক আচরণকে বাহবা দিচ্ছে, সন্তানের প্রতি আপনার ভায়োলেন্ট মনোভাবকে উস্কে দিচ্ছে, খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনার পেছনে তারা আপনাকে নিয়েও অনেকরকম কেচ্ছাকাহিনী কিংবা সমালোচনার বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। সেটা কিন্তু একটুও সম্মানের বিষয় নয়।

মনে রাখবেন সন্তানদের পৃথিবীতে এনেছেন বলেই তারা আপনাকে ভালোবাসতে কিংবা শ্রদ্ধা করতে বাধ্য নয়।
সন্তানদের ভালোবাসা আর সম্মান চান?
তাহলে নিজেদেরকে সেই ভালোবাসা আর সম্মানের যোগ্য করে তুলুন। দেখবেন যে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আপনাদেরকে ভালোবাসছেন, সম্মান করছেন।
পরিচিত মহলে কাঁদুনি গেয়ে আপনাদের নিজেদেরকে এবং সন্তানদেরকে অপমান করবেন না। সেই অধিকার আপনাদের নেই।

আর পরিশেষে সন্তানদের বলি, আমাদের মতো দক্ষিণ এশীয় পরিবারে জন্ম নেয়া অনেক সন্তানই এই ধরনের শারীরিক এবং মানসিক এবিউজের শিকার হয়ে থাকেন। এই এবিউজ পার হয়ে এসে নিজের পায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হলেও অসম্ভব নয়।

আপনার নিজেকে ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করবার ক্ষমতা আপনার নেই, সুতরাং এইসব মানসিক এবিউজকে অগ্রাহ্য করতে শিখুন। শারীরিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইনি সাহায্য নিন। এটাও কিন্তু এক রকমের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স।

মনে রাখবেন, কোন একজন ব্যক্তি ততক্ষণই আপনাকে মানসিকভাবে আঘাত করতে পারবে যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি তাকে সেই ক্ষমতাটুকু দেবেন, তার কথা কিংবা আচরণে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। সুতরাং এইসব মানসিক এবিউজকে উপেক্ষা করতে শিখুন, তা নাহলে কখনোই সামনের দিকে এগোতে পারবেন না।

আপনার বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত জীবনের অসুখ, ব্যর্থতা কিংবা তিক্ততার দায় কখনোই আপনার নয়। বাবা-মায়ের অনুমোদন কিংবা ভালোবাসার অভাবকে আপনার জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না করে বরং নিজেকে ভালোবাসতে শিখুন, নিজের ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখুন।
অন্য কেউ তখনই আপনাকে সম্মানের চোখে দেখবে যখন আপনি নিজে নিজেকে সম্মান করতে শিখবেন, ভালোবাসতে শিখবেন।

জীবন একটাই এবং খুব অল্পদিনের। অন্য কারো জীবনের অক্ষমতা ও তিক্ততার দায় বহন না করে বরং নিজে একবার পরিপূর্ণভাবে বেঁচে উঠতে শিখুন। দেখবেন, জীবন অনেক সুন্দর। অনেক সুন্দর এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.