উত্তরাধিকার

ফাহমিদা খানম:

আত্মকেন্দ্রিক মানুষেরা ভুলে যায় পৃথিবীর নিয়ম খুবই অদ্ভুত, নিজেকে নিয়ে একা ভালো থাকতে গিয়ে যা করে সময়ে সবকিছু সুদসহ ফেরত আসেই!

হাসপাতালে আইসিউর ভেতরে ঢুকে রাশেদের দিকে তাকালাম, জীবন মৃত্যুর মাঝে যুদ্ধ করছে, হয়তো কয়েক ঘন্টা বা সপ্তাহখানেক, তারপরেই থেমে যাবে সব, আমি একাই এসেছি, দুই বাচ্চা আসেনি, উল্টো বাঁধা দিয়েছে। ওদের অভিমানটুকু আমিও বুঝি, ছেলে মুখের উপরেই বলেছে,

“কেনো যাবে তুমি? কীসের অধিকারে? আমরা যাবো না, তুমিও যাবে না”
“লোকটা তোদের বাবা!”
“সে কথা উনি মনে রাখেননি”
“ভুল করেছে তাই বলে শেষ সময়েও যাবি না?”
“তুমি কি সবকিছুই ভুলে গেছো মা?”
মনে মনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলি আমি — কী করে ভুলি সেসব দিন? খুঁজলে শরীরে এখনো অনেক দাগ যে পাওয়া যাবে!

আমাকে বের হতে দেখেই ননদ মাসুমা ছুটে এসে হাত ধরে বললো —
“ভাইজানকে মাফ কইরা দেন, জানি অনেক অবিচার করেছে, তবুও মানুষটা এখন মারা যাইতাছে, তিতলি আর অর্ণব কই? ওরা আসেনি?”
“নারে ভাই, ওদের অভিমান বড়ো তীব্র, আমি পারিনি আনতে”

কলেজে পড়া অবস্থায় পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম আমি আর রাশেদ, ওর বাবার পুরানো ঢাকায় বেকারি ছিলো আর আমার বাবা ছিলো মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক – বাবা আমাকে মেনে নেননি আর রাশেদের পরিবারেও আমাকে সাদরে বরণ করেনি-

“কী দেইখা এই মাইয়ারে বিয়া করলি?”
“ওরে আমি ভালবাসি মা”
“মাইয়ার বাপ বলে স্যার, কিছুই পাবি না আর মাইয়ার রঙ দেখি মাঞ্জা!”
“ওর বাপে জীবনেও মাইনা নিবো না মা, আব্বারে তুমি বুঝাও”
“সকলের কাছে মুখ দেখামু ক্যামনে? মাইয়ার রূপ নাই, আবার বাপেও মাইনা নিবো না”

সেই মুহূর্তেই বুঝেছিলাম এই বাড়িতে রূপ আর টাকার কদর। তবে উপরে যতই কঠিন দেখাক না কেনো শাশুড়িমা কিন্তু ঠিকই মনে ভালো ছিলেন-

“ও বউ খাইয়া ঘুম দেও, এই বাসার ছেলেরা রাত কইরাই বাড়ি ফিরে”
এক মাস না যেতেই টের পেলাম রাশেদ মদ খায় – শুধু ও নাহ, এ বাসার অন্য পুরুষেরাও আসক্ত। রাশেদ ছিলো মেজো ছেলে, সে আগেই বিয়ে করায় শ্বশুর বাবা বড়ো ছেলেকে বিয়ে করানোর জন্যে অস্থির হয়ে গেলেন। নতুন বউ আসার পরে আমার অবস্থান বদলে গেলো – নিজের স্বামীর কাছেই! বড়ো ভাইয়ের বউ রূপসী, আবার বাবার বাড়ি থেকেও অঢেল দিয়েছে কিনা!

আসলে এসব দেখে নাকি অন্য কারণে আজো বুঝেই উঠতে পারিনি আমি – সামান্য ভুল করলেই বেদম মার দিতো, প্রথমদিকে শাশুড়িমা ধরতে আসতেন, তারপর এক সময় সবার গা সওয়া হয়ে গেলো।

ছেলেটা যখন পেটে, একদিন —
“ছাদে এতোক্ষণ কী করতেছিলি?”
“শুকনা জামাকাপড় তুলতে গেছিলাম”
“মাসুমা নিজের চোক্ষে দেখছে পাশের বাসার ভাবির লগে তোরে গপ করতে”
“ছাদে দেইখা ভালো–মন্দ খবর নিসে”
“কিয়ের এতো আলগা পিরীতি মাইনষের লগে, মনে করছস আমি কিচ্ছু বুঝি না?”
বলেই কষে এক লাথি দিলো। আমি পড়ে গেলাম।
আট মাসেই ছেলে অর্ণবের জন্ম হলো – ভাবলাম এবার বদলাবে, প্রতিনিয়ত সবার অবহেলা আর তুচ্ছতার পরেও মাটি কামড়ে পড়েছিলাম – কই যাবো?

আমি স্বেচ্ছায় বিষ খেয়েছি! শাশুড়ি মা কিন্তু অর্ণবকে অনেক আদর করতেন, কিন্তু ঐ যে ভাগ্য, কপাল হঠাৎ করে সিঁড়ি থেকে পড়ে উনি মারা গেলেন – শুনেছিলাম মদ্যপ শ্বশুর উনাকে লাথি মেরেছিলেন – টাকা দিয়ে ডাক্তারকে বশে রেখেছিলেন বলে সত্যতা জানিনি, তবে আমার আশ্রয়টুকু যাবার পর রাশেদ বেপরোয়া হয়ে গেলো – সামান্য কিছু ছুঁতো পেলেই মার শুরু করতো—উস্কানি দিতো ছোট বোন মাসুমাই! মেয়েটা তখন পেটে, একদিন চরিত্রহীনতার অপবাদ দিয়ে বের করে দিতে চাইলো — আমি নাকি হুজুরের সাথে হাসিমুখে কথা বলেছি, এটাই ছিলো কারণ আর সাক্ষী বাইরের কেউ নাহ—মাসুমা নিজের চোখে দেখেই জানিয়েছে।

“আব্বা, আমি কই যামু? আপনি আপনার ছেলেকে বোঝান!”
“পোলার যখন তোমারে পছন্দ না – আমি আর কী করুম?”
ছুটে গেলাম ওর বড়ো ভাইয়ের কাছে—
“ভাইজান অর্ণব ছোট, আরেকজন পেটে, আমি কই যাবো একটু রহম করেন”
নাহ বাড়িতে থাকা কারোই মায়া –দয়া লাগেনি, শেষবারের মতো রাশেদের কাছে যেতেই বলেছিল—
“ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দে, না হইলে তোগো মত মেয়েগো যাবার মতন আর একটা যায়গা আছে সেই লাইনে যা”

আঘাতেরও সীমানা থাকে – সেটা পার হলে মানুষ পাথর হয়ে যায়! লজ্জায়, ঘৃণায়, অপমানে আমি নীল হয়েছিলাম, ছেলেটাকে রাখেনি দয়া করেছিলো আমাকে। তারপর কতো কষ্টে যে দিন পার করেছি! সব স্বপ্নের মতোন মনে হয়।

ভিখারীর মতন বড়ো বোনের কাছে গিয়েছিলাম। শুনে বড়ো ভাইটাও ছুটে এলো, এক রুমের বাসা ঠিক করে দিলো – শুরু করলাম মেসের জন্যে রান্না – আর কী করবো, পড়াশোনাও শেষ করিনি। হায়রে প্রেম!
মোহ আর বাস্তবতার মাঝে যে কত বিরাট ফারাক, হাতেনাতে বুঝিয়েছে! একদিন কী মনে করে যেনো সে বাড়ি গেলাম, নতুন বউ দেখলাম, অল্প বয়সী, রুপবতী আর আড়তদার বাবা দিয়েছেও অনেক, মাসুমাই ঘুরে ঘুরে সব দেখালো – শুনলাম বিয়ের ঘটক তার বড়ো ভাইয়েরই বউ।

ক্ষুদ্র এই জীবনে যা বুঝলাম এদেশে মেয়েদের বড়ো শত্রু মেয়েরাই, মেয়ের জন্মের পরে আমি আরও নিজেকে বদলে নিলাম — দু বাচ্চার জন্যে আমাকে যেভাবেই হোক ঘুরে দাঁড়াতে হবেই। মেসের রান্না থেকে প্রশংসা পেয়ে তখন অফিসেও আমার রান্না করা খাবার যাচ্ছে – ভাবলাম, রাশেদ অধ্যায় আমার জীবনে শেষ, কিন্তু ঐ যে ভাগ্য, কপাল সেটা আমার পিছু ছাড়ে না! কোথা থেকে ঠিকানা নিয়ে রাশেদ এ বাসায় আসা শুরু করলো –
“ভদ্রঘরের মাইয়ারা ব্যাডাগো ভাত রান্ধেনি? শোন নিজের বাড়িতে চল, হে থাকবো হের মতো, তুই তোর মতো!”
“আমার এক ভুলের মাশুল আমি আর কত দিবো? আমারে আমার মতো থাকতে দেও”
“শোন মাসুমার বিয়া ঠিক হইছে, ছোট বউ সংসার সামলাতে পারে না, বাপজানের বয়স হইছে – তুই গিয়া সংসারের হাল ধরবি”
হায় ভালবাসা নয় – অনুতপ্ত নয়, স্বার্থেই আমাকে কাছে টানার চেষ্টা!

দুইদিন পর পর মদ্যপ হয়ে বাসায় আসতো বলে বাড়িওয়ালা বাসা ছাড়তে বললেন – বাসা বদলেও শান্তি পাইনি, কীভাবে যেনো ঠিকই হাজির হতো, ছোট ভাইটার চাকুরি হলো পার্বত্য জেলায়। ও জোর করেই আমাকে নিয়ে গেলো। মাঝে বাবার শরীর খারাপ শুনে এসেছিলাম – ভাগ্য, কপাল কাকে বলে! বাবা মেনে নেবার কিছুদিন পরে মারাও গেলেন, মা আমাকে নিয়ে চলে গেলেন গ্রামের বাড়ি, কেটে গেলো দশ বছর!

এখানে ভালই আছি আমি, কয়েকদিন ধরে বড়ো বোন ফোন দিয়ে জানাচ্ছে, ওরা নাকি আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে – আমি ঢাকা এলাম, মন যুক্তির ধার ধারলো না তাই এলাম।
“তোমার ছোট ভাবি কই মাসুমা?”
“হেতো কবেই ভাইরে ছাইড়া আরেকজনের লগে ভাগছে!”
“বাসার অন্য কাউকে দেখছি না যে?”
“আব্বায় স্ট্রোক কইরা বিছানায়, আর বড়ো ভাবির লগে মেজো ভাইয়ের কাইজ্জা হওনের পর তিন মাইয়া নিয়া বাপের বাড়িতেই থাকে”
“বাসায় কে তাহলে?”
“একটা কাজের পোলা রাখছে, আব্বা আর মেজো ভাই আপনারে কবে থিকা খুঁজতাছে?”
“আমি তো চরিত্রহীনা, আমাকে কেন?”
“আমার পাপের শাস্তি আল্লাহ আমারে দিসে ভাবি – আমার বাচ্চা হয় না, শ্বশুর ছেলেরে আবার বিয়া করাইবো”
“সময় কী ভয়ংকর, তাই না মাসুমা?”
“বড়ো ভাইজানের তিন মাইয়া, আমাগো বংশের বাতিই অর্ণব – বাপজান ওরে দেখার জন্যেই বাইচা আছে ভাবি”।

“একদিন পেটের মেয়ে আর এই ছেলেসহ আমাকে বের করে দিয়েছিলে তোমরা সবাই মিলেই, আর আজ উত্তরাধিকার খুঁজছেন বাবা? সেদিন যদি সামান্য দয়া করতে আজ এদিন আসতোই নাহ”

জীবন মাঝে মধ্যে কারো সাথে বড়ো রসিকতাই করে বসে! মানুষ ভুলে যায় আজকে আমি যা করছি একদিন ঠিকই সুদসহ ফেরত আসবে — প্রকৃতি বড়ো অদ্ভুত সে কিন্তু ছাড় দেয় না, আমি জানি আমার সন্তানেরা কখনই সে বাড়ি যাবে না – উত্তরাধিকার সুত্রে কিছু পেলেও নিবে না। আমি অপেক্ষা করছি আমার প্রেমিক স্বামী আমাকে কি বলে সেটা জানার জন্যে। আচ্ছা রাশেদের জ্ঞান কি ফিরবে? ওকি ভুলের জন্যে ক্ষমা চাইবে? নাকি উত্তরাধিকার ফিরে পেতেই এই ব্যাকুলতা?

# আচ্ছা অপেক্ষারা এতো দীর্ঘ কেনো!

শেয়ার করুন:
  • 111
  •  
  •  
  •  
  •  
    111
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.