এ কেমন অস্থির সময়ে বসবাস আমাদের!

শারমিন বানু আনাম:

আমাদের মনে এতো অস্থিরতা! কোনটা ছেড়ে কোনটা নিয়ে ভাববো?
মেয়েটা খুন হয়েছে না শারীরিক সম্পর্ক করে বয়ফ্রেন্ড অস্বীকার করায় আত্মহত্যা করেছে, জানি না! হয়তো জানা যাবেও না!
আচ্ছা আত্মহত্যার আগে মানুষের মনে কী কী ঝড় বয়ে যায়? কেউ জানে?

আচ্ছা যদি ধরি শারীরিক সম্পর্কের জেরে, অপমানে, অসম্মানে আত্মহত্যা করেছে! কিন্তু কেন?

সমাজ! সমাজে ট্যাবু, শারীরিক সম্পর্ক করা যাবে না! সে করেছে! বয়ফ্রেন্ড তাকে অসম্মান করেছে, ছিনাল মাগী বলে গালি দিয়েছে, ভিডিও তুলে ছড়িয়ে দেবার ভয় দেখিয়েছে, প্রেগন্যান্ট করে অস্বীকার করেছে, বিয়ে করতে অস্বীকার করেছে, মেরেছে, জানের ভয় দেখিয়েছে, সমাজে ন্যাংটা করে ছেড়ে দিবে বলেছে, মেয়েটার/তার বাপ মার অসম্মান করার ভয় দেখিয়েছে! হয়তো বলেছে “মর”! আত্মহত্যা করার প্ররোচনা দিয়েছে! মেয়েটা না চাইতেও জোর করে সম্পর্ক করেছে, হ্যাঁ রেপ, হয়তো রেপই করেছে ভালোবাসার অভিনয় করে! অ্থবা সত্যিই সুন্দর সুন্দর কথা বলে, ভালবাসার নিপুণ অভিনয়ে ছাদে নিয়ে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে! প্রতিটি কাজই জঘন্য অন্যায়! কিন্তু সেই ধর্ষক/খুনি বুক ফুলিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে হেঁটে বেড়াবে!

মেয়েটা হয়তো বুঝতে পারেনি! যখন বুঝতে পেরেছে, ভেবেছে যাবার জায়গা নেই! মুখ দেখানোর যো নেই! পরিবারের মুখে চুনকালি মেখেছে! বাপ মা খুন করে ফেলবে জানলে! বন্ধু-বান্ধব মুখে আলকাতরা লেপে দিবে, সাথে আত্মীয়স্বজন! আর যে ভালোবাসার আশ্রয়, সে তো বিষাক্ত সাপের মতো ছোবল দিয়ে সব অস্বীকার করে উড়াল দিচ্ছে! কার কাছে একটু সাপোর্টের আশা করবে? নিজের মন তো মরেই গেছে! শরীর/মন ভাবনায় সব ধূসর! নাহ্ কোন আশা আর নাই!

বাবা মা ভাবছে, এতো আদর করে বড় করলাম, মুখে চুনকালি মাখানোর জন্য? এতো বড় অন্যায় করলো মেয়েটা! ওর মুখ দেখলেও ঘেন্না! আগে জানলে লবন মুখে দিয়ে মেরে ফেলতাম! মুখ দেখানো যাবে কোথাও? সবাই থু থু ফেলবে মুখে! মরণ হলো না কেন আমাদের! এই দেখার জন্য বেঁচে আছি? মরলেও বাঁচতাম! বিষ খাওয়ায়ে তোরে আমরাই মারবো! ঐ হারামীর সাথে কেমনে গেলি মাগী? পেট বাঁধানোর আগে মনে ছিলো না? যা তোর নাগরের সাথেই যা! দিছে না, দুই দিন ফুর্তি কইরা রাস্তায় বাইর কইরা দিছে না! বেশ্যা মাগী, মর!

বন্ধুবান্ধব দাঁড়াইয়া তামাশা নেবে! কত্ত বড় বেহায়া মাইয়া, তার এতো দেমাগ? দিছে না ভাইঙ্গা তোর দেমাগ! ওই নষ্টা মাইয়াই ঐ পোলারে পটাইছে! আর না পটাইলে গেলি কেন ঐ পোলার লগে? মাইনষের অভাব! পোলাডা যে সুবিধার না হেইডা আমরা জানি! তাতে কী? তুই মাগি খারাপ, তার উপর শুইছস ওর লগে, পেড বাধাইছস! আমরা হের ভিডিও দেখতাছি! আর ভিডিও না থাকলেই বা কী, কল্পনা করতে সমস্যা কী? বাপমার মুখ চুনকালি লাগাইছস! তোর মুখ দেখাও পাপ! মিশতাম না তোর সাথে! যদিও আমগো সবার বফ/গফ আছে, আমরাও দরজা বন্ধ করে আদিম নেশায় মেতে উঠি, তাতে কিছু না! আমগো তো ভিডিও নাই, আমগো কাহিনী কেউ জানেও না! আমগো কাহিনি তো আর ভিডিও দোকানের মোড়ে বিকোয় না! তোর মতো নি আমরা? তুই হচ্ছিস ডাক সাইটে ছিনাল, থু থু! মর তুই!

আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশী, দেখলেই কানাকানি, হাসাহাসি- দেখ ছিনাল যায়! কোন শরম নাই! আমরা হইলে কুয়োয় ঝাঁপ দিতাম! এন্ড্রিন খাইয়া মরতাম! পোলাপানডিরে সাবধানে রাইখো, যাতে এই নটির ধারে কাছে কেউ না যায়… হগ্গলরে নষ্ট করতো এই বেইশ্যামাগী!

মেয়েটা কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? সবতো শূন্য? আমরা সবাই সব শূন্য করে দিচ্ছি এর জন্য! সব দরজা বন্ধ করে মরতে প্ররোচিত করছি!

কী অসহায়, অপরিণত বয়সের একটা মেয়ে, আমরা তার বাঁচার অবলম্বন হওয়া তো দূর, মরতে প্ররোচিত করছি! ওর অবস্থানে যে কেউ সবচেয়ে সোজা আর সবচেয়ে সকরুণ এই পথই বেছে নিতাম! কেউ কি তাকে জিজ্ঞেস করতাম, “তুমি ভালো আছো?”

বুকে হাত রেখে বলুন, কেউ তাকে বলতাম, ‘যা হয়েছে, হয়ে গেছে! সেটা নিয়ে না ভেবে, কীভাবে ভালো থাকবে সেটা ভাবো। সম্পর্ক শেষ মানে, সবকিছু শেষ নয়! কেউ তোমার অসম্মান করলো বলে, তোমার সম্মান শেষ নয়! তুমি কারো সাথে ইচ্ছায়/অনিচ্ছায় বিছানায় গেছো বা চুমু খেয়েছো, তাতে তুমি খারাপ হয়ে যাও না! আমরা আছি তোমার পাশে!’

বলতে কি পারি না? মেয়েটাকে, মেয়েগুলোকে বাঁচাতে পারি না? মেয়ে কি শুধুই তার যোনি আর বক্ষ? শুধুই সুড়সুড়ি? এই মেয়েটিই হতে পারতো অনেক কিছু!

এই আমরাই মিথিলাকে বেশ্যা বলি! আমি তো ওর তারিফ করি! কতখানি ম্যাচুরিটি নিয়ে সে বলেছে, আমার সম্মান রাখতে না পারার দায় আমার! সম্পর্ককে অস্বীকার করে নাই! একটা বিষবাষ্প মুখ থেকে বের করে নাই সেই ব্যক্তি সম্পর্কে, যে তার ভালোবাসার অসম্মান করে ব্যক্তিগত মূহুর্তের ছবিগুলো সবার সামনে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে খেলো করেছে! কার দোষ তাতে আমাদের কী যায় আসে! সম্পর্ক তাদের, সম্মান জানানো দুজনেরই কর্তব্য, দায়িত্বটা দুজনেরই! মিথিলা সম্মান রেখেছে! সম্পর্ক ভাঙার কারণ খুঁজে আমাদের কী দরকার! আসুন আমরা পারসোনাল স্পেসের সম্মান করতে শিখি! উত্তম মানব হই!

এর মাঝে আমি প্রেমে পড়ে গেছি সৃজিতের!(আমি আবার অল্পেই প্রেমে পড়ি, পাত্র অপাত্র খুঁজি না!) লোকটির গুণের তারিফ করি! তার সাহস, আর নিজের ভালবাসার মানুষের প্রতি সম্মান, তার দুঃসময়ে বটগাছ হয়ে, সাপোর্ট/সাহস দেবার তারিফ করি! এমন কোনো ছেলে বাংলাদেশে আছে? তার নিতান্তই ভালনেরেবল সময়ের ছবি/ভিডিও লোকটিকে বিচলিত তো করেইনি, বরং শক্ত হাতে মেয়েটাকে আগলেছে। ভালোবাসার সম্মান দিয়েছে! বিয়েটাও করে নিয়েছে! কথা দেয়া আর রাখার মাঝের বিশাল পার্থক্য! সে কথা রেখেছে! হ্যাটস অফ! এদের ভবিষ্যত কী জানি না, কিন্তু সুন্দর ভবিষ্যতের শুভকামনা!

এই মিডিয়ার যুগে, যেখানে দুপক্ষের লোকজনই তার সবচেয়ে বাজে সময়ের ভিডিও দেখেছে! কোন বাধাই বাধা হয়নি!
হ্যাটস অফ, ওর বাবা-মায়ের জন্যও, যারা সাহসের সাথে মেয়েটির হাত ধরে রেখেছে মমতায়!

যে দেশে মেয়ে কাউকে চিঠি লেখে – দেখা সাক্ষাত নাই, তা শুনেই মেয়েদের বিয়ে ভেঙে যায়! বিয়ে না করলে, অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি/ভিডিও ভাইরাল হয়, মেয়েদের জীবন বিষিয়ে তুলতে! কোন বাপের বেটাই সে অচ্ছুত মেয়ের হাত ধরতে, বিয়ে করতে রাজী নয়, অথবা ধরে রাখার মতো শক্ত কাঁধ নাই তাদের! তাদের জন্য এ যেন নতুন স্বপ্ন দেখার সূত্রপাত!

সরি প্রভা! অপূর্ব পারে নাই! তবু তুমি সাহসী মেয়ে হয়ে বেঁচে থাকো! বেশিরভাগই পারে না! সৃজিত পেরেছে! সুন্দর মনের মানুষ বলে নিজেকে প্রমাণ করেছে!

বেঁচে থাকুক বাকি সবাই। আমরা ওদের বাঁচতে দিই! আসুন না আমরা একটু কম জাজ করি! কেউ আপনার মতো নয় বলে, সে খারাপ নয়! সে তার মতো। তাদেরকে তাদের মতোই বাঁচতে দিই!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.