আমি বীরাঙ্গনা বলছি হে প্রিয় স্বদেশ, ভুলে যেয়ো আমাকে

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

আমি বীরাঙ্গনা বলছি

আমার চোখে চোখ মিলাও হে বিরাট সমাজ!

জানি আমার মতো অচ্ছুৎ বিষয়ে তোমার বড্ড অনীহা! আমি সেই অচ্ছুৎ, অস্পৃশ্য বীরাঙ্গনা বলছি।
একাত্তরের উত্তাল দিনগুলিতে শকুনের দল ছোঁ মেরে আমাকে তুলে দিয়েছিলো হায়েনা পাকিস্তানিদের আস্তানায়।

পিতাপুত্র ভাইয়ের-মায়ের রক্তে ভেসে যাচ্ছিলো পবিত্র জন্মভূমি, ওরা তখন স্টেডিয়ামের উৎফুল্ল দর্শকের মতো গ্রামের পরে গ্রাম আগুনের মেক্সিকান ওয়েভ ছড়িয়ে চলেছে। চোখের নিমেষে উপড়ে ফেলছে পিতার প্রশান্ত দৃষ্টি থেকে জোড়ায় জোড়ায় চোখ। মায়ের বুক থেকে লুন্ঠন করছে লক্ষ মানিকরতন।
ভাইয়ের হৃৎপিণ্ড খুবলে মেটাচ্ছে রক্তের বীভৎস পিপাসা।

অথচ আমি এর কিছুই জানি না। বাইরের পৃথিবীর আলোকবিন্দু কত যুগ আমার জানালা ভেদ করে ভেতরে আসে না, আমি তার কিছুই জানি না। আমি তখনো কোনো দানবের দেহের নীচে পড়ে আছি- সংজ্ঞাহীন, অসাড়, অর্ধমৃত। অচেনা লোকের শরীরের কাম-ক্রোধ -আক্রোশ, ঘাম-গন্ধে আমার নিশ্বাস নেবার ক্ষমতা হারাতে বসেছি।
রাজাকার থেকে বিহারি, চাপরাশি থেকে বড়কর্তা, সিপাহী থেকে জেনারেল – আমি কোনো পার্থক্য বুঝি না! মানুষের বদলে আমি কেবল ধর্ষক চিনি। বেয়োনেটের খোঁচায় ক্ষতবিক্ষত আমার অবশ হয়ে আসা একরত্তি শরীরটাকে কত সহস্রবার ধর্ষণ করে ওরা ক্ষান্ত হবে সে প্রশ্ন করবার শক্তিটুকু তখন আমার নেই। ধারালো ছুরির ফলায় নতুবা দুই ইঞ্চি হিংস্র সোনালি দাঁত দিয়ে ওরা প্রতিদিন একটু একটু করে আমার স্তনের মাংস কেটে উল্লাসে ফেটে পড়ে। মরে যেতে যেতে কোথা থেকে জেগে ওঠে মাতৃহৃদয়! ঘোলাটে চোখে ভেসে ওঠে আমার দুধের সন্তানের প্রিয় মুখ – কোথায়, কেমন আছে আমি জানি না। মায়ের দুধের জন্য তারস্বরে কাঁদলে কেউ যেন দয়া করে প্রাণপণে চেপে ধরে ওর মুখখানা! ক্ষুধার্ত থাকুক, তবু বেঁচে থাকুক বাছা আমার‍!

ওরা তখন হুইস্কি কুলি করে গলগল করে আমার মুখে
ঢালছিলো। বোধহয় আমি চলন্ত গাড়িতে! নাকি আর্মিদের জীপে!
এরপর কোথায় নিয়ে যাবে? কনসেনট্রেশান ক্যাম্প! আর কোন নরক ঘুরে আসা বাকি? হঠাৎ আমার ভেতর থেকে কে যেন অস্ফুটে আর্তনাদ করে ওঠে – ডু মি অ্যা ফেভার! প্লিজ কিল মি। দয়া কর! আমাকে হত্যা কর!

চেনা গন্ধটা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিলো। লাশপচা গন্ধে তখন আর নাক সিঁটকে আসতো না। মানুষের খণ্ডিত দেহ, রক্ত আর লাশের বিকট গন্ধের সাথে তখন নিত্য বসবাস।

ডিসেম্বর ১৯৭১। বিজয়ের অপেক্ষায় একটি নতুন দেশ। আত্মত্যাগ আর রক্ত সাগরস্রোতে মাথা তুলে দাঁড়ানো দেশটির নাম বাংলাদেশ। আচমকা একদিন শুনলাম, দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমিও নাকি মুক্ত! বিশ্বাস হচ্ছিলো না। মৃত্যুপুরীতে নয়মাসের বন্দীত্ব থেকে মুক্ত হয়ে আমার কী করণীয় আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

মরতে মরতে বারবার বেঁচে উঠি আমি। বাড়িতে অপেক্ষামান দুধের শিশু, পরিবারের অন্নবস্ত্র জুটানোর গুরুদায়িত্ব।

মুক্তিযোদ্ধারা বীরবেশে ফিরে আসতে শুরু করেছে। লাল-সবুজ পতাকার সাথে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত জয়ধ্বনিতে।

বিজয়ের গৌরবে মিশে যাচ্ছে কত আত্মত্যাগ আর রক্তের ঋণ! কত অশ্রুজল!

সবাই যাচ্ছে বিজয় মিছিলে। এ বিজয় বাংলাদেশের। এ বিজয় বঙ্গবন্ধুর। এ বিজয় বাঙালি জাতির।

পা চলছিলো না, শরীর জুড়ে ক্ষত। তবু পায়ের তলায় অদ্ভুত এক শিরশিরে অনুভূতি। বিজয় মিছিলে যাবো! আমরা স্বাধীন!

আমি সেই বীরাঙ্গনা বলছি হে বিরাট সমাজ!

পারলে চোখে চোখ মেলাও!

সেদিন তুমি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলে আমি কত অচ্ছুৎ! কত অস্পৃশ্য! আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে বরণ করে নিয়েছিলো আমার পরিবার। আমার দিকে কেউ ফিরে চায় নি। হে বিরাট সমাজ! আঙুল তুলে সেদিন দুশ্চরিত্র, নষ্টা খেতাব দিয়েছিলে তুমি আমাকে। স্থান দাওনি বিজয় মিছিলে। স্থান দাওনি পিতৃগৃহে। বিগত নয় মাসের নরকবাসই নাকি আমার অপরাধ!
দেশ স্বাধীন হলো তবু যুদ্ধ আমাকে ছাড়লো না।

তোমাদের দেয়া সব অপমান আর অপবাদের জবাব দিতে এক মহান পিতা আমাকে সেদিন “বীরাঙ্গনা” নামে ভূষিত করেন। অশ্রুপাতের জন্য মেলে ধরেন তাঁর উদাত্ত হৃদয়।

স্বাধীনতার অর্ধশতকের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে

হে বিরাট সমাজ! কান খুলে শোনো –

আমি বীরাঙ্গনা বলছি!
আমার পিতার নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
ঠিকানা: ৩২ নম্বর, ধানমন্ডি।

আমি বীরাঙ্গনা বলছি। আমাকে ভুলে যেয়ো প্রিয় দেশ।
আমাকে মনে রেখো না।

শেয়ার করুন:
  • 516
  •  
  •  
  •  
  •  
    516
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.