“ভালবাসা, নাকি ফ্যাসিবাদ?”

সুমিত রায়:

নিজের ইচ্ছে, পছন্দ, ভালো লাগা অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা আমাদের সবার মধ্যে আছে। এই প্রবণতাই পুরুষতন্ত্র। আর এই প্রবণতার চরম নৃশংস সম্পাদন হলো ধর্ষণ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যাদের আমরা ‘ভালবাসি’ বলে মনে করি তাদের প্রতি এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল হয়। অর্থাৎ যেটাকে আমরা ভালবাসা বলছি সেটা আসলে নিজের শখ, ইচ্ছে, আহ্লাদ, শারীরিক ও মানসিক প্রবৃত্তি মেটানোর একটা সুকৌশলী মাধ্যম।

মুখে বলি ভালবাসি, আসলে ওই ভালবাসার মধ্যে শুধু একজনই আছে, সেটা ‘আমি’। সুতরাং তোমাকেও আমার মতো হতে হবে। আর যদি তুমি আমার মতো নাও হও, তবুও আমি যেভাবেই হোক তোমাকে আমার মতো বানিয়ে নেবো। অপরকে নিজের করার এই খেলাটা শুরুতে বেশ ভাল্লাগে। বেশ মাখো মাখো লাগে। তুমিও চিকেন, আমিও চিকেন; তুমিও রবীন্দ্রনাথ, আমিও রবীন্দ্রনাথ; তুমিও মেসি, আমিও মেসি; তুমিও বাম, আমিও বাম; তুমিও ব্লু, আমিও ব্লু; তুমিও টাইটানিক, আমিও টাইটানিক।

এই মাখো মাখো খেলা কিছুদিন পরই জটিল হতে শুরু করে যখন অনেককিছু মেলে না, আর তাও জোর করে সেগুলি মেলানোর প্রচেষ্টা চলতে থাকে। ক্রমশই এই খেলা হিংস্র আকার নেয়। মনে হয় ভালবাসা হারিয়ে যাচ্ছে, কারণ আগে কী সুন্দর মিলে যেত, কফি-কফি, রণবীর-রণবীর; কিন্তু এখন কিছুই মিলছে না। মনে হয় ভালবাসা সঙ্কটে, তাই যেভাবেই হোক অমিলগুলিকে মেলাতে হবে।

আমরা ভুলে যাই মেলানোটা আসলে ভালবাসা নয়। অমিলটাকে যত্ন করা, লালন করাই প্ৰকৃত ভালবাসা। সবাইকে আমার মতো বানাবো, আমার মতো করে গড়বো, ভালবাসার কৌশলে অথবা গায়ের জোরে। এটাই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। ভালবাসার নামে এইভাবেই আমরা স্বৈরাচার, স্বেচ্ছাচার চালাই। কিন্তু প্রকৃত ভালবাসা হলো অপরের ‘অন্যতা’কে, ভিন্নতাকে স্বীকৃতি দেওয়া, তাকে যত্নে সংরক্ষণ করা। কিন্তু পুরুষতন্ত্র ভিন্নতাকে, বৈপরীত্যকে, বৈচিত্রকে মান্যতা দেয় না। সে সবকিছুকে এক করতে চায়, নিজের মতো বানিয়ে নিতে চায়।

এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরাচার, মৌলবাদ, ফ্যাসিবাদ। কেউ চায় সবাই “জয় শ্রীরাম” বলুক; কেউ চায় সবাই দাঁড়ি, টুপি পরুক; কেউ চায় সবাই “ভারত মাতা কী জয়” বলুক; কেউ চায় সবাই লাল হোক; কেউ চায় সবাই সবুজ হোক। এই কারণেই কোনো ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল বা কোনো মৌলবাদী ধর্মীয় সংগঠন কথায় কথায় মানুষকে ধর্ষণের হুমকি দেয়। ধর্ষণ মানে অপরের উপর সম্পূর্ণ দখলদারি, অপরের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা, অপরের উপর নিজের সমস্ত প্রবৃত্তি নির্বিচারে প্রয়োগ করার ক্ষমতা অর্জন করা। অপরের শারীরিক, মানসিক, এবং যৌনগত অবস্থানকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে তার ওপর পুরোপুরি ভাবে দখলদারি করা, তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, এবং তারপর সেটাকে নৃশংসভাবে নিষ্পেষিত করা।

যতদিন না আমরা এই ভিন্নতা, বৈপরীত্য, অমিল, ও বৈচিত্র্যকে মান্যতা না দেবো, তাকে মর্যাদা দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন না করবো, এই অমিলগুলিকে সযত্নে লালন না করবো, ভিন্নতার সহাবস্থানকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ না করবো, প্রকৃতির এই স্বাভাবিক বৈচিত্র্য, ভিন্নতা, ও স্বতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হবো, এই অমিলের মধ্যে মিলনের আনন্দ খুঁজে না পাবো, ততদিন প্ৰকৃত ভালবাসার স্বাদ, সেই আসল অমৃতের সন্ধান থেকে আমরা চিরবঞ্চিত থাকবো। এই জগৎ বৈচিত্রময়। আর এই বৈচিত্র্যকে উপভোগ করা ও তার মধ্যে দিয়ে অমৃতের সন্ধানই একজন প্রকৃত সভ্য, শিক্ষিত, বা ধার্মিক মানুষের কাজ। বাকি সবই ভণ্ডামি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.