গাজার প্রথম নারী মুখতারাহ

umm mohammad
উম মোহাম্মদ

উইমেন চ্যাপ্টার: ফিলিস্তিনের গাজায় প্রথমবারের মতোন একজন নারী আইনী লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন। স্থানীয় ভাষায় তাকে বলা হচ্ছে ‘মুখতারাহ’। উম মোহাম্মদ নামের এই নারী তার কমিউনিটির সমস্ত রক্ষণশীল ঐতিহ্য ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছেন এই পেশায়। আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিতর্কিত সমস্যাগুলোর মীমাংসা করছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে উম মোহাম্মদ বলছিলেন, ‘একবার এক দম্পতির ভিতরকার সমস্যা সমাধানে আমাকে মধ্যস্থতা করতে গিয়ে কিভাবে যেন জড়িয়ে গিয়েছিলাম। তখন ওই পুরুষ লোকটি আমাকে খুব অপমান করেছিল, গালিগালাজ করেছিল, কিন্তু আমি এতোটুকু উত্তেজিত না হয়ে খুব শান্তভাবে তার কথা শুনেছিলাম, এক পর্যায়ে সেই লোকটি শান্ত হয়ে আলোচনায় বসেছিল। কয়েকটি সেশানের পর আমি সেই লোকটি এবং তার স্ত্রীকে আবার একসাথে করতে পেরেছিলাম। এই ঘটনাটির মীমাংসায় এর আগে অনেক পুরুষ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন’।

গাজা উপত্যকায় বর্তমানে ১৮টি আইনী সহায়তা ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। ১৭ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি এর মধ্যে ছয়টি কেন্দ্র থেকে ২০১১ সালে আইনী সহায়তা পান। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপি সমর্থিত আইনী সহায়কদের মাধ্যমে শতকরা ৭৪ ভাগ নারী উপকৃত হয়েছেন।

৫০ বছর বয়সী উম মোহাম্মদ মুখতারাহ হওয়ার আগে ৫২ ঘন্টার একটা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন আইনী মধ্যস্থতা এবং এর মৌলিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে। এর ফলে তিনি আনুষ্ঠানিক বিচার কাজ করতে না পারলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাটা বেশ ভালোভাবেই করতে পারছেন। অধিকৃত ফিলিস্তিনে ইউএনডিপি’র অ্যাকসেস টু জাস্টিস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে আইন বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে, মধ্যস্থতার টেকনিকসমূহ এবং বিয়ে ও তালাকের বিষয়ে আইনগুলো সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে। উম মোহাম্মদ একাই শুধু এই প্রশিক্ষণটি পাননি, তার মতোন আরও ৭৫জন নারী মুখতারান এই প্রশিক্ষণ পেয়ে এখন কাজ করছেন। গাজায় কালচার এন্ড ফ্রি থট এসোসিয়েশনের লিগ্যাল ক্লিনিক থেকে এই প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। মুখতারাহরা এখন লিগ্যাল ক্লিনিক টিমের সাথে বিভিন্ন আইনী কাজে সহায়তা করছেন, পরিবারের পুনরেকত্রিকরণের বিষয়ে চুক্তির খসড়া তৈরিতে কাজ করছেন এবঙ আইনী উপদেশও দিচ্ছেন প্রয়োজনমতো। উম বলেন, ধর্ম সম্পর্কে তার বিশেষ জ্ঞান তাকে একাজে আরও সাফল্য এনে দিচ্ছে, কারণ তিনি প্রয়োজনমতো ধর্মীয় বিভিন্ন উক্তি, পংক্তি বা প্রবাদ দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে পারছেন। এতে করে মানুষের বুঝতে সুবিধা হচ্ছে। তিনি জানান, এই কাজের আগে তিনি বহু বছর ধর্ম নিয়ে কাজ করেছেন। তবে এই পেশায় তাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে এখানকার প্রশিক্ষণ। সেইসাথে স্বামীর সমর্থনের কথাও উল্লেখ করেন উম।

মুখতারাহদের অধিকাংশ এসেছেন গাজা উপত্যকার প্রত্যন্ত এবং প্রান্তিক পরিবার থেকে। তাদের মধ্যেই কেউ আছেন প্রকৌশলী, সমাজ উন্নয়ন কর্মী, শিক্ষক অথবা আন্দোলনকারী। সমাজে তারা খুবই সম্মানিত এবং খুব কম সময়ের মধ্যেই তারা তাদের কাজে সক্রিয়তা প্রমাণ করেছেন।

উম আরও জানান, নারী হওয়াতে তার সুবিধাও হয়েছে। যেমন, তিনি নারী এবং পুরুষ দুজনের সাথেই কথা বলতে পারছেন। কিন্তু পুরুষ মুখতারাহরা কেবল পুরুষদের সাথেই কথা বলতে পারেন।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ মুখতারাহদের কথা বলতে হয় পরিবারের অন্য কোন পুরুষ সদস্যের মধ্যস্থতায়, এ কারণে বিষয়টা আর নিরপেক্ষ থাকে না।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নারী মুখতারাহরা প্রায় দেড় হাজার মামলায় মধ্যস্থতা করেছেন। এ কাজে তারা কোন আর্থিক সহায়তা পান না শুধুমাত্র তাদের পরিবহন খরচ ছাড়া। এই প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে ইউএনডিপি এটাও চেষ্টা করে যাচ্ছে, যাতে করে ওই এলাকার লোকজন তাদের অধিকার এবং বিভিন্ন আইনী সহায়তা সম্পর্কে সচেতন হয়, তাদের মধ্যে যেন একটা আস্থার জায়গা গড়ে উঠে। সুইডেন, কানাডা, জাপান এবং নেদারল্যান্ডের আর্থিক সহায়তায় চলছে ২৫ মিলিয়ন ডলারের এই কর্মসূচি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.