কন্যারা কবে বেড়ে উঠবে নিশ্চিত নিরাপত্তায়!

শাহরিয়া দিনা:

বিজয় দিবসের সকালের খবর: প্রতিবন্ধী শিশু ফাতেমা’র ধর্ষণ ও হত্যা মামলার অভিযুক্ত ক্রসফায়ারে নিহত। গত ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পরে নিখোঁজ ছিলো ফাতেমা। ফরিদপুরে নিখোঁজের একদিন পর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশু ফাতেমার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফরিদপুর শহরের দক্ষিণ কালীবাড়ি মহল্লায় বাংলাদেশ টেলিগ্রাম কার্যালয়ের চত্বর থেকে লাশটি উদ্ধার হয়। শিশুটির গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। ধর্ষণ করে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে ৮ বছরের এই মেয়েটিকে…।

দুপুরের খবর, মায়ের অনুপস্থিতির সুযোগে ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণ করেছে সৎবাবা আবু তাহের। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধানখোলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১৫ ডিসেম্বর) দুপুরে নিজ বাড়িতে একা পেয়ে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে সে। ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে আবু তাহের।

শাহরিয়া দিনা

একদিন আগের খবর, প্রধান শিক্ষক ও বখাটের ধর্ষণের শিকার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী (১২) মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছে। শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) সিজারিয়ানের মাধ্যমে সে সন্তানের দেয়। প্রসঙ্গত, মেয়েটি জানায়, বরিশালের বাকেরগঞ্জের নয় মাস আগে ভোজমহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেবা ক্লাস থেকে শিশুটিকে ডেকে নিয়ে প্রধান শিক্ষক মো. বাবুলের কক্ষে যেতে বলে। এরপর সেখানে গেলে প্রধান শিক্ষক বাবুল তাকে ধর্ষণ করে। আর বলে দেয় এ ঘটনা কাউকে জানালে তাকে প্রাণে মেরে ফেলবে। হত্যার হুমকি দিয়ে এভাবে প্রায়ই বাবুল তাকে ধর্ষণ করতো। বাইরে পাহারায় থাকতো শিক্ষক রেবা। এর মধ্যে তার বাড়ি সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা জুয়েলও তাকে অনেকবার ধর্ষণ করে।

সারাদেশে শিশু ধর্ষণ এবং খুনের ভয়াবহ ঘটনাচিত্র এভাবেই আসছে প্রতিদিন। এ দেশের স্বাধীনতার ৪৮ বছর পার হয়েছে, কিন্তু কন্যা শিশুদের স্বাধীনতা কবে আসবে কে জানে! কন্যা সন্তানের জন্ম যুগে যুগে অবহেলিত ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। অবস্থার উন্নতি হচ্ছে কিন্তু নিরাপত্তা রক্ষিত হচ্ছে না। একটা শিশুর পরিচয় শিশুই হওয়া উচিৎ। সমান সুযোগ-সুবিধায় ছেলে-মেয়ে উভয়েই বেড়ে উঠবে এইতো সভ্য সমাজের চাওয়া। কিন্তু কী দেখছি আমরা!

কন্যা মানেই যেহেতু যোনী আর জরায়ুর মালিক, তাই সে যে বয়সেরই হোক তাকে বাগে পেলে কিছু পিশাচের চরমতম নোংরা নিষ্ঠুর মানসিকতা জেগে উঠে। এই পিশাচদের কাজকে সাফাই দিতে কেউ কেউ নারীর পোশাক চলাফেরা জাতীয় অর্থহীন যুক্তি দাঁড় করানোর নির্বোধ ব্যর্থ চেষ্টা করেন। একটা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী আট বছরের শিশুর অপরাধ কী ছিল? সে কীভাবে উত্তেজিত করেছিল ওই জানোয়ারকে?

ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ না আমার-আপনার কন্যা সন্তান। শহর-গ্রাম, ধনী-দরিদ্র বাদ নেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীও। নিজের ঘর, আত্মীয়-স্বজন, স্কুলের শিক্ষক কে নেই নির্যাতকের তালিকায়! সবাইকে অবিশ্বাস করে যেমন বাঁচা যায় না, তেমনি সবাইকে বিশ্বাস করেও নিশ্চিত থাকা যায় না।

শৈশবের নিষ্পাপ রঙিন দিন। একটা শিশু পাখির মত স্বাধীন। প্রজাপতি’র মতো বর্ণিল। সে ঘুরবে-ফিরবে ইচ্ছেমতো। পৃথিবীকে জানবে নিজের মতো। কিন্তু এই শৈশবে যদি কেউ এমন দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় তার একজীবনে সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠা কঠিন।

শিশুর প্রতি এমন সহিংস আচরণ যারা করে তারা একশ্রেণির মানসিক বিকারগস্ত। যৌনতা মানুষের সহজাত, কিন্তু বিকৃত যৌনতা অসুস্থতা এবং অবশ্যই ক্ষেত্রবিশেষে অপরাধ। এইসব বিকারগস্তদের চিহ্নিত করার বিশেষ কোন লক্ষণ নেই, এরা আপনার-আমার আশেপাশেই থাকে। সাধারণের মধ্যেই থাকে। সুযোগ পেলেই নিজের নোংরা উদ্দেশ্য চরিতার্থে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

সমাজ বা রাষ্ট্র যেহেতু পরিপূর্ণ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে না, তাই আপনার সন্তানের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। কন্যা শিশুদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, বয়োঃসন্ধিকাল, বিকাশ প্রক্রিয়া প্রতিটি পদক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। বড়দের অস্বস্তিকর ধরাছোঁয়া সম্পর্কে বাচ্চাদের শেখাতে হবে। বাচ্চাদের সাথে বাবা-মা’য়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা এবং কারো বিরুদ্ধে শিশু এমন অভিযোগ করলে গুরুত্বের সাথে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

কন্যা শিশুর সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন এবং তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার উদাহরণ না থাকলে অন্যরাও ভীত-সাবধান হবে। স্বাধীন দেশে কন্যা শিশু বেড়ে উঠুক পরিপূর্ণ স্বাধীনতার আনন্দ নিয়ে।

শেয়ার করুন:
  • 211
  •  
  •  
  •  
  •  
    211
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.