ব্যক্তিস্বাধীনতা না বিকৃতি? জেন্ডার ভায়োলেন্সের নিরিখে পর্নোগ্রাফি

মোহর ভট্টাচার্য:

পর্ন ব্যান করতে বললেই লোকে হায় হায় করে উঠছে। কিন্তু যারা পর্ন ট্রেন্ড ফলো করেছে, তারা কিছু ব্যাপার দেখেছে নিশ্চয়ই। ২০০০ সাল নাগাদ যেসব পর্ন মুভি বাজারে আসতো, তা আজকের নিরিখে ভ্যানিলা। ক্রমশঃ পর্নে ভায়োলেন্স বেড়েছে। এসেছে গ্যাংব্যাং, ফোর্সড, রেপ, গ্যাংরেপ, সাব্জুগেশন, হিউমিলিয়েশন, বিডিএসেম ইত্যাদি। বেশিয়ালিটি সোডোমি ইত্যাদিও বাড়লো।

এতেও থামেনি, কারণ সবকিছুই দ্রুত নতুনত্ব হারায়, বোরিং হয়ে যায়। অতএব মার্কেটে এলো স্নাফ, চাইল্ডপর্ন।

কিন্তু ততোদিনে সবাই জেনে গেছে, এগুলো প্রায় সবই অভিনয়। অ্যাক্টিং দিয়ে কতো পেট ভরে? মানুষের রিয়্যাল উত্তেজনা চাই তো, নাকি? অতএব, স্পাই ক্যামস। অতএব, বাসে ট্রেনে মেয়েদের স্কার্ট উঠিয়ে ছবি তোলা (হ্যাঁ, ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে এটা রিয়্যাল লাইফ গেম), অ্যাকচুয়াল রেপের ভিডিও, আসল স্নাফ (রেপ/ গ্যাংরেপ অ্যান্ড মার্ডার)।

পাশাপাশি বাড়ল বিকৃতি, ইনসেস্ট। দেখানো হতে লাগলো বাবা-মেয়ে, মা-ছেলে, ছেলের বন্ধু, মেয়ের বান্ধবী, ভাই বোন, ইত্যাদি ইত্যাদি। হিন্দি সবিতা ভাবীর নামে তো আমাদের এই ফেবু দুনিয়ার চারপাশের ছেলেরাই কেঁদে অস্থির হয়। তারপর ধরুন, MILF, সেক্সি তিরিশ-পঁয়ষট্টি বছরের নারী।

লেখক: মোহর ভট্টাচার্য

কাল কে যেন বললো, তার পরিচিতা একজন সুন্দরী সত্তরোর্ধ্বা নারীকে জনা চারেক বছর তিরিশের ছেলে পার্ক স্ট্রীটে হাত ধরে টেনেছে। এগুলো আগে শুনতে পেতেন? না, পেতেন না। এসব হাত ধরে টানা, মোলেস্টেশন/হ্যারাসমেন্ট হতো কিশোরী-যুবতী মেয়েদের সঙ্গে। তখনও ওই সেক্স ফর জেনেটিক লাইন এস্টাবলিশমেন্ট তত্ত্ব কাজে লাগানো যেতো। পুরুষ হলো কৃষক, নিত্যনতুন উর্বরা জমি চায় ফসল ফলানোর জন্য; যতো সন্তান ততো ইভলিউশনে আপনার ঘর পাক্কা ইত্যাদি। এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট ফর জিন সার্ভাইভাল।

বুলশিট। আজকাল দেখবেন, সেক্সুয়াল গ্রাটিফিকেশনের সঙ্গে মেয়েদের সন্তান-ধারণ ক্ষমতার প্রায় কোনো যোগই নেই (থাকলে রেপ অ্যান্ড মার্ডার হতো না এতো)। সবটাই পাওয়ার প্লে। বয়স্কা নারীরাও হ্যারাসড হচ্ছেন, কারণ এখন পর্ন “মমস অ্যান্ড গ্রান্ডমমস”দের থেকেও সেক্সুয়াল গ্রাটিফিকেশনের সম্ভাবনাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কিছুই আয়ত্তের বাইরে নয়, কেউই লালসার ঊর্ধ্বে নয়, কারণ কাম-পরিতৃপ্তি তবু হয়তো ঘটতে পারে, কৌতূহল-নিবৃত্তি অসম্ভব।

আর এইখানেই পর্ন সাংঘাতিক রকম বিষাক্ত, ক্ষতিকর। কাম-নির্বাপণে পর্নোগ্রাফি কতোটা সহায়ক, ঈশ্বরই জানেন (তিনি প্যাট্রিয়ার্কাল গাঁওবুড়ো, জানাই উচিত)। কিন্তু কৌতূহল-উদ্দীপনে পর্নের জুড়ি নেই। ভিজুয়াল স্টিমুলেশন, ব্রেন অ্যাক্টিভেশন, সব পেয়ে যাবেন।

এই যে ড্যানিয়েল শ্রাবণ নামক পুরুষটি বলেছে রেপ লিগালাইজ করতে, মেয়েরা যেন কন্ডোম অফার করে তাদের রেপ করতে আসা পুরুষদের, সে আরও একটি শব্দ ব্যবহার করেছিল। অফার কন্ডোমস অ্যান্ড ডেন্টাল ড্যামস। আমি জানতাম না, ডেন্টাল ড্যাম কী বা কেন; ওই খবরটা পড়ার পর গুগল করেছি। দেখলাম, ট্রেন্ড ফলো করায় কতো পিছিয়ে আছি মশাইরা! আমাকে প্লিজ বলবেন না, যে এই কথাবার্তার সঙ্গে পর্নের যোগ নেই।

আমাদের দেশে এখনও সব গ্রামে আলো নেই, জল নেই, রাস্তা নেই, প্রাথমিক স্কুল নেই, প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। কিন্তু ৩জি- ৪জি মোবাইল ডেটা আছে, স্মার্ট ফোন আছে, টিভি কেবল/অ্যান্টেনা আছে। কিছু না থাক, ব্লুটুথ আর ভিডিও প্লে করার অ্যাপওয়ালা মোবাইল আছে, আর তাতে আছে অঢেল পর্ন। দেশি, বিদেশি নানারকম। যাতে দেখানো হয় মেয়েরা হয় উৎসাহী পার্টিসিপান্ট, কিম্বা অসহায় পুতুল, দুইই সমান উত্তেজক।
যে দেশে ফিল্ম অভিনেতাদের মতো চুল স্টাইল করা ফ্যাশনেবল, তারা পর্ন ভিডিও থেকে নানাবিধ এক্সপেরিমেন্টে উৎসাহী হয় না বললে ঘোড়ায় হাসবে। শিক্ষা নেই, সহবৎ নেই, চূড়ান্তভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, যাদের অন্য এন্টারটেনমেন্ট নেই, সেক্সের জন্য ফ্রি শরীর নেই, কিন্তু হাতে আছে মোবাইলে ফ্রি পর্ন। কী আশা করা যায়? তারা মেয়েদের “সম্মান” করবে?

আমার ফুলন দেবী মুভিটা মনে পড়ছে। থানায় তুলে নিয়ে গেছে ফুলনকে, ধর্ষণ চলছে। “ডিউটি-রত” পুলিশ অফিসারটি ফুলনকে বলছে, ওহ জ্যায়সে টিভিপে দিখাতে হ্যায়, এক আগে এক পিছে, তু তো করকে দিখায়েগি, করেগি না?

আসুন, আমরাও করতে থাকি, একদিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে পর্নের বাজার আর অন্যদিকে গার্লস অনলি ক্যারাটে ক্লাস। তোফা।

শেয়ার করুন:
  • 259
  •  
  •  
  •  
  •  
    259
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.