রাজনীতির রসাতলে মুক্তিযুদ্ধ

জিন্নাতুন নেছা:

৪৯ বছরের বিজয় দিবস উদযাপন করছি। মুক্তিযুদ্ধ যেকোনো দেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের আর সম্মানের। বাংলাদেশের জন্য ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধও এর ব্যতিক্রম না। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লক্ষ ভাইবোন, মায়েদের জীবন আর অত্যাচার নির্যাতনের বিনিময়ে এ স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি। পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশের এক মানচিত্র। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও জাতি কিছু দায় থেকে মুক্ত হতে পারেনি। পারেনি স্বাধীনতার আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে। স্বাধীনতার ৪৮বছরেও হয়নি পূর্ণাঙ্গ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা, হয়নি রাজাকারের তালিকা।

আশার বিষয় হলো কিছুদিন আগে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা করা হয়েছিলো এবার মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করা হবে এবারের বিজয় দিবসের পূর্বেই। করাও হয়েছে বটে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যা প্রকাশ করা হয়েছে তা পূর্ণাঙ্গ নয়, আংশিক। বরং কয়েকজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজারাকের নামের তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং ধিক্কার দেবার মতো ঘটনা।

জিন্নাতুন নেছা

যে ঘটনা নিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা কন্যা খুব আক্ষেপ করে বলেছেন, এটা তার অন্যধারার রাজনীতির ফলাফল। অর্থাৎ মেয়ে অন্যধারার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বলেই তার পরিবারের সদস্যদের এই ধরনের ফল ভোগ করতে হচ্ছে। তাহলে কি বিষয়টা এরকম যে যত মুক্তিযোদ্ধা সকলেই বিশেষ দলের হতে হবে, এটা বাধ্যতামূলক?

তালিকা প্রকাশের এই ধরনের ভুলের ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে মিডিয়াতেও তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় এর মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তা নতুন করে করা হয়নি, বরং ঐ সময়ে পাকিস্তানিরা রাজাকারের যে তালিকা প্রকাশ করেছিলো, সেটাই প্রকাশ করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো –

১. পাকিস্তানিরা রাজাকারের তালিকা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করবে না, অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় ঢুকিয়ে দেবে এটাই স্বাভাবিক।

২. মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব হলো মুক্তিযোদ্ধার নাম প্রকাশ, রাজাকারের নাম প্রকাশ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলো মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় তা করতে পারেনি বরং নাম প্রকাশ করেছে উল্টোপাল্টা।তাহলে এতো বছরেও কী করেছে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়? প্রশ্ন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের নামের তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়া হলো, এর চাইতে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে? এর দায় জাতি কীভাবে এড়াবে এটা অন্তত আমার বোধগম্য না।
এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননার ক্রেস্টে সোনার পরিবর্তে তামা ও অন্যান্য ধাতু মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল। কোন বিচার কি হয়েছে? না হয়নি।

গতকাল রাতে এক বন্ধু ম্যাসেঞ্জারে টেক্সট করেছিলো, আচ্ছা ১৯৭১ এ স্বাধীনতা কি মাইক বাজিয়ে আনা হয়েছিলো কিনা? আমারও একই প্রশ্ন! আমরা বিজয় দিবস উদযাপন করছি, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম হিন্দি গান বাজানোর মহড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বড় গলায় রাস্তা বন্ধ করে সমাবেশ করছি, গলাবাজি করছি। কিন্তু বিজয় মানেই গলাবাজি নয়। বিজয় মানে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা। বিজয় মানে নিরাপত্তা, মর্যাদা।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সারকথাও ছিলো একটা বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু আমাদের সমাজে এখন আমরা কতটুকু স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারছি, কতটুকু নিরাপত্তায় বসবাস করতে পারছি। এর অর্থ কি স্বাধীনতা? এর অর্থ কি বিজয়?

আর যদি তাই না হয় তাহলে কি বলা যায় প্রকৃত বিজয় অর্জন করতে পেরেছি??

লেখক: উন্নয়ন কর্মী ও গবেষক

শেয়ার করুন:
  • 160
  •  
  •  
  •  
  •  
    160
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.