রুম্পা মৃত্যুর ঘটনায় তেমন প্রতিবাদ নেই কেন!

ফাহমি ইলা:

রাজধানীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রুবাইয়াত শারমিন ওরফে রুম্পাকে নিয়ে তেমন জোরেশোরে নিউজ কেউ করছে না। করলেও কেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। আর অন্যসব ঘটনায় যেমন প্রতিবাদ হয়, সেরকম কিছুও চোখে পড়ছে না এখন পর্যন্ত। এর কারণ মনে হয় এখন সেলিব্রেটি নারীর বিয়ে নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত এই ফ্রাস্ট্রেটেড অবদমিত জাতি। বিয়ের পোশাকের রঙ থেকে শুরু করে সেলিব্রেটি নারীর চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করা এ জাতি কী জানে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী রুম্পাকে ধর্ষণের পর ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করা হয়েছে?

অথচ এ জাতি ব্যস্ত ‘ডিভোর্সী’ নারী কার সাথে শুয়েছে, আবার কাকে বিয়ে করেছে, কতটা ধুমধামে বিয়ে করলো, এ বিয়ে কদিন টিকবে এসব নিয়ে। অন্যদিকে ধর্ষণ আসলে হয়েছে মেয়েটির পোশাকের জন্য, ধর্ষণ হয় মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে কিংবা একা চললে এসব বলবার লোক খুঁজলে সামিয়ানাতে জায়গা দেয়া সম্ভব হবে না। যেখানে একটা অঞ্চলের মানুষ এখন মঙ্গলে যাবার পথের মাপজোক করছে, সেখানে এ অঞ্চলের মানুষ পড়ে আছে নারীর পোশাকের দৈর্ঘ্য প্রস্ত মাপবার জন্য।

মিডিয়া কেনো চুপ? কেনো মিডিয়ার এ ভয়াবহ খবরেও অবহেলা? কোথায় সেই ধর্ষকের ছবি, কোথায় ঘটনার তদন্ত? মিডিয়া কেনো সেলিব্রেটির বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত? মিডিয়া যে সমাজের একটা শক্তিশালী মাধ্যম সেটা কী মিডিয়া ভুলে গেছে? নাকি স্বেচ্ছায় মিডিয়া কৌশলে এড়িয়ে যেতে চায় এ ঘটনা?

নারীর শিক্ষা দরকার, নারীর স্বাবলম্বিতা দরকার, নারীর মুক্তি দরকার। কিন্তু যে সমাজ নারীর দেহে আর পোশাকে সতীত্ব খুঁজে, নারীর শরীর জুড়ে যারা ভোগ্যবস্তু আর সম্পদের ধারণার জ্যামিতি আঁকতে ব্যস্ত, লজ্জাশরম খুঁজতে গিয়ে নারীর যোনিতে আটকে আছে, সে সমাজের মগজ ঠিক না করে নারীর মুক্তি কতটুকু পাওয়া যাবে? সমাজের বড় অংশ এখনো শুধুমাত্র আটকে আছে পুরুষালী লিঙ্গের শিকলে। অথচ দুটো লিঙ্গ একটি আরেকটির সম্পূরক হবার কথা ছিলো, কখনোই ‘অসম শক্তির ব্যবহার’ হবার কথা ছিলো না। অথচ এ সমাজ পুরুষের লিঙ্গের শক্তিশালী দিককে দেখতে দেখতে ভুলে যায় নারীর লিঙ্গ ব্যতীত সে অচল।

রুম্পা কি আরেক তনু হতে যাচ্ছে? এ অঞ্চলে কেউ কী বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে ‘এই মেয়েটি আশংকামুক্ত’? শত বাহারি কাপড়ের পুটলি জড়িয়েও কী আপনার মেয়েটি বেঁচে যেতে পারে? দু’বছরের আয়েশার মৃত লাশও কী আপনাদের ভাবায় না? নাকি আপনারা ইতিমধ্যে ভাবতে বসেছেন কিভাবে মেয়েটিকে ঘরে এবং একমাত্র ঘরে আঁটকে রাখলেই মিলবে সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তা! মিলবে না, নিরাপত্তা তাতেও মিলবে না। এ পৃথিবীতে এখনো এমন কোন ঘর আবিষ্কার হয়নি যেখানে আপনি একিসাথে ধর্ষক জন্ম দিয়ে নারীকে নিরাপদ রাখতে পারবেন। নারীর গর্ভ ছিঁড়ে ধর্ষক বের হয় না, ধর্ষক তৈরি হয় আপনাদের হাতে।

নারীকে খোলসে আবৃত করবার পূর্বে ধর্ষক উৎপাদন বন্ধ করুন। নিজেদের মগজটাকে খুলে আরেকবার ভাবতে বসুন ঠিক কী কী পরিবর্তন করলে এ সমাজ হয়ে উঠবে নিরাপদ অভয় নগরী। এ সমাজ মানুষের, পুরুষের নয়।

শেয়ার করুন:
  • 2.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.8K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.