ড্রাগস, পর্নোগ্রাফি এবং প্রজন্ম

শাহরিয়া দিনা:

কক্সবাজারে বেড়াতে এসে অতিরিক্ত ইয়াবা সেবনের কারণে স্বর্ণা রশিদ নামের ২২ বছর বয়সী এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। স্বর্ণা রশিদ প্রাইভেটে ব্রিটিশ কাউন্সিলে “এ লেভেল” এ অধ্যয়নরত ছিল। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকের মতে, তিনি অতিরিক্ত ইয়াবা সেবন করেছিলেন। পুলিশ এ ঘটনায় ওই ছাত্রীটির প্রেমিক ওয়ালী আহমদ খানকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।

পত্রিকার খবর অনুযায়ী স্বর্ণা মামার বাড়িতে যাবার কথা বলেই বন্ধুদের সাথে ঢাকার চকবাজার থেকে কক্সবাজার চলে যান। তারা ছিলেন সংখ্যায় ১০/১১ জন। বিকালে সৈকত ভ্রমণ শেষে হোটেল কক্ষে ফিরে বন্ধু-বান্ধব সবাই বসে যান মাদক সেবনে। সন্ধ্যার পর পরই মাদকের ঘোরে হুঁশ হারিয়ে ফেলেন স্বর্ণা রশিদ। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। রাত ৯ টার দিকে মারা যান তিনি।

শাহরিয়া দিনা

নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলন কয়েকদিন আগে ফেইসবুকে লিখেছিলেন, ‘আগামি দুই তিন বছরের মধ্যেই একটি জাতির প্রায় সকলেই, কী বয়স্ক (এদের দরকার), কী সদ্য বিবাহিত, কী অবিবাহিত, কী কিশোর যৌন উত্তেজক ঔষধ সিল্ডেনাফিল, টাডালাফিলে (ভায়াগ্রা) আসক্ত বা ব্যবহার শুরু করবে নিশ্চিত। আপনি জানতেও পারবেন না আপনার ১৫/১৬ বছরের কিশোর ছেলে ইতোমধ্যেই তা এস্তেমাল শুরু করে দিয়েছে’।

হিসেব মতে, প্রায় ১৭৫টি কোম্পানি বাংলাদেশে যৌন উত্তেজক ঔষধ তৈরি করছে এবং নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থায় এসব বিক্রি হচ্ছে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই। এ ছাড়াও টনকে টন সিল্ডেনাফিল, টাডালাফিল পাউডার অবৈধ পথে আমদানি হয়ে ঢুকছে দেশে। ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে, এইসব পাউডার এলোপ্যাথি, হার্বাল এবং এনার্জি ড্রিংক্সসে ব্যবহার হবে বা হচ্ছে। থামানো যাচ্ছে না ইয়াবার আক্রমণ। চোরাই পথে ইয়াবা আসছে দেশে, সহজলভ্য তরুণ প্রজন্মের কাছে। কৌতূহলে শুরু করে অভ্যাসে পরিণত করে এসব খেয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উত্তেজিত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রজন্ম। যৌন উত্তেজক ঔষধের সহজলভ্যতার পাশাপাশি রয়েছে আরেক সহজলভ্য উত্তেজনা পর্নোগ্রাফি।

আমাদের দেশে সরকারিভাবে অনেকগুলো পর্নো সাইড ব্যান করা হয়েছে, কিন্তু তাতে কি কমেছে পর্নো দেখা? পর্নো সাইট বন্ধ করলেন, কিন্তু প্রক্সি কীভাবে বাইপাস করে বা ভিপিএন দিয়ে কী করে সাইটে যায় এগুলো তো শিখে গেছে আমজনতা, আর বিদেশি সাইট তো বন্ধ করা সম্ভব না। ফলাফল হিসেবে প্রযুক্তির এই যুগে কেউ কেউ ব্যক্তিজীবনেও ফলো করছেন এই পর্নোট্রেন্ড।

২০০০ সালের পর পুরো পৃথিবীর সংস্কৃতিতে যেমন পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে তেমনি পর্নোমুভিতে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ক্রমশঃ পর্নে ভায়োলেন্স বেড়েছে। এসেছে গ্যাংব্যাং, ফোর্সড, রেপ, গ্যাংরেপ, সাব্জুগেশন, হিউমিলিয়েশন, বিডিএসেম ইত্যাদি। এখানেই থেমে থাকেনি, যোগ হয়েছে আরও নতুন কিছু। কারণ ঘুরেফিরে একই জিনিস বোরিং লাগে, মানুষ নতুনত্ব খোঁজে। সুতরাং নতুন বৈচিত্র্য এলো স্নাফ, চাইল্ডপর্ন।

তথ্যপ্রবাহের এই যুগে এসে সবাই এতোদিনে জেনে গেল পর্নো ইন্ডাস্ট্রির কথা। মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার ব্যবসার এই মার্কেটের যাদের পর্দায় দেখা যায় তারাও অভিনেতা-অভিনেত্রী। সুতরাং অভিনয় আর ভালো লাগে না, চাই বাস্তবিক উত্তেজনা। তার ধারাবাহিকতায় চলে এলো স্পাই ক্যামস। চলতি পথে বাসে-ট্রেনে, গ্রাম-গঞ্জে-শহরে লুকিয়ে মেয়েদের বুক কিংবা নিতম্বের ছবি তোলা। গোসল বা ট্রায়ালরুমে কাপড় চেঞ্জের সময় ভিডিও ধারণ করা। একচুয়াল নিজের সেক্স ভিডিও, রেপের ভিডিও ধারণ করা ইত্যাদি।

পর্নে ধীরে ধীরে বাড়লো বিকৃতি এবং জোর-জবরদস্তি। দেখানো হতে লাগলো বাবা-মেয়ে, মা-ছেলে, ছেলের বন্ধু, মেয়ের বান্ধবী, ভাই বোন, ইত্যাদি ইত্যাদি। শিশু থেকে বয়স্ক মহিলা কেউ বাদ যাচ্ছে না। সমাজেও পড়ছে এর প্রভাব। কারণ পর্ন তাকে দেখিয়ে দিচ্ছে শিশু থেকে মা-খালা বা নানী’র বয়সী কেউও তার সাময়িক শারীরিক লালসা পূরণের মাধ্যম হতে পারে। এই বিকৃত ধ্যান-ধারণা মস্তিষ্কের প্রবেশ করানোর জন্য পর্নোগ্রাফি ভীষণ রকম দায়ী একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভিজুয়াল স্টিমুলেশন, ব্রেইন অ্যাক্টিভেশন এসবই পাচ্ছে পর্নো থেকে।

আমাদের দেশে এখনও সব এলাকাতে ভালো রাস্তা-ঘাট, সেতু-কার্লভাট নেই, প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র নেই, পর্যাপ্ত বিদ্যালয় নেই। কিন্তু থ্রিজি- ফোর জি মোবাইল ডেটা আছে। শেয়ারইট, ব্লুটুথ, মেমোরিকার্ড, ভিডিও প্লে করার মতো স্মার্টফোন আছে। আর সেসব স্মার্টফোনে ইচ্ছেমতো পর্নো দেখার সুযোগ আছে। কত কত ক্যাটাগরি দেশি-বিদেশি কতো কী! ক্যাবল টিভির বদৌলতে এদেশে সানি লিওনির মতো পর্নোস্টারও জনপ্রিয় এবং পরিচিত মুখ। এই উপমহাদেশে সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মত মেকাপ-গেটাপ করাটাই যেখানে ফ্যাশন, সেখানে তারা পর্নো থেকে দেখে বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বাস্তবে নিতে চাইবে না, তার গ্যারান্টি কে দিতে পারবে!

শিক্ষা নেই, নৈতিকতা নেই, পারিবারিক সম্মানজনক সহাবস্থান নেই, খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ নেই, নেই বিনোদনের অন্য কোনো ব্যবস্থা। সেক্সের জন্য ফ্রি শরীর নেই, কিন্তু হাতে উত্তেজিত হবার মতো যথেষ্ট উপাদান। আর তাতেই চরম অপরাধমূলক বিবেক বর্জিত কাজে উৎসাহী হয় কেউ কেউ। কাউকে ব্লাকমেইল করে দিনের পর দিন ধর্ষণ, দলবেঁধে ধর্ষণ বা ধর্ষণের পর খুনের মতো খবরগুলো আমাদের সামনে চলে আসে।

পারিবারিক শিক্ষা এবং নৈতিকতা মানুষের জীবনে বড় ভূমিকা রাখে সত্যি। সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, খেয়াল রাখাটাও জরুরি। কিন্তু একটা সময়ে এসে বাবা-মা’ও অসহায় হয়ে যান। সন্তান বড় হবার নামে যদি স্বেচ্ছাচারী হয় তো স্বর্ণার শোকাহত বাবার মতো আফসোসের আহাজারি আর কন্যা হারানোর শোকে মূর্চ্ছা যাওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সাবধানতা এবং সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.