একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ‘রাজাকার’ বলাটা ভয়াবহ অপরাধ!

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)

রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এমন সব নাম অন্তর্ভুক্ত করা এটা কি থুক্কু বলে মুছে ফেলার মতো ভুল? এই দেশে একজনকে রাজাকার বলার চেয়ে বড় গালি আর কী আছে? আপনি সরকারি খাতায় একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এইরকম একটা গালি দিবেন, সেইটা নজরে আনার পরও সেই তালিকা সরকারের ওয়েবসাইটে ঝুলিয়ে রাখবেন, এইরকম ভ্রান্তির জন্যে ক্ষমা চাইবেন না, পদত্যাগ করবেন না- আর তার পরেও যখন একজন বিজ্ঞের মতো মুখ করে বলবেন যে না, ভুল হয়েছে সংশোধন করা হবে, এটা নিয়ে এতো কথা বলার কী আছে, তখন কিরকম লাগে?

মুক্তিযোদ্ধার নাম যারা রাজাকারের তালিকায় তুলে দিয়েছে, ওদেরকে আর খারাপ কথা বললাম না। এখন তাইরে নাইরে করে ইতং বিতং কথা বলছে- নাকি সুরে বলছে কিনা, না, আমরা তো এই তালিকা করি নাই ইত্যাদি। বাপু হে, এটা কি কোন রাম শাম যদু মধুর কাজ? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল ওয়েব সাইটে ঝুলছে এই তালিকা। আজ এই মুহূর্তে সরকারের অবস্থান হচ্ছে এই যে, এস এম সোলায়মান বা ঠ্যাডা মালেক রাজাকার ছিল কী ছিল না সেটা নিয়ে সন্দেহ থাকতে পারে, কিন্তু সরকারের হিসাবে গোলাম আরিফ টিপু ঠিকই রাজাকার। এইটাই হচ্ছে সরকারের ওয়েব সাইট অনুযায়ী অবস্থান।

এইটা আপনার কাছে ‘সংশোধন করা হবে’ টাইপের ভুল মনে হয়? উপেক্ষা করার মতো ভুল? জি না জনাব। এইটা হচ্ছে অপরাধ। বাংলাদেশে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বলাটা অপরাধ। আর সেটা যদি হয় সরকারের প্রকাশিত কোন দলিলে রাজাকার হিসাবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে তাইলে তো বটেই।

(২)
কেউ বলতে পারেন যে, না ভাই, একটু ভুল ভ্রান্তি তো হতেই পারে ইত্যাদি। এইটা ঐরকম ভুল ভ্রান্তিতে হয়নাই। সেটা হতে পারে না। সরকারের একটা মন্ত্রণালয় থেকে নোটিশ আকারে একটা তালিকা প্রকাশিত হবে, সেটা একজন লিস্ট করেছে আরেকজন টাইপ করেছে আর ছেড়ে দিয়েছে এইভাবে হয় না। যারা সরকারি চাকরী করেন বা যারা সরকারের সাথে কোনরকম কাজ কর্ম করেছেন তারা সকলেই জানেন সরকারি নথী আর সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া।

সরকারের নথীতে এই তালিকা প্রকাশের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে ওয়েবসাইটে তালিকা প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটা পর্যায়ের প্রতিটা সিদ্ধান্তের রেকর্ড থাকার কথা। প্রতিটা সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি কারণ ইত্যাদি নথীতে লেখা থাকার কথা। কারা কারা এই তালিকা করেছে, কিসের ভিত্তিতে করেছে সেগুলি লেখা থাকবে। তালিকা একজন তৈরি করলো বা একদল তৈরি করলো তাতেই হবে না। সেই তালিকা কেউ না কেউ ভেরিফাই করেছে, পরীক্ষা করেছে, যথার্থ বলে নিশ্চিত করেছে, অনুমোদনের জন্যে উপরে পাঠিয়েছে বা অগ্রবর্তী করেছে। একাধিক ধাপে অনুমোদিত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত সচিব ও মন্ত্রী অথবা দুজনেই সম্ভবত অনুমোদন করেছেন।

এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যে কাজটা হয় সেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকার হিসাবে ঢুকে গেছে সেটা ‘ভুল হয়ে গেছে ভাই, বাদ দেন’ বা ‘থুক্কু, ঠিক করে দিচ্ছি’ এই জাতীয় ভুল হতে পারে না। সরকারি দপ্তরে এই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, এটা অনেক সময় বাহুল্য মনে হয়, দীর্ঘসূত্রিতা তো থাকেই, তবুও এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্ত ইত্যাদি নেওয়া হয়। কারণ এইটা সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকারকে এইসব সিদ্ধান্তের জন্যে দায় নিতে হয়। মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এককভাবে তার মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের জন্যে দায়ী থাকেন আর গোটা মন্ত্রীপরিষদ যৌথভাবে সরকারের সিদ্ধান্তের জন্যে দায়ী থাকেন। এইটাই হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় সরকারের দায়বদ্ধতা।

(৩)
এই যে দায়বদ্ধতার কথা বলছি- ইংরেজিটা বলে Individual Responsibility আর Collective Responsibility, এটা কীভাবে কাজ করে? শুধু মন্ত্রীর একক দায়বদ্ধতার কথাটা বলি। প্রতিটা মন্ত্রী তার মন্ত্রণালয়ের সকল কাজের জন্যে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন। মানে হচ্ছে তাঁর মন্ত্রণালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত ঘটনা বা অঘটন ইত্যাদি নিয়ে যেকোনো প্রশ্নের জবাবদিহিতা তাকেই করতে হবে এবং সেরকম কোনো ব্যর্থতা বা অঘটন ঘটলে তার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে তিনি পদ ছেড়ে দিবেন। এইটাই হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাংবিধানিক বিধান। আমাদের সংবিধানে সংক্ষিপ্ত আকারে দায়ের কথাটা লেখা আছে। পদত্যাগের কথাটা লেখা নাই, কারণ সেটা লেখা থাকার দরকার নাই।

মন্ত্রীদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে অনেককেই বলতে শুনি যে তিনি পদত্যাগ করলে সমস্যার সমাধান হবে কিনা। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রীও বলেছিলেন একবার যে তাঁর পদত্যাগে যদি পেঁয়াজের দাম কমে তবে তিনি পদত্যাগ করতে প্রস্তুত আছেন। এইখানে যে ভুলটা আপনারা করেন সেটা হচ্ছে যে পদত্যাগটা হয় দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার জন্যে- সমস্যা সমাধানের জন্যে নয়। আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করতে পারেন নাই বা একটা অন্যায় করেছেন, দায় মাথায় নিয়ে সরে যাবেন। আপনার পদত্যাগে সমস্যার সমাধান হবে কী হবে না সেই বিবেচনার তো সুযোগ নাই।

আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায় এই কারণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মাননীয় মন্ত্রীরও পদত্যাগ করা উচিৎ। তাঁর মন্ত্রণালয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ব্যক্তির নাম রাজাকারের তালিকার মতো একটি ঘৃণ্য তালিকায় যুক্ত করে প্রচার করলেন, এটা তো নিতান্ত ছোটখাটো একটি ব্যাপার নয় আরকি।

(৪)
তবে এইসব বলে আর লাভ কী? আমাদের এখানে তো আর সেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আর কার্যকর নাই যে একজন মন্ত্রী এই পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করবেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.