নতুন প্রজন্মের চোখে একাত্তরের বধ্যভূমিগুলো

পৃথা শারদী:

আমি এখন যে প্রজেক্টের কাজ করি তার নাম, ‘মুক্তিযু্দ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ’।

সাইট আছে ২৬১টি। একটা টাইপ নকশা, তাকে কেটে ছেঁটে কখনও কমিয়ে বাড়িয়ে বসাতে হয়। সাইট ভিজিট তো এতো সাইটের করা সম্ভব না, তাই সাইটের ডিজিটাল সার্ভের পাশাপাশি ছবিগুলো সাইট থেকে পাঠানো হয়, কর্মরত প্রকৌশলীদের কাছে থেকে কথা বলে ডিটেলস জেনে নেয়া হয়। ওনাদের কথা থেকে, নিজের সাইট ভিজিট থেকে, ছবি দেখে যা বুঝি দেখি তাহলো বেশিরভাগ সাইটই এমন জায়গায় সেসব জায়গায় এখন পর্যন্ত মানুষের যাতায়াত কষ্টসাধ্য।

কিছু বধ্যভূমি সাইটের কথা আজ তুলে ধরছি:

পৃথা শারদী

মৌলভীবাজারের সাইটগুলো দেখেছিলাম বিশাল বড় দিঘির পাশে, একটা সাইট তো এতোই জংলা ছিলো যে সবটা ঘুরতে পারিনি, সে সাইটের ওপাশে এক পাহাড়ি ছড়া; পাকিস্তানীরা গুলি করে মানুষ মেরে ফেলে রেখেছিলো, দু:খের ব্যাপার সে শহীদদের কেউ তুলে কবরও দেয়নি, সেখানেই তারা পড়েছিলেন।

রাজশাহীর ডিসি বাংলোতে একটা সাইট আছে, অবাক না? তখনকার ডিএম বাংলোর পাশেও রাতে আঁধারে ব্রাশফায়ার করা হয়েছিলো।

বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে যে জায়গায় এর সাইট সেখানে যেতে স্পিডবোট লাগে! একটু ভাবুন তো, আজকের দিনে যেখানে যেতে স্পিডবোড দরকার সেখানে আজ থেকে ৪৮ বছর আগে কীভাবে হানাদার বাহিনী গিয়েছিলো?

নাটোরে একটা সাইট আছে তাতে বিশাল বটগাছ, সে বটগাছটি গুলিতে জর্জরিত, মানুষকে বেঁধে সেখানে হত্যা করা হয়েছিলো, এখন ৪৮ বছর পর সেখানে কেউ নেই শুধু বটগাছটি ব্রাশফায়ারের ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রংপুরের সবকটা সাইটে পুকুর, চোখ বুঁজে কল্পনা করুন এক সার করে মানুষদের দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফারার করা হয়েছে, তাদের এতোটুকুন মাটি মেলেনি, সেই পুকুরের জলেই তারা মরে পচে ভেসেছিলেন। দু তিন দিনের তাণ্ডবের পর যখন পাকিস্তানীরা গ্রাম ছাড়ে, তখন গ্রামের মানুষ তাদের গলিত দেহ এনে মাটি দেয়। ভয় লাগে আপনার? শরীর কাঁপে?

সুনামগঞ্জের সাইটগুলো হাওড়ের পাশে, মারো আর ফেলে চলে যাও। সেই হাওড়ই শহীদদের মৃতদেহদের ভাসিয়ে নিয়েছে, হয়তো কোনো হিজল গাছের ছায়ায়ই তারা পড়েছিলেন।

সীতাকুন্ডের সাইটটা একদম চূড়ায়! হায়! এখন সীতাকুন্ডে পাহাড়ে যাবার জন্য রাস্তা করা হয়েছে, বোধ করি ওই সময় তা-ও ছিলো না, তবুও সেই পাহাড় ভিজেছে শহীদের রক্তে। কেমন লাগে না ভাবলে? কী বলবেন একে?

মেহেরপুরের পাঁচটা সাইটের একটা একদম বর্ডারে, নো ম্যান’স ল্যান্ড যাকে বলি আমরা, সেখানে কেউ যেতে পারে না, ডিজিটাল সার্ভে হবে কী করে? আর স্মৃতিস্তম্ভ? ওসব দূরের কথা। তবুও নাকি সেখানে এখনও কিছু মানুষ এসে বসে থাকেন, যারা হারিয়েছেন তাদের স্বজনদের।

আর বেশিরভাগ সাইট ধানী জমিতে; এখনও সেখানে যাবার রাস্তা নেই। তখন হয়তো হেমন্তের পাকা ধানের মাঝে কত মানুষ মরে পড়েছিলেন, তাদের মুখের ওপর উড়ছিলো নীল মাছি, শেয়াল ঘুরছিলো আশেপাশে।

এমন কিছু জায়গা আছে আমরা নকশা বসাতেও পারি না, যখন প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলি তখন তারা অনুরোধ করেন একটু ছোটখাটো হলেও যেন সেখানে একটা স্তম্ভ বসিয়ে দেই; শহীদদের স্বজনগণ আকুতি করেন, গ্রামবাসী এসে বারবার বলেন, একটা ছোট্ট স্তম্ভ, একটু ফুল দেবার বেদী, একটু দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো প্লাজা!

কী যে কষ্ট! কী যে মিনতি! আমরা কোনদিন তা বুঝবো না! আমরা শুধু জানবো আমরা স্বাধীন দেশে জন্মেছি।

এমনও আছে কয়েকটা সাইটের পাশের জমির মানুষ একটু করে নিজেদের জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন যাতে স্তম্ভটা হয়। এটাকে কী বলে! ভালোবাসা? মায়া? শ্রদ্ধা?

দেশের পদ্মা মেঘনা যমুনায় কতো শহীদ ভেসে গেছেন সেখবর কেউ জানে না! পিরোজপুরের নদী তো রক্তেই লাল ছিলো! নদী কখন রক্তে লাল হয়? কতোটা রক্ত নদীতে গেলে বহুদূরের আরেকঘাটের লোক দেখতে পায় নদীর জলের ঘোলা রং এ লাল মেশানো? আপনারা বলতে পারেন? যুদ্ধের বছরখানেক মানুষ মাছ খায়নি। খাবে কীভাবে? তখন মাছগুলো যে মানুষ খেয়েই বাঁচতো!

ন’টা মাস ধরে পাকিস্তানীরা মানুষ মেরে গেছে, যেভাবে পেরেছে মেরেছে, এতো বিকৃতভাবে, এতো হিংস্র উপায়ে যে মানুষ মানুষকে মারতে পারে তা এই হত্যাকাণ্ড দেখলেই বোঝা সম্ভব।

জেনোসাইড; বাট ইট ডিডেন্ট স্টপ!

বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখানে সকলের সামনে পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পণ করে; এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আত্মসমর্পণ হয়েছিলো এক ছোট্ট ঘরে চার দেয়ালের মাঝে; এ দেশই একমাত্র দেশ যাতে মানুষের সাথে সাক্ষী ছিলো সুনীল আকাশ, ঝকঝকে এক বিকেলের পড়ন্ত রোদ, কোটি মানুষের আবেগ।

১৪ ডিসেম্বর আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস; সকল শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

আমরা কাউকেই সম্মান দিতে পারিনি; কতো শহীদ কতো ডোবা নালায় পড়ে আছেন! কতো শহীদের দেহাবশেষ আজও হয়তো পাওয়া যাবে কোনো নদীর ধারে, কোন পাহাড়ের কোলে! আমরা কেউ তা জানি না; শুধুমাত্র দেশমাতৃকা জানেন, তিনি পরম যত্নে তার সকল মৃত সন্তানদের বুকে তুলে রেখেছেন।

আমরা সবাই সবাইকে ভূলতে পারি, মা কি সন্তানকে ভুলতে পারে?

আমি যখন এই আকাবাঁকা সাইটগুলোতে টাইপ নকশা বসাই, হঠাৎ করে খুব বিরক্ত হয়ে যাই, এতো বাঁকা সাইট, ছোট্ট সাইট, কষ্ট হয় খুব! পরক্ষণেই লজ্জা পাই, একটা অনুশোচনা আসে। এই স্মৃতিস্তম্ভ আমার জন্য শুধুই টাইপ প্ল্যান, নকশা, অথচ অন্য কতো মানুষের জন্য জীবনের প্রচণ্ড আবেগের স্থান! কারও প্রেমিক, কারও পিতা, কারও ভাই, আবার কারও হয়তো ছোট্ট শিশুই শুয়ে আছে সেখানটাতে।

আমি ক্ষমাপ্রার্থী সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রতি, সকল শহীদের প্রতি।

পাকিস্তানীদের প্রতি আমার ঘৃণা বৈ কিচ্ছু নেই, আপনারা যারা মননে সামান্যতম পাকিস্তানকে ধারণ করেন, জানবেন, আমি আপনাদের শ্রদ্ধা করি না। আপনারা এসবের যোগ্য নন।

আপনাদের বিবেক কোথায় আজকে? যারা এখনও এতোকিছুর পরে এখনও সেই পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান আলাদা হলো বলে কষ্ট পান?

ছিঃ ছিঃ ছিঃ

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.