অভিভাবক যখন অবিবেচকের ভূমিকায়

কৃষ্ণা দাশ:

অভিভাবক বলতে কোনো সন্তানের বাবা মা কিংবা কোন সন্তানের দায়িত্ব বহনকারীকে বুঝানো হয়। এই আমরা/অভিভাবকরাও অনেক সময় সন্তানের সাথে এমন এমন আচরণ করি, যা কোনো কোনো সময় বেশ অবিবেচকের মতোই দেখায়। আমি একটা ছোট্ট ঘটনার সাহায্যে এই বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করবো।
তখন আমি ৯/১০ ক্লাসে পড়ি, আমার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা এটি।

কোনো এক সকালে আমার বান্ধবী ঘরে পড়ছিলেন, হঠাৎ জানলায় ঠক ঠক শব্দ হয় এবং সাথে ঘরের মধ্যে কিছু ছুঁড়ে আসার শব্দ টের পায়। সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি করে বুঝার চেষ্টা করে কী হয়েছে! দেখতে পায়, সাদা কাগজে মোড়া একটা ইট এবং তার সাথে একটা প্রেমপত্র। যাই হোক চিঠি দেখেই ওর বাবা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। কারণ চিঠিটি আমার বান্ধবীর নামে। অনেক প্রশ্নোত্তর আর মারধর করার পর ওর বাবা সিদ্ধান্ত নেন যে ওকে আর স্কুলে পাঠাবেন না। পাঠাবেন না মানে পাঠাবেনই না এবং এই ঘটনার একমাসের মধ্যে কোনো এক প্রবাসির সাথে ওর বিয়েও দিয়ে দেন।

প্রায় বছর দশেক পর ওর সাথে আমার কোনো এক ট্রেনিং কোর্সে দেখা। মাঝখানের এই সময়টাই কোনো ধরনের যোগাযোগ আমাদের ছিল না। যাই হোক জানতে চাইলাম ‘কেমন আছিস’?
দেখলাম এক উজ্জ্বল জ্বলজ্বলে চোখ, যে চোখ এক আত্মবিশ্বাসী নারীর। আমি কিছুটা হোঁচটও খাচ্ছি মনে মনে। কারণ আমার জানা মতে ওর মাধ্যমিক পাশের আগেই বিয়ে হয়েছে৷ অথচ আজ যে ট্রেনিং কোর্সে আমি আছি তা উপজেলা সমাজকল্যাণ অফিসারদের সমন্বয়ে গঠিত।

ওর জীবনের উত্থান-পতন জানলাম। জানলাম প্রচণ্ড জেদি আর আত্মবিশ্বাসী এক কিশোরীর বেড়ে উঠার কথা। বলতে শুরু করে, “সেদিন প্রবলভাবে পরিবারে লাঞ্ছনার শিকার হয়ে বেশ কিছুদিন কারও দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারিনি। ছোট ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী বাসার কাজের লোক, সবার কাছে কৈফিয়ত দিয়ে দিয়ে আমি অপমানিত, ক্লান্ত..…কিন্তু আমি শান্ত হতে পারিনি। আজও সেই কষ্ট আর অপমান আমাকে তাড়া করে ফেরে….. ক্ষমা করতে পারিনি বাবাকে”।
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে, “আজ আমি নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত, আর বাবাও সেজন্য গর্বিত। বাবা গত হয়েছেন অনেকদিন, আমি বাবাকে মিস করি, কাঁদি…বলতে চাই বাবা, তোমাকে ক্ষমা করতে না পারার জন্য আমাকে ক্ষমা করো।”

আমি ক্ষমা করতে পারছি না কারণ আমার কৈশোরবেলা আমার বাবা নিজের হাতে হত্যা করেছে৷ আর পাঁচটা মেয়ের মতো আমার খোলা আকাশে উড়বার পাখাটা বাবা নিজ হাতে কেটে দিয়ে, ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে বিশাল এক দায়িত্বের বোঝা। আমার আজ অন্য কারও পরিচয়ে হয়তো বাঁচতে হতো, বাবা আমার পরিচয়টা মুছে ফেলে অন্যের অধীনে থাকাটাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এসবই ক্ষমার যোগ্য হয়তো, কিন্তু আমার বালিকাবেলা আমাকে তাড়া করে ফেরে। আমাকে ভুলতে দেয় না, যে অপরাধ আমি করিনি তার জন্য এক বিশাল শাস্তি পেতে হয়েছে। আমার কিছু বলার ছিল সেদিন, উনি শুধু স্বৈরাচারী মনোভাবের দরুন এক আকাশকুসুম কল্পনায় তাড়িত হয়ে আমাকে নিজ হাতে খুন করেছেন।

ওর কথাগুলো শুনছি আর ভাবছি, এই সমাজ ব্যবস্থার কি খুব বেশি পরিবর্তন আজও হয়েছে? হয়তো এই ঘটনাটা আরও ২০/২৫ বছর আগের। কিন্তু এটি কি গতকালের নয়? বা আজকের? হয়তো আগামী কালেরও। ঘটনাটি কি শুধু আমার বান্ধবীর, যার নাম ধরা যাক, যূথী। কিন্তু এটা কি শিমুল কিংবা জুঁইয়ের নয়?

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা বড়রা বড়ই নিষ্ঠুর, বড্ড বেশি অবিবেচক। কারণ আমাদের যে ভুল হতে পারে তা আমরা ভাবতে পারি না, মানতে চাই না, সন্তানদের কাছে তো অবশ্যই না। তাদের কাছে আমরা বিধাতাসম হতে চাই, থাকতে চাই।

আমরা সন্তানদের সম্পত্তি ভাবি, কাজেই তাদের অধীনে রাখবার চেষ্টা করি। এটা ঠিক যে, শারীরিক – মানসিকভাবে সঠিক মাত্রায় বেড়ে ওঠার জন্য তার লালন-পালন ও যত্নের ভার নিতে হবে আপনাকেই। কারণ এটি আপনার ব্যাক্তিগত, সামাজিক,মানবিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব।
সন্তানকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের উৎস না ভেবে বরং ভাবুন, সে আপনার জীবনে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করতেই এসেছে, যা আপনাকে ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা সমৃদ্ধ। আর তাই যেন হয় আপনার প্রত্যাশা আর অহংকার।

অযথা প্রাচীন চিন্তা চেতানায় নিজেকে বন্দী না করে মনের দরজা-জানালা খোলা রেখে ভাববার চেষ্টা করুন। তাকে তার মত বেড়ে উঠতে সহায়তা করুন, চাপিয়ে না দিয়ে সহযোগী হোন।
নিজেদের প্রতি আমাদের এই অন্ধ আস্থা যে কত কষ্টের, অন্যায়ের বা ভয়ঙ্কর হতে পারে তা কি ভেবেছি কখনো?

না ভাবলে একটু সময় নিয়ে ভাবুন। আপনার নিজের উপর যে অন্যায় হয়েছে সেটারই আবার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেদিকে সচেষ্ট থাকুন। কারণ এই সন্তান আমাদেরই, এদের সুন্দর একটা সকাল দেখানোর দায়িত্বও আমাদের।

কল্যাণী, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ থেকে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.