বিনীত নিবেদন

ফাহমিদা খানম:

“এ ধরনের রোগি কি আগে তুমি হ্যান্ডেল করেছো?”
“জ্বী করেছি”
“দেখি বলো তো আমার আয়ু আর কতদিন আছে?”
থতমত খেয়ে খেলাম, উনাকে দেখার দায়িত্ব পেয়েছি মাত্র এক সপ্তাহ হলো, খুব একটা কথা বলেন না, আর রুমে কেউ এলে সেভাবে সাড়াও দেন না, সারাটা রাত ভয়ানক শারীরিক যন্ত্রণায় ছটফট করলেও শুধুই মাকে ডাকেন।

“কই, বললে নাতো কতদিন আর আছি?”
“ইনশাল্লাহ আপনি ভালো হয়ে যাবেন, কতো ভালো চিকিৎসা পাচ্ছেন, আর সবাই কত যত্ন নেয়, আপনি ভালো হয়ে যাবেন”
“তোমাদেরকে বুঝি এসব গৎবাঁধা বুলি শিখিয়ে পাঠায়?”
অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম, এভাবে যে বলবেন আশা করিনি।
“রাতে আজ কী খাবেন? সুপ না রুটি?”
“যদি বলি ঝাল করে আলু ভর্তা আর পাতলা ডাল দিয়ে ভাত খেতে চাই, খাওয়াবে?”
“ঝাল আপনার জন্যে বারণ, তবুও কাল দুপুরে আপনাকে এই আইটেম খাওয়াতে বলবো”
“শোনো মেয়ে শরীর আর ভালো হবে না, যা মন চায় খেয়েই মরতে চাই”
আবারও অপ্রস্তুতের পালা আমার, আমি একদম নতুন এ কাজে –বলতে গেলে শিক্ষানবিশ। তবে দুইটা কিডনি অচল রোগিকে ইচ্ছা করলেও সব খাওয়ানো যায় না, একদিন পর পর ডায়ালাইসিস করতে হয় উনাকে।

“কিছু মনে করো না আমি জানি আমি আর বেশিদিন নেই – আমিও অপেক্ষায় আছি বুঝলে!”
রুমে কেউ দেখতে এলেও উনি বিরক্ত হোন, পাশ ফিরে ঘুমানোর ভান করেন — ব্যাপারটা খুবই খটকা লাগলেও বুঝেছি দীর্ঘদিন অসুখে ভুগে ভুগে হয়তো এমন হয়ে গেছেন। তবে কেউ জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেন—
“আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালোই আছি”। অথচ আমি জানি উনি একদমই ভালো নেই, রাতে উনার গোঙ্গানি শুনে আমার নিজেরই অসহায় লাগে।
“আজ কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো বলেই পাশ ফিরে গেলেন।”
ছেলেরা, বউরা দেখতে এলে উনি এমন করেনই!
“এই মেয়ের কাছে খবর নিলেই তো হয়, আমার রুমে উটকো গন্ধে নাক চেপে আসার কী দরকার বাপু?”
বেচারা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন – কোনো উত্তর না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন, কিছুক্ষণ পরে ছোট ছেলে এলো মায়ের খবর নিতে।
“আজ কেমন আছো মা?”
“সবসময় যেমন থাকি তেমনই আছি, এই ফর্মালিটির দরকার কী? তুমি তোমার জগতে কুকুর, বিড়াল নিয়ে ভালো থাকো”
এই ছেলেও রুম থেকে বেরিয়ে গেলো — আমার খারাপ লাগে আসলে দীর্ঘদিন অসুখে ভুগলে মানুষ খিটখিটে হয়ে যায়, তবে উনি একটু বেশীই! সবার আগ্রহের মুখে পানি ঢেলে শান্তি পান হয়তো!

“আম্মা আজকে কেমন আছেন? কিছু খেতে ইচ্ছে করলে আমাকে বলবেন”
“প্রতিদিন একই উত্তর দিতে ভালো লাগে না বউমা, দোয়া করো যেনো তাড়াতাড়ি বিদায় নেই, তোমাদের তো বানের জলের মতো খরচ হচ্ছে — আমার নিজেরই লজ্জা লাগে”
বাইরের একজনের সামনে এভাবে পরিবারের কাউকে বিব্রত হতে দেখে আমারও লজ্জাই লাগে, তবে নার্স মানুষ তাই কিছু বলি না।

“যে ব্যথা মহান, তারি পায়ে আমি
জানায়ে গেছি প্রণাম”
সামান্য চোখ লেগে এসেছিল, এটা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম।
দুই সপ্তাহ না যেতেই একদিন রাতে উনার শরীর বেশ খারাপই হলো – আমি রাতে সবাইকে জানালেও সবাই বললো, এতো রাতে কিচ্ছু হবে না – সকালে ডাক্তারকে জানাবেন। উনার নাকি মাঝে-মধ্যে এমন হয়, ভয়ের কিছুই নাই। রুমে ফিরে দেখি আন্টি ঘুমিয়ে পড়েছেন – নাক ডাকার শব্দে স্বস্তি পেলাম।
“রাত তিনটার পর থেকে আন্টি আর উঠেননি, এতো দীর্ঘ সময় উনি ঘুমান না”
ডাক্তারকে জানানোর পর হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্যে বললেন।
“প্লিজ আপনি আমাদের সাথে চলুন, আসলে রাতে উনার কী হয়েছিল জিজ্ঞেস করলে আমাদের ঠিক জানাও নেই”
আমি অবাক হলাম এই ভেবে — আমি তো উনাদের জানিয়েছিলাম! কেউ রুমে পর্যন্ত আসেনি!
হাসপাতালে গিয়ে শুনলাম উনার স্ট্রোক হয়েছে রাতেই – আর উনি ঘুমাচ্ছেন না, অজ্ঞান হয়ে আছেন মাত্র!
এক সপ্তাহ ছিলেন – আমি দুইবেলা যেতাম, আসলে মায়া পড়ে গিয়েছিল। বাসায় নিয়ে আসার পর একদিন রাতে উনার চোখে পানি দেখে বিব্রত হলাম –
“আমি তোমার কাছে কয়েকটা জিনিস দিয়ে যাবো – কথা দাও আমি মারা যাবার পরেই তুমি ওদের দিবে”
“এসব কথা থাকুক, ইনশাল্লাহ আপনি ভালো হয়ে যাবেন”
“আমি সারাজীবন আল্লাহর কাছে চেয়েছি আমি যেনো কখনও কারও উপরে নির্ভরশীল না হই, অথচ দেখো আমি আজকে ঠিকই বিছানায়”
“অসুস্থ হলে তো কারো কিছুই করার নেই, এটা আমাদের হাতে না”
“নিজেকে সান্ত্বনা দেই জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে যত পাপ করেছি আল্লাহপাক অসুখের মধ্যে দিয়ে সেসব মাফ করে দিন”
এসব অবস্থায় কোনো সান্ত্বনা মুখে আসে না, তবে পৃথিবীতে সুস্থতা যে কতবড় নেয়ামত আল্লাহপাকের –অসুস্থ না হলে বোঝা যায় না।

পরদিন রাতেই একটা ডায়েরি আর তিনটি খাম দিলেন—
“আমার মৃত্যুর পরেই দিবে”
“আপনার অবর্তমানে উনারা এমনিতেই সব পাবে – আমাকে কেন দিচ্ছেন?”
“আজ শরীরটা ভালো নাই, কাল বলবো”
রাতে কেউই এলো না, উনিও ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম আসছিল না, বাসার সবার নির্বিকার ভাব আমাকে বেশ অবাকই করছিল — শুধু কেমন আছে জিজ্ঞেস করেই দায়িত্ব খালাস! নাকি টাকা- পয়সা দিয়ে নার্স রেখেছে বলেই নিশ্চিন্ত? যত্ন আর দরদ যে এক নয় এরা কি এটাও বুঝে না? উনার শরীর বেশ খারাপের দিকেই যাচ্ছে।

কৌতুহলি হয়ে রাতে একটা খাম খুলে দেখি ছেলেমেয়েকে লিখা —

“বিনীত নিবেদন, এই যে আমার মৃত্যুর পর তোমরা আমার জন্য কান্নাকাটি, কোনো মিলাদ বা এতিম খাওয়ানোর ঝামেলায় যাবে না। দিনের পর দিন তোমরা জীবিত মাকে অবহেলার চাদর দিয়ে মুড়িয়েছো, প্রাইভেসির অদৃশ্য দেয়াল তুলে আমাকে ঘরের এক কোনে অনাদর করেছো। বাসায় আমি আছি কি নেই সেটা দেখার সময় হয়নি তোমাদের দিনের পর দিন। তাই আমি চাই না আমার মৃত্যুর পর আমি আর তোমাদের স্মৃতিতে থাকি! কী দরকার? বেঁচে থাকতে আমার আকুলতা, ব্যকুলতা সবই তোমাদের বাড়াবাড়ি মনে হতো বুঝতে পেরে আমি নিজেকে শক্ত করলাম — তোমাদের আলাদা জগতে আমি কোথাও ছিলাম না। অসুস্থ হবার আগে দীর্ঘদিন আমি সুস্থ ছিলাম – তোমাদের মূল্যবান সময় হয়নি আমাকে দেবার! মাতৃত্বের মহান স্বাদ আমি জীবিত অবস্থায় পেয়ে গেছি, তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিমান নেই বরং আমার অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে বলে আমি আনন্দিত এখন। যেহেতু জীবিত অবস্থায় তোমাদের জগতে আমার জায়গা হয়নি – মৃত্যুর পর আমাকে নিয়ে কিছুই করার দরকার নেই। আমি নিজেই সকল দায় থেকে তোমাদের মুক্তি দিয়ে গেলাম, জীবিত মাকে সম্মান কিংবা মর্যাদা যেহেতু দিতে পারোনি — মৃত্যুর পর সেটা আমি চাই না এটাই আমার বিনীত নিবেদন।
— ইতি মা”

অজান্তে চোখের পানি আসলো –উনার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম কতোটা অভিমান আর চোখের জলে লিখা! আত্মভিমান থেকেই উনার এই আচরণ বুঝলাম।

পরদিন সকালে উনার শরীর আবারও খারাপ হলো —হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় আমার হাত ধরে রেখেছিলেন, দুইদিন যুদ্ধ করে চলেই গেলেন।
“উনি দীর্ঘদিন অসুখে ভুগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন, আপনার সাথে কী গল্প করতো?”
“নাহ উনি খুব একটা কথা বলতেন না”
“কিন্তু আপনাকে কিছু জিনিস রাখতে দিয়েছিলেন ঠিকই!”
মুখ বন্ধ রাখার জন্যে আমাকে বেশ মোটা অংকের টাকা দেয়া হলো, আর বলা হলো মুখ খুললে চাকুরী যাবে, সেই সাথে এই শহরে টিকে থাকা!
আফসোস হলো উনি আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শোনা আর হয়নি। হয়তো কারো কাছে বলে হালকা হতে চেয়েছিলেন অথবা বুকের ভেতরে যে কষ্টের পাহাড় ছিলো —সেটা বলার মতো কাউকে পাননি!

বাসা থেকে বের হবার সময় খেয়াল করলাম কী সুন্দর সাজানো ফ্ল্যাট — ছবির মতোন করে সব সাজানো গোছানো, বিদেশী কুকুর, বিড়ালের জন্যে কত যত্নআত্তি! আহারে জলজ্যান্ত মানুষটা এ বাড়ি থেকে আক্ষেপ নিয়ে চলে গেছে – কারো চোখেই সে শোকের চিহ্ন নেই! দুর্ভেদ্য অংকটা এতোদিনে মিলে গেছে আমারও।

২২/১১/১৯

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.